শিল্পীত বাক্রীতির নামই ছন্দ'- ব্যাখ্যা কর
শিল্পীত বাক্রীতির নামই ছন্দ'- ব্যাখ্যা কর
উত্তর : ‘শিল্পীত বাক্রীতির নামই ছন্দ'- এটি ছন্দের যথার্থ সংজ্ঞাই বটে। কারণ বাংলা ছান্দসিকগণ যে ভেবেই ছন্দের সংজ্ঞা নির্দেশ করুন না কেন, তাঁদের সবার কথাতেই নিহিত রয়েছে 'শিল্পীত বাক্রীতির নামই ছন্দ'।
প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছন্দ বিষয়ক সংজ্ঞাকে বিশ্লেষণ করতে পারি। তিনি বলেছেন, কথাকে তার জড়ধর্ম থেকে মুক্তি দেবার জন্যই ছন্দ ।” কথার জড়তাকে দূর করার জন্য চাই শৈল্পিক বাকরীতি।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছন্দের সংজ্ঞায় বলেছেন, “বাক্যস্থিত পদগুলোকে যেভাবে সাজাইলে বাক্যটি শ্রুতিমধুর হয় ও তাহার মধ্যে ভাবগত ও ধ্বনিগত সুষমা উপলব্ধি হয়, পদ | সাজাইবার সেই পদ্ধতিকে ছন্দ বলে।”
প্রবোধচন্দ্র সেন তাঁর 'ছন্দ পরিক্রমা'য় বলেছেন, “সুনিয়ন্ত্রিত ও সুপরিমিত বাবিন্যাসের নাম ছন্দ।”
দীলিপ কুমার রায়ের মতে, “ছন্দ হলো ধ্বনির একটা গোছালো ঝাঁকালো গতি ।”
অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের মতে, “যেভাবে পদবিন্যাস করিলে বাক্য শ্রুতিমধুর হয় এবং মনে রসের সঞ্চার হয়, তাহাকে ছন্দ বলে।”
আব্দুল কাদির বলেছেন, “শব্দের সুমিত সুনিয়ন্ত্রিত বাণী বিন্যাসকে বলা হয় ছন্দ।”
এস. এম. আব্দুল লতিফ তাঁর 'ছন্দ-পরিচিতি' গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “বাক্যের অন্তর্গত পদগুলোকে কালগত ও ধ্বনিগত সামঞ্জস্য রক্ষা করে শ্রুতিমধুরভাবে সাজাবার পদ্ধতিকে ছন্দ বলে ।"
‘ভাষা ও ছন্দ' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন, “অর্থের বন্ধন হতে মুক্ত করে উদ্দাম গতির স্রোতের ধ্বনিগত সৌন্দর্যকে 'পক্ষবান অশ্বরাজসম' 'ভাবের স্বাধীন লোকে' চালিত করা।
কিন্তু তা কখনোই অনিয়ন্ত্রিত বা অনিয়মিত নয়, বরং সবসময় তা "শব্দের সুমিত ও নিয়মিত বিন্যাসে শাসিত।” রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- “সংস্কৃত ভাষায় ছন্দ শব্দের অর্থ হচ্ছে মাত্রা, আর একটা অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা। মাত্রাকারে কবির সৃষ্টি ইচ্ছা কাব্যকে বিচিত্র রূপ দিতে থাকে।”
কিন্তু কবিকে মাত্রা নিয়মের নান্দনিক গঠন সৌকর্যের অনিন্দ্যতাই বুঝায়, বুঝায় সর্বাঙ্গের সুসমঞ্জস্য সৌন্দর্যময়তা। কিন্তু গতিহীন স্থির সৌন্দর্য কখনোই ছন্দ বলে বিবেচিত হতে পারে না ।
ছন্দে এই গতি ও সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় শিল্পিত বাক্বিন্যাসে। যার বচনভঙ্গি সুন্দর ও পরিপাটি, তার কথা শুনতে বিরক্তি নয়, বরং মধুর লাগে। একই কথা অগোছালো হলে শুনতে তেমন লাগে না, বরং অনেক সময় বিরক্তির উদ্রেক করে।
সুভাষণ, সুবচন চিরকালই হৃদয়গ্রাহী হওয়ার কারণ এর শৈল্পিক নির্মাণ।। কেবল ললিত কণ্ঠ শ্রোতাকে আকর্ষণ করে না। চাই শব্দকে সুন্দর করে সাজিয়ে উপস্থাপন করা। বিমুগ্ধ শ্রোতা তখনি বলবে- “তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী ? আমি অবাক হয়ে শুনি/ কেবল শুনি।”
এই অবাক হবার কারণ প্রথমত সুরের মাধুর্য, দ্বিতীয়ত গানের বাণী বা কথার লালিত্য। কবিকে তাই ‘শব্দকুশলী’ও বলা হয়। সাধারণ কথাকে কেবল পরিবেশনার কৌশলেই হয়ে ওঠে অপূর্ব কাব্য ।
শুকনো কাঠকে 'শুষ্ক কাষ্ঠ' বলার মধ্যে কাব্যত্ব নেই, কিন্তু শুকনো কাঠ যখন হয়ে ওঠে ‘নীরস তরুবর' তখন তা কাব্যের মর্যাদা পায় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন-
“অন্তর হতে আহরি বচন,
আনন্দলোক করি বিরচন,
গীতরসধারা করি সিঞ্চন সংসার-ধূলিজালে।”,
অন্তরের আহরিত শব্দ তখনি আনন্দলোক বিরচন করতে পারে, যখন শব্দগুলোকে সুবিন্যাস করা হবে। কথাটি কাব্যের জন্য অনস্বীকার্য, তেমনি ছন্দের জন্য অপরিহার্য। তাইতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-
“মানবের জীর্ণ বাক্যে মোর ছন্দ দিবে নব সুর, অর্থের বন্ধন হতে নিয়ে তারে যাবে কিছু দূর
ভাবের স্বাধীন লোকে...।”
এখানেই নিহিত আছে ছন্দের মূল তাৎপর্য। জড় বস্তুর মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করে ছন্দ। কবির বিমূর্ত ভাবনাকে পাঠকের অন্তরে মূর্ত করে তুলতেও ছন্দের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ছন্দ তখনি সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে যখন বাক্যস্থিত শব্দগুলো
সুবিন্যস্ত, সুনিয়ন্ত্রিত ও সুনির্বাচিত হয়।
ছন্দের উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়টি সর্বপ্রথম উঠে আসে তা হলো, বাক্য বা কথা বা পদসমূহের সুষমা বৃদ্ধি, সুপরিমিত বা সুনিয়ন্ত্রিত করা, শ্রুতিমধুর করা ইত্যাদি হলো ছন্দের কাজ।
সুতরাং বাক্য বা শব্দের শ্রুতিমাধুর্য বা সুষমা বৃদ্ধির জন্য অবশ্যই শিল্পিত বাক্রীতি আবশ্যক। ছন্দের প্রয়োজন হলো মানব মনের অনুভবকে হৃদয়গ্রাহী করে তোলা। ছন্দ কাব্যকে গতি সৌন্দর্য দান করে। সাহিত্যের ভাবকে রসাত্মক করে তোলা ছন্দের অন্যতম কাজ।
কবিতা বা সাহিত্যের নিষ্প্রাণ শব্দগুলোকে প্রাণবন্ত সজীব করে তোলে ছন্দ। তাই শব্দগুলোকে শৈল্পিক সৌন্দর্যে বিন্যাস করাই প্রথম শর্ত ।
.png)