চর্যাপদের ভাষা বাংলা প্রমাণ কর
চর্যাপদের ভাষা বাংলা প্রমাণ কর
![]() |
| চর্যার ভাষা বাংলা কে, কীভাবে প্রমাণ করেছেন |
চর্যাপদের ভাষা বাংলা প্রমাণ কর
উত্তর : বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের পুথিশালা থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে তা প্রকাশ করেন।
চর্যাপদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে বিদগ্ধজনদের মধ্যে বিশাল কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। চর্যাগীতিকাগুলো বৌদ্ধ সহজিয়াদের পদ্ধতিমূলক গান। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্ধ্যাভাষায় রূপকের মাধ্যমে সাধকদের গূঢ় ধর্মসাধনার কথা প্রচার করা।'চর্যাপদ' বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদিমতম নিদর্শন।
তবে চর্যাপদের ধ্বনিতাত্ত্বিক ও ভাষার অভ্যন্তর গঠনশৈলী বিচার করে হিন্দি, মৈথিলী,অসমিয়া, উড়িয়া প্রভৃতি ভাষাভাষিগণও চর্যাপদকে তাদের ভাষার আদিমতম নিদর্শন হিসেবে দাবি করে ৷
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থে চর্যাপদের ধ্বনিতত্ত্ব ও বৈয়াকরণিক বিশদ বর্ণনা করেছেন। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন যে, চর্যার ভাষা বাংলা। তিনি ভাষার আলংকারিক দিকের বিশ্লেষণ করে ‘চর্যাপদ'কে বাংলা ভাষার আদিরূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় চর্যাপদ সংকলনটি আদিমতম বাংলা হিসেবে গণ্য করে তিনি দেখিয়েছেন-বিহার, উড়িষ্যা, বাংলা, আসাম প্রভৃতি অঞ্চলের আদিবাসীদের মন-মনন, বিশ্বাস-সংস্কার, রীতিনীতি, জীবন- জীবিকা তথা সমাজ-সংস্কৃতির রূপ প্রায় একই রকম।
ভাষাবিজ্ঞানের ধারাবাহিক বিবর্তনের পদ্ধতিগত রূপ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে চর্যাপদের ভাষা বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহ বৈজ্ঞানিক বিবেচনার অধীন নেওয়া হলে দেখা যায় এটি মূলত বাংলা ভাষারই প্রাচীন রূপ । একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বিবৃত করা হলো : আলিএঁ কালিএঁ বাট রূন্ধেলা ।
তা দেখি কাহ্ন বিমনা ভইলা । (কাহ্নপা, ৭ নং চর্যা) এ পদটি ভাষাগত ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়: সংস্কৃত > বর্ত >বউ > বাট। আধুনিক বাংলায় ‘পথ'। সংস্কৃত > দৃক্ষ্যতি >দেখই > দেখি ।
‘দেখি' পদটি অসমাপিকা ক্রিয়ার নির্দেশক। ভাষা বিবর্তনের এ প্রক্রিয়া বাংলা ভাষার রূপান্তরের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। তাছাড়া এর ধ্বনিতাত্ত্বিক বিবর্তনের বৈশিষ্ট্যসমূহও চিহ্নিত করে ‘চর্যাপদ' বাংলা ভাষার প্রাচীনতম রূপ। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষার অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামো বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন এটি বাংলা ভাষারই আদিরূপ ।
মহামহোপাধ্যায় আচার্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদগুলো সম্পাদনা করে এগুলো 'বাঙ্গালা গান' বলে মতামত দিয়েছেন। পরবর্তীতে ভাষাতত্ত্ববিদগণ বিশেষ করে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যার ভাষা বাংলা বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য ছাড়াও চর্যাগীতিকার ভাষায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যানুসারে অলংকারের ব্যবহার দেখা যায়।
চর্যার ভাষায় ব্যবহৃত রূপক, উপমা, চিত্রকল্প প্রভৃতি অলংকারের ব্যবহার পাওয়া যায়, যা বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্যকেই নির্দেশ করে। তাছাড়া চর্যাগীতিতে ভারতের পূর্ব প্রান্তিক অঞ্চল যেমন বিহার, উড়িষ্যা, বাংলা, আসাম আদিবাসীর মত, বিশ্বাস-সংস্কার, রীতিনীতি, জীবন-জীবিকা ও সমাজ-সংস্কৃতির সাথে বাঙালি জীবনাচরণের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
চর্যার রচয়িতাগণ বাঙালি সমাজজীবনের আচারের মধ্যে থেকে তাঁদের শিল্পবৃত্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এসব নানা দিক বিবেচনা করে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও পরবর্তীতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ অন্যান্য গবেষকগণ প্রমাণ করেছেন যে, চর্যাপদের ভাষা বাংলা ।
