ভারত ও আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐক্য বর্ণনা কর
ভারত ও আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐক্য বর্ণনা কর ।
![]() |
| ভারত ও আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐক্য বর্ণনা কর । |
উত্তর : আরবরা যখন প্রথম আফগানিস্তানের এসে পৌঁছায় তখন সে-দেশ কনিষ্কের বংশধর তুর্কি রাজার অধীনে ছিল। কিন্তু পরে তার ব্রাহ্মণ মন্ত্রী সিংহাসন দখল করে ব্রাহ্মণ্য রাজ্য স্থাপন করেন। ৮৭১ সনে ইয়াকুব-বিন-লয়েস কাবুল দখল করেন।
শাহিয়া বংশ তখন পাঞ্জাবে এসে আশ্রয় নেন-শেষ রাজা ত্রিলোচন পাল গজনীর সুলতান মাহমুদের হাতে ১০২১ সালে পরাজিত হন। আফগানিস্তানের শেষ হিন্দু রাজবংশের বাকি ইতিহাস কাশ্মীরে ।এখানে এসে ভারতীয় পণ্ডিতগণ এক প্রকাণ্ড ঢেরা কাটেন।
প্রথম আর্য অভিযানের সময় কিংবা তারও পূর্ব থেকে-আফগানিস্তান ও ভারতবর্ষ নানা যুদ্ধবিগ্রহের ভিতর দিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত একই ঐতিহ্য নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যোগসূত্র অবিচ্ছিন্ন রাখবার চেষ্টা করেছে।
যদি বলা হয় আফগানরা মুসলমান হয়ে গেল বলে তাদের অন্য ইতিহাস, তাহলে বলি, তারা একদিন অগ্নি-উপাসনা করেছিল, গ্রিক দেবদেবীর পূজা করেছিল, দেববিরোধী বৌদ্ধধর্মও গ্রহণ করেছিল। তবুও দুই দেশের ইতিহাস পৃথক করা যায় না।
ভারতবর্ষের ইতিহাস থেকে মুসলিম আফগানিস্তান শেষ করে কান্দাহার, গজনী, কাবুল, জালালাবাদ বাদ দিলে ফ্রন্টিয়ার, বানু কোহাট এমন কি পাঞ্জাবও বাদ দিতে হয়।মাহমুদ-গজনীর পূর্বে ভারতবর্ষের লিখিত ইতিহাস নেই। ভারতবর্ষের পাঠান তুর্কি সম্রাটেরা আফগানিস্তানের দিকে ফিরেও তাকান নি, কিন্তু আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতবর্ষের সংস্কৃতিগত সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি।
আলাউদ্দীন খিলজীর সভাকবি আমির খসরু ফারসিতে কাব্য রচনা করেছিলেন। তাঁর নাম ইরানে কেউ শোনেন নি, কিন্তু কাবুল কান্দাহারে আজকের দিনেও তাঁর প্রতিপত্তি হাফিজ-সাদীর চেয়ে কম নয়।
ইশকিয়া কাব্যে দেবলা দেবী ও খিজর খানের প্রেমের কাহিনী পড়েননি এমন শিক্ষিত মৌলবি আফগানিস্তানে আজও বিরল।আফগানিস্তানে বিশেষ করে গজনী-দৌত্য উত্তর-ভারতবর্ষে ফারসি ভাষা তার সাহিত্যসম্পদ, বাইজান্টাইন সোসীন ইরানি স্থাপত্য, ইতিহাস-লিখনপদ্ধতি, ইউনানী ভেষজবিজ্ঞান, আরবি-ফারসি শাস্ত্রচর্চা ইত্যাদি প্রচলিত হয়ে, নতুন নতুন ধারা বয়ে নব নব বিকাশের পথে এগিয়ে চলল।
একদিন আফগানিস্তান গ্রিক ও ভারতবাসীকে মিলিয়ে দিয়ে গান্ধার-কলার সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছিল, পাঠান তুর্কি যুগে সেই আফগানিস্থান আরব-ইরানের সঙ্গে ভারতবর্ষের হাত মিলিয়ে দিল।তৈমুরের মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরগণ সমরকন্দ ও হিরাতে নতুন শিল্পপ্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু আফগানিস্তানের হিরাত অতি সহজেই তুর্কিস্তানের সমরকন্দকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
তৈমুরে পুত্র শাহরুখ চীন দেশ থেকে শিল্পী আনিয়ে ইরানিদের সঙ্গে মিলিয়ে হিরাতে নবীন চারুকলার পত্তন করেন। তৈমুরের পুত্রবধূ গৌহর শাদ শিক্ষাদীক্ষায় রানি এলিজাবেথ, ক্যাথরিনের চেয়ে কোনো অংশে ন্যূন ছিলেন না।
তাঁর আপন অর্থে তৈরি মসজিদ-মাদ্রাসা দেখে তৈমুরের প্রপৌত্র বাবুর বাদশাহ চোখ ফেরাতে পারেন নি। এখনো আফগানিস্তানে যেটুকু দেখবার আছে, সে ঐ হিরাত-যে কয়টি মিনার ইংরেজের বর্বরতা সত্ত্বেও এখনো বেঁচে আছে, সেগুলো দেখে বুঝা যায় মধ্য-এশিয়ার সর্বকলাশিল্প কী আশ্চর্য প্রাণবলে সম্মিলিত হয়ে এ অনুর্বর দেশে কী অপূর্ব মরূদ্যান সৃষ্টি করেছিল।
উল্লিখিত বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায় যে, ভারতবর্ষের সাথে আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক বন্ধন সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
