(২য় অধ্যায়) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন-১। মতিন সাহেব একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের মালিক। নিজের প্রতিষ্ঠানটিকে আরও উন্নত ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রত্যেকের বসার জন্য সুসজ্জিত সুপরিসর কক্ষ এবং মার্জিত পোশাকের ব্যবস্থা করেন। এছাড়া দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য পরিচয়পত্রের ব্যবস্থাসহ তাদের কার্যাবলির উপর কড়া নজরদারি রাখেন এবং দুর্নীতি প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মতিন সাহেবের এরূপ প্রচেষ্টার ফলে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

ক. দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

খ. কুতুবউদ্দিন আইবেককে 'লাখবক্স' বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।

গ. উদ্দীপকে মতিন সাহেবের কর্মকাণ্ডের সাথে সুলতানি যুগের কোন শাসকের কর্মকাণ্ডের মিল পাওয়া যায়? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. উদ্দীপকে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি মতিন সাহেবের মনোভাবের সাথে উক্ত শাসকের শাসনব্যবস্থার যে দিকটি প্রতিফলিত হয়, তা বিশ্লেষণ কর।

উত্তর

ক. সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ।

খ. সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেককে 'লাখবক্স' বলা হয়। কারণ, বদান্যতায় তিনি ছিলেন দ্বিতীয় হাতেম। তার বদান্যতা কিংবদন্তির পর্যায়ভুক্ত ছিল। তার তেজস্বিতা ও সহকর্মীবৃন্দের প্রতি অফুরন্ত দানের জন্য বৈরী মনোভাবাপন্ন ঐতিহাসিকরাও তাকে মহানুভব এবং বিজয়ী নৃপতি হিসেবে প্রশংসা না করে পরেননি। প্রতিদিন তিনি লাখ লাখ টাকা অকাতরে দান করতেন বলে তাকে লাখবক্‌স বা লক্ষ টাকা দানকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

মূলকথা : সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক লাখ লাখ টাকা অকাতরে দান করতেন ।

গ. উদ্দীপকে মতিন সাহেবের কর্মকাণ্ডের সাথে সুলতানি যুগের গিয়াসউদ্দিন বলবনের কর্মকাণ্ডের মিল পাওয়া যায়।

কারণ, উদ্দীপকের একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের মালিক মতিন সাহেব নিজের প্রতিষ্ঠানকে আরও উন্নত ও আকর্ষণীয় করে তুলতে আগ্রহী ছিলেন। এজন্য তিনি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা- কর্মচারীদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং প্রত্যেকের বসার জন্য সুসজ্জিত সুপরিসর কক্ষের ব্যবস্থা করেন। এমনকি অফিসের সবার জন্য মার্জিত পোশাকের ব্যবস্থা করেন। এছাড়া দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করেন এবং তাদের কার্যাবলির উপর কড়া নজরদারি রাখেন ও দুর্নীতি প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেন। তার এরূপ প্রচেষ্টার ফলে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। অনুরূপভাবে, সুলতান বলবনও রাজ্যের জনগণের শ্রদ্ধা ও ভীতি জাগানোর জন্য প্রাচীন পারস্য-রাজদের ন্যায় কঠোর রীতি ও জাঁকজমকপূর্ণ রাজদরবার প্রবর্তন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রাষ্ট্রের জনমনে ভীতি ও শ্রদ্ধার উদ্রেক করার জন্য বলবন সেলজুক ও খাওয়ারিজম রাজকীয় ঐতিহ্যের অনুকরণে জমকালো রাজদরবার প্রতিষ্ঠা এবং সুলতানের আভিজাত্য রক্ষা ও তার অবাধ ক্ষমতা প্রমাণের জন্য পারস্য রীতি অনুযায়ী রাজদরবারে সুলতানকে সিজদাহ' আভূমি কুর্ণিশ) ও 'পাইবস' (পদচুম্বন) করার রীতি প্রচলন করেন। রাজদরবারের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য রক্ষায় রাজসভায় লঘু চপলতা, হাসিঠাট্টা বারণ এবং মদ্যপান ও নৃত্য-গীত নিষিদ্ধ করা হয়। তিনি সব সময় জনসাধারণের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন; সব সময় রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত থাকতেন। নীচ বংশীয় লোকদের সাথে মেলামেশা বা ..কথাবার্তা ও তাদের কোনো দান-উপহারও গ্রহণ করতেন না। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি মতিন সাহেবের মনোভাবে সুলতান বলবনের রাজোচিত জীবনাচরণ ও রাজকীয় মর্যাদা বৃদ্ধির দিকটি ফুটে উঠেছে।

সুরক্ষা ও বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা দূর করতে হলে সুলতানদের মর্যাদাসম্পন্ন হতে হবে। ধর্মকে রক্ষা ও শরিয়তের শাসন কায়েম, পাপাচার ও দুর্নীতির বিলোপসাধন, সৎ, ধর্মপরায়ণ ও সদৃবংশীয় লোকদের রাজকার্যে নিয়োগ এবং সুষ্ঠু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি রাজতন্ত্রের মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেন। পারসিক কায়দায় সিজদা ও পাইবস রীতির প্রবর্তন, রাজসভায় নৃত্যগীত ও মদ্যপান নিষিদ্ধকরণ, রাজকর্মচারী ও আমিরদের জন্য আলাদা পোশাকের ব্যবস্থা, নীচ বংশের লোকদের সাথে অবাধ মেলামেশা ও হাসি-ঠাট্টা পরিহার করে তিনি রাজা ও রাজতন্ত্রের মান সমুন্নত রাখেন। তাছাড়া তিনি সর্বদা শাহি পোশাকে সুসজ্জিত থেকে রাজতন্ত্রের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেন।

সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের মতিন সাহেবের কর্মকাণ্ডের সাথে সুলতানি যুগের গিয়াসউদ্দিন বলবনের কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজে পাওয়া যায় ।

মূলকথা : উদ্দীপকের মতিন সাহেবের ন্যায় সুলতান বলবন নিজ প্রতিষ্ঠান বা সাম্রাজ্যের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন নিয়মকানুন গ্রহণ করেছেন।

ঘ.উদ্দীপকে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি মতিন সাহেবের মনোভাবের সাথে সুলতান বলবনের শাসনব্যবস্থার যে দিকটি ফুটে উঠেছে তা হলো রাজতন্ত্র ও সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধির পদক্ষেপ ।

কারণ, বলবন বুঝতে পেরেছিল যে রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও বিদ্রোহ- বিশৃঙ্খলা দূর করতে হলে সুলতানদের মর্যাদাসম্পন্ন হতে হবে। তাই তিনি প্রথমে সুলতানদের মর্যাদা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মনে রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে ভীতির সঞ্চার করতে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি রাজকীয় মর্যাদা ও রাজার ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, রাজা হচ্ছেন 'আল্লাহর প্রতিনিধি' আর রাজার হৃদয় হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহের ভাণ্ডার। এজন্য তিনি 'জিল্লুল্লাহ” বা 'আল্লাহর ছায়া' উপাধি ধারণ করেন এবং রাজতন্ত্রকে শ্রদ্ধান্বিত করার জন্য মুদ্রায় আব্বাসীয় খলিফার নামাঙ্কিত করেন।

এছাড়া বলবন মনে করতেন, সুলতান নিজে নিজের সম্মান রক্ষা না করলে শাসিতরা অবাধ্য হয়ে পড়বে এবং অরাজকতা ও নৈরাজ্য দেখা দিতে পারে। প্রজাদের আনুগত্য নিশ্চিত ও সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্যই রাজার অতিমানবসুলভ ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা এবং স্বেচ্ছাচারী রাজক্ষমতা প্রয়োগ আবশ্যক। এরূপ ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি ও সুলতানকে সবার নিকট শ্রদ্ধান্বিত করার উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত 'কতগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন-

১। সিংহাসনে বলবনের বংশগত কোনো দাবি ছিল না; তাই জনসম্মুখে আত্মসম্মান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিজেকে পৌরাণিক বীর 'আফরাসিয়াবের' বংশধর বলে দাবি করেন;

২। রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি ধর্ম রক্ষা ও শরিয়তের শাসন কায়েম, পাপাচার ও দুর্নীতি বিলোপ, ধার্মিক ও সদ্বংশীয় লোকদের রাজকাজে নিয়োগ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

৩। জনমনে ভীতি ও শ্রদ্ধার উদ্রেক করার জন্য বলবন সেলজুক ও খাওয়ারিজম রাজকীয় ঐতিহ্যের অনুকরণে জমকালো রাজদরবার প্রতিষ্ঠা এবং সুলতানের আভিজাত্য রক্ষা ও তার অবাধ ক্ষমতা প্রমাণের জন্য পারস্য রীতি অনুযায়ী রাজদরবারে সুলতানকে সিজদাহ' আভূমি কুর্ণিশ) ও 'পাইবস' (পদচুম্বন) করার রীতি প্রচলন করেন। রাজদরবারের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য রক্ষায় রাজসভায় লঘু চপলতা, হাসিঠাট্টা বারণ এবং মদ্যপান ও নৃত্য-গীত নিষিদ্ধ করা হয়;

৪। তিনি সব সময় জনসাধারণের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন; সব সময় রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত থাকতেন। নীচ বংশীয় লোকদের সাথে মেলামেশা বা ..কথাবার্তা ও তাদের কোনো দান-উপহারও গ্রহণ করতেন না। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি মতিন সাহেবের মনোভাবে সুলতান বলবনের রাজোচিত জীবনাচরণ ও রাজকীয় মর্যাদা বৃদ্ধির দিকটি ফুটে উঠেছে।

প্রশ্ন-২। রিফাতকে তার মালিক দরিদ্র পিতামাতার নিকট থেকে টাকার বিনিময়ে লাভ করেন। তার নিঃসন্তান মালিক বিরাট শিল্পপতি। মতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে রিফাত তার মালিকের সাথে দক্ষতার সাথে কাজ করেন। নতুন প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক রিফাতকে মনোনীত করলেও নিঃসন্তান মালিক মৃত্যুর পূর্বে উত্তরাধিকার মনোনীত করে যেতে পারেনি। রিফাত তাঁর মালিকের সমস্ত সম্পত্তির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

ক. তৈমুর লঙ্গ কে ছিলেন?

খ. তৈমুর কেন ভারত আক্রমণ করেন?

গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত রিফাতের মধ্যে কার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. উদ্দীপকের ইঙ্গিতকৃত ব্যক্তি ছিলেন অনন্য কৃতিত্ব ও চরিত্রের অধিকারী- কথাটি বিশ্লেষণ কর।

উত্তর

ক, বিশ্বের ত্রাস সৃষ্টিকারী মোঙ্গল নেতা।

খ. ১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তৈমুর ভারত আক্রমণের উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনা করেন। অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে দিল্লিতে প্রবেশ করে টানা ১৫ দিন লুন্ঠন, হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে দিল্লিকে শ্মশানে পরিণত করেন। তার ভারত অভিযানের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল পৌত্তলিকতার বিনাশ সাধন। তাছাড়া ভারতের অতুলনীয় ধনসম্পদ তৈমুরকে ভারত আক্রমণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ভারত উপমহাদেশের অরাজক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে ভারত আক্রমণে প্রলুদ্ধ করে।

গ. উদ্দীপকে রিফাতের মধ্যে ইতিহাসের কুতুবউদ্দিন আইবেকের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।

কারণ, উদ্দীপকের রিফাতের ন্যায় কুতুবউদ্দিন আইবেকও ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার। শৈশবে কুতুবউদ্দিন পারস্যের একজন দাস ব্যবসায়ীর হাতে পড়েন। উক্ত পারসিক ব্যবসায়ী তাকে নিশাপুরের কাজি ফখরুদ্দিন আব্দুল আজিজ কুফীর নিকট কিন্তু করে দেন। কাজি তাঁর পুত্রদের সাথে আইবেকের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং তিনি ধর্মশাস্ত্র ও সমরবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কাজির মৃত্যুর পর তার পুত্রগণ কুতুবউদ্দিন আইবেককে একজন দাস ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। এ ব্যবসায়ী তাকে গজনির মুহাম্মদ ঘুরির নিকট বিক্রি করেন। কুতুবউদ্দিন দেখতে কুৎসিত হলেও জন্মসূত্রে তিনি নানা প্রশংসনীয় গুণসম্পন্ন ও চিত্রগ্রাহী ভাবমূর্তির অধিকারী ছিলেন। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস, দূরদৃষ্টি ও সমরকুশলতার গুণে আইবেক সামান্য অবস্থা থেকে মুহাম্মদ ঘুরির সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য অনুচরে পরিণত হন। ১১৯২-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি মুহাম্মদ ঘুরির প্রতিনিধি হিসেবে ভারত শাসন ও রাজ্য বিস্তারে নিয়োজিত ছিলেন। ঘুরি অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে কুতুবউদ্দিন ক্ষমতা গ্রহণ করে দিল্লি সালতানাতের পত্তন ঘটান। অনুরূপভাবে উদ্দীপকের রিফাতও নিঃসন্তান মালিকের কাছে সহায়তা করে তার ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করেন এবং কয়েকটি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। আবার মালিকের মৃত্যুর পর নিজে এর গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের রিফাতের মধ্যে কুতুবউদ্দিন আইবেকের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।


মূলকথা রিফাতের জীবন ও চরিত্রের সাথে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সাদৃশ্য রয়েছে।


ঘ. উদ্দীপকের রিফাত চরিত্রের মধ্য দিয়ে কুতুবউদ্দিন আইবেকের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। কুতুবউদ্দিন ছিলেন অনন্য কৃতিত্ব ও চরিত্রের অধিকারী- নিচে উক্তিটি বিশ্লেষণ করা হলো- কুতুবউদ্দিন আইবেক ছিলেন উন্নত চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারী। তিনি ছিলেন ক্ষমতাধর ও সুযোগ্য শাসক। একজন সামান্য ক্রীতদাস হিসেবে কর্মময় জীবন শুরু করে তিনি দিল্লির প্রথম স্বাধীন সুলতান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। অসাধারণ কর্মশক্তি ও উঁচুদরের প্রতিভাবান সামরিক নেতা হিসেবে তিনি তুর্কির অসম সাহসিকতার সাথে পারসিক মার্জিত রুচি ও উদারতার সমন্বয় সাধন করেন। কুতুবউদ্দিন শুধু বিজেতা এবং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, একজন যোগ্যতাসম্পন্ন শাসক হিসেবেও সমসাময়িক বিশ্বে খ্যাত ছিলেন। তার শান্তিময় রাজত্বকালে ধনাগারে কোনো প্রহরীর দরকার ছিল না, মেষপালকের কোনো রাখালের প্রয়োজন ছিল না। চোর ও চৌর্যবৃত্তি সম্বন্ধে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারত না। আইবেক একজন বিদ্যোৎসাহী শাসক হিসেবেও ইতিহাসে খ্যাত ছিলেন। হাসান নিজামি, ফখরে মুদাব্বির এবং জন্য উলামা ও বিদ্বান লোকদেরকে তিনি স্বীয় দরবারে উচ্চমর্যাদা দান করেন। স্থাপত্যশিল্পের প্রতিও কুতুবউদ্দিনের সমান অনুরাগ ছিল। দিল্লির কুতুব মিনার নির্মাণ ছিল তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এছাড়া ১১৯১-৯২ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে কুয়াত-উল- ইসলাম এবং আজমিরে 'আড়াই দিনকাঝোপড়া' মসজিদটি নির্মাণ করেন।


সুতরাং বলা যায়, দিল্লির প্রথম স্বাধীন সুলতান হিসেবে কুতুবউদ্দিন আইবেকের কৃতিত্ব ছিল অসাধারণ।


প্রশ্ন-৩। দ্বিজ বংশীয় রাজা মুকুল বসু সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য উত্তর- পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের দুর্ধর্ষ উপজাতিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নীতি অবলম্বন করেন। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে এ উপজাতিগুলো রাজা মুকুল বসুর সীমান্তে ঢুকে লুটতরাজ করত। যুদ্ধপ্রিয় রাজপুত। জাতির ষড়যন্ত্র ও সাম্রাজ্যবিরোধী কার্যকলাপ সম্রাটকে বেকায়দায় ফেলে দেয় এবং সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে প্রকম্পিত করে।


ক. দিল্লির কোন সুলতান 'রেশনিং' প্রথা চালু করেন?


খ. গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে ধারণা দাও।


গ. উদ্দীপকের রাজা মুকুল বসু যে সম্রাটের চরিত্র বহন করেন তার মোঙ্গল নীতির বর্ণনা দাও।


ঘ. তুমি কি মনে কর, বিভিন্ন উপজাতির বিদ্রোহ রাজা মুকুল বসুর মতো রাজার রাজ্য শাসনে বাধা সৃষ্টি করেছিল? মতামতের সপক্ষে যুক্তি দাও ।


উত্তর


ক. আলাউদ্দিন খলজি।


খ. এক নগণ্য পরিবারে জন্মগ্রহণকারী গিয়াসউদ্দিন সাধারণ সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। স্বীয় প্রতিভা, সাহস ও তীক্ষ্ণ মেধার বলে আলাউদ্দিন খলজির রাজত্বকালে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন এবং ১৩০৫ খ্রিষ্টাব্দে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত হন। সুলতান তাকে 'সেনাবাহিনীর প্রধান রক্ষক' উপাধিতে ভূষিত করেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে কমপক্ষে ১৮ বার মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করে গিয়াসউদ্দিন 'গাজি মালিক' বলে অভিহিত হন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অরাজকতা দেখা দিলে দিল্লির আমির-ওমরাহদের আমন্ত্রণে গিয়াসউদ্দিন সসৈন্যে দিল্লির উপকণ্ঠে সংঘটিত এক সংঘর্ষে খসরুকে পরাজিত করেন এবং ১৩২০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দিল্লির মসনদে আরোহণ করেন


মূলকথা : গিয়াসউদ্দিন তুঘলক সামান্য অবস্থা থেকে নিজ যোগ্যতার বলে একটি নতুন বংশের প্রতিষ্ঠাতায় পরিণত হন।


গ. উদ্দীপকের মুকুল বসুর চরিত্রে দিল্লি সালতানাতের অন্যতম শাসক সুলতান বলবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবিলা করা। সাম্রাজ্যেকে শত্রুমুক্ত রাখার জন্য তার গৃহীত মোঙ্গল নীতি সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-


প্রথমত, তিনি বৃদ্ধ সৈনিকদেরকে সেনাবাহিনী থেকে ক্রমান্বয়ে ছাঁটাই করে সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠিত করেন এবং তাদেরকে উন্নত ধরনের অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামে সুসজ্জিত করেন। দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্রসমূহে নতুন দুর্গ নির্মাণ এবং পুরনো দুর্গ সংস্কার করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করেন। তৃতীয়ত, সামানা, মুলতান এবং দিপালপুরকে নিয়ে সুলতান সীমান্তবর্তী প্রদেশ গঠন করে সুদক্ষ শাসনকর্তাদের উপর সেগুলোর শাসনভার অর্পণ করেন।

চতুর্থত, বলবন নতুন রাজ্য বিস্তার নীতি পরিহার করেন এবং কখনো দূরবর্তী এলাকায় যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করতেন না। মোঙ্গলদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার উদ্দেশ্যে তিনি সদাসর্বদা রাজধানীতেই অবস্থান করতেন।

পঞ্চমত, নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত অঞ্চলে সামানা ও সুনাম নামক দুটি প্রদেশ সৃষ্টি করে সুলতানের কনিষ্ঠ পুত্র বুগরা খানের উপর প্রদেশ দুটির শাসনভার ন্যস্ত করা হয় এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদকে সিন্ধু, মুলতান ও দিপালপুরের প্রদেশপাল নিয়োগ করা হয়।


ষষ্ঠত, ১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মোঙ্গলরা পাঞ্জাব আক্রমণ করলে শাহজাদা মুহাম্মদ বুগরা খান ও দিল্লির মালিক মুবারকের সহায়তায় মোঙ্গল অগ্রাভিযান প্রতিহত করা হয়। ১২৮৬

খ্রিষ্টাব্দে মোঙ্গলরা পুনরায় আক্রমণ করলে শাহজাদা মুহাম্মদ তাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিহত হন। বিক্ষুব্ধ বলবন সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে মোঙ্গলদের বিতাড়িত করেন এবং লাহোর উদ্ধার করেন।

পরিশেষে বলা যায়, তার অনুসৃত মোঙ্গল নীতি ও গৃহীত ব্যবস্থাবলি সাময়িকভাবে হলেও সাম্রাজ্যকে বহিরাক্রমণ থেকে রক্ষা করেছিল ।


মূলকথা : সুলতান বলবনের মোঙ্গল নীতির কারণে কিছু সময়ের জ দিল্লির সালতানাত মোঙ্গলদের ভয়াবহ আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।


ঘ. হ্যাঁ, আমি মনে করি, বিভিন্ন উপজাতির বিদ্রোহ রাজা মুকুলের মতো সুলতান বলবনের রাজ্য শাসনে বাধা সৃষ্টি করেছিল। কারণ, বলবন সিংহাসনে আরোহণ করে প্রায় শূন্য রাজকোষ, আমির-ওমরাহ ও অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান ঔদ্ধত্য, দ্বন্দ্ব-কলহ ও ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ, দিল্লির সন্নিকটস্থ মেওয়াটী দস্যুদের ক্রমবর্ধমান উপদ্রব, মোঙ্গলদের উপর্যুপরি আক্রমণে সাম্রাজ্যের সংকটাপন্ন অবস্থা প্রভৃতি বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন। তবে সুলতান বলবন এতে ভীত না হয়ে বরং বুদ্ধিমত্তার সাথে তা মোকাবিলা করে নিজ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেন। তাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় সরকার পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। অর্থনৈতিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে রাজকোষ পুনর্গঠন করেন এবং রাজস্বব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করেন। অতঃপর বলবন সাম্রাজ্যের মধ্যে বিদ্যমান সকল প্রকার অরাজকতা ও বিদ্রোহ দমনে তৎপর হয়ে ওঠেন। তার শাসনামলের প্রথমদিকে মেওয়াটী নামক রাজপুত দস্যগণ প্রকাশ্য দিবালোকে পথিকদের সর্বস্ব অপহরণ করে নিত, এমনকি দিল্লির উপকণ্ঠ পর্যন্ত পাইকারিভাবে নরহত্যা, লুটতরাজ এবং অত্যাচার কার্য চালিয়ে জনজীবন বিপন্ন করে তুলত। সুলতান বলবন বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফাঁড়ি স্থাপন করেন এবং শতসহস্র মেওয়াটীকে হত্যা করে দিল্লির উপকণ্ঠে শান্তি স্থাপন করেন।


এরপর সুলতান বলবন দোয়াবের দুর্ধর্ষ হিন্দুদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং কাম্পিল, পাতিওয়ালা ও ভূজপুরে অবস্থিত তাদের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো অধিকার করে সেখানে দুর্গ নির্মাণ করেন। এভাবে বলবন দোয়াবের বিদ্রোহ দমন করেন এবং বাংলাদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত সড়কপথের নিরাপত্তা বিধান করেন। অতঃপর বলবন জুদ পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয়দের বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করেন। রোহিলাখণ্ডের হিন্দুগণ বিদ্রোহের ধ্বজা উত্তোলন করলে বলবন তাদেরকেও সমুচিত শাস্তি প্রদান করেন। তাছাড়া ইলতুৎমিশের গঠিত চল্লিশ চক্রের' জঘন্য ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে তাদের বিশেষ সুবিধা বাতিল করে ও সামান্য অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে তাদের ক্ষমতা খর্ব করেন।

উল্লিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে বলবন সমগ্র সালতানাতে সংহতি আনয়ন, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা বিধান করতে সক্ষম হন। সুতরাং বলা যায়, বিভিন্ন উপজাতির বিদ্রোহ উদ্দীপকের রাজা। মুকুল বসুর মতো সুলতান বলবনের রাজ্য শাসনে বাধা সৃষ্টি করলেও সুলতান তা নিজ দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা দ্বারা মোকাবিলা করে রাজ্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


প্রশ্ন-৪। কুসুম পত্রিকা পড়ে জানতে পারে যে, দেশে নতুন একটি সরকার ক্ষমতায় বসে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করে। সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করে, তাদের বেতন-ভাতা, পেনশন বৃদ্ধি করে। নৌবাহিনীকে 'আবু বকর' ও 'হায়দার' নামে দুটি যুদ্ধজাহাজ দেয়। বিমানবাহিনীকে আধুনিক যুদ্ধবিমান দেয়। সংবাদ পড়ে কুসুম এ সরকারকে গিয়াসউদ্দিন বলবনের সাথে তুলনা করে।


ক. গিয়াসউদ্দিন তুঘলক কে?

খ. গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের প্রাথমিক জীবন ব্যাখ্যা কর। গ. উদ্দীপকের দেশের নতুন সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাকে কুসুমের গিয়াসউদ্দিন বলবনের সাথে তুলনা কর।

ঘ. উদ্দীপকে গিয়াসউদ্দিন বলবনের সব সংস্কার প্রতিফলিত হয়নি— কথাটি বিশ্লেষণ কর।


উত্তর


ক. গিয়াসউদ্দিন তুঘলক ছিলেন তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা।


খ. নিতান্তই সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী গিয়াসউদ্দিন তুঘলক প্রথমে সিন্ধুর এক বণিকের অধীনে চাকরি করেন।

পরবর্তীকালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং নিজ প্রতিভা, সাহস ও যোগ্যতাবলে সুলতান আলাউদ্দিন খলজির সময় সুদক্ষ সমরনায়করূপে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৩০৫ ২ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান তাকে পাঞ্জাবের গভর্নর নিয়োগ করেন। তার কর্তব্যপরায়ণতায় মুগ্ধ হয়ে আলাউদ্দিন খলজি তাকে উত্তর- পশ্চিম সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব দেন। তিনি ১৮টি মোঙ্গল অভিযান প্রতিহত করে গাজি মালিক উপাধিতে ভূষিত হন। আলাউদ্দিন খলজির মৃত্যুর পরও নিজের অবস্থান ও প্রতিপত্তি বজায় রাখতে সক্ষম হন।


মূলকথা : অতি সাধারণ অবস্থা থেকে দ্বীয় বুদ্ধি ও সাহস দ্বারা ইতিহাসের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।


গ. উদ্দীপকের কুসুমের দেশের নতুন সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার সাথে ইতিহাসে গিয়াসউদ্দিন বলবনের সামরিক সংস্কারের সাদৃশ্য রয়েছে।


উদ্দীপকে আলোচ্য দেশের সরকার ক্ষমতায় বসে প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার সাধন করে। সেনাবাহিনীর অনেকেরই পদোন্নতি করে এবং সেনাখাতে বেতন-ভাতা, পেনশন বৃদ্ধি করে। তাছাড়া নৌবাহিনীকে 'আবু বকর' ও 'হায়দার' নামে দুটি যুদ্ধজাহাজ দেয়। এছাড়া বিমানবাহিনীকে আধুনিক যুদ্ধবিমান দেয়। অনুরূপভাবে, ইতিহাসের গিয়াসউদ্দিন বলবনও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সামরিক খাতে সংস্কার সাধন করেন। তিনি পূর্বের জায়গির প্রথা বিলুপ্ত করে নগদ বেতনে সৈন্য বিভাগে সৈন্য নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। তিনি তাদের নানা সুযোগ-সুবিধাসহ বর্ধিত বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করেন। বয়োবৃদ্ধ সৈনিক, তাদের বৃদ্ধ, নাবালক ও = অকর্মণ্য উত্তরাধিকারীদের জায়গিরের পরিবর্তে ভাতা ও পেনশনদানের বন্দোবস্ত করেন। তবে দিল্লির কোতোয়াল ফখরুদ্দিনের অনুরোধে তিনি কোনো কোনো জায়গিরদারকে জমি ফিরিয়ে দেন। সৈন্যবাহিনীকে অশ্বারোহী, পদাতিক ইত্যাদি ভাগে বিন্যস্ত করে কর্মদক্ষ সেনাপতিদের অধীনে ন্যস্ত করেন। এ উদ্দেশ্যে ইমাদ-উল-মুলককে 'দিওয়ান ই- 'আরজ' পদে নিযুক্ত করেন।সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের আলোচ্য সরকারের প্রতিরক্ষা খাতে সংস্কারের সাথে ইতিহাসের গিয়াসউদ্দিন বলবনের তুলনা যথার্থ ।


মূলকথা : গিয়াসউদ্দিন তুঘলক শাসনকার্যে স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য সামরিক সংস্কার সাধন করেন।


ঘ. উদ্দীপকের সরকারের সাথে গিয়াসউদ্দিন বলবনের কেবল সামরিক সংস্কারের সাদৃশ্য রয়েছে; অর্থাৎ উদ্দীপকে বলবনের সব সংস্কার প্রতিফলিত হয়নি। নিচে উক্তিটি বিশ্লেষণ করা হলো- বলবন বুঝতে পেরেছিলেন, রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও বিদ্রোহ- বিশৃঙ্খলা দূর করতে হলে সুলতানদের মর্যাদাসম্পন্ন হতে হবে। তাই তিনি প্রথমে সুলতানদের মর্যাদা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মনে রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে ভীতির সপ্তার করতে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। ধর্মকে রক্ষা ও শরিয়তের শাসন কায়েম, পাপাচার ও দুর্নীতির বিলোপ সাধন, সৎ, ধর্মপরায়ণ লোকদের রাজকার্যে নিয়োগ এবং সুষ্ঠু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজতন্ত্রের মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেন। তিনি মনে করতেন, স্বেচ্ছাচারী রাজাই পারেন জনগণের আনুগত্য লাভ ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি পারস্যের অনুকরণে রাজকীয় দরবার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। রাজসভায় নৃত্যগীত ও মদ্যপান নিষিদ্ধকরণ, রাজকর্মচারী ও আমিরদের জন্য আলাদা পোশাকের ব্যবস্থা, নীচ বংশের লোকদের সাথে অবাধ মেলামেশা ও হাসি-ঠাট্টা পরিহার, পারসিক কায়দায় সিজদা ও পাইবস রীতির প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি রাজা ও রাজতন্ত্রের মান সমুন্নত রাখেন।


সুলতান ইলতুৎমিশের গঠিত চল্লিশ চক্র তার মৃত্যুর পর পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের আমলে সর্বেসর্বা হয়ে উঠলে বলবন তাদের ক্ষমতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে বিশেষ সুবিধা বাতিল করেন। জনগণের মন থেকে চল্লিশ চক্রের প্রভাব দূর করার জন্য সামান্য অপরাধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেন। শাসনক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করলেও বলবন ছিলেন ন্যায়বিচারের প্রতীক। স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে নিষ্ঠার সাথে বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহতকরণ এবং সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিধানের জন্য গঠিত সৈন্যবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণপোষণের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি রাজস্বব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করেন। তাছাড়া নিজের স্বেচ্ছাচারিতা ও একাধিপত্যকে সম্পূর্ণরূপে চালু রাখার উদ্দেশ্যে এবং রাজপরিবারের সদস্যসহ অভিজাত সম্প্রদায় ও আমির-ওমরাহদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী গুপ্তচর বাহিনী গঠন করেন।


সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে কেবল গিয়াসউদ্দিন বলবনের সামরিক সংস্কারের দিকটি ফুটে উঠেছে, বাকি সংস্কারসমূহের দিকটি প্রকাশ পায়নি।


মূলকথা : গিয়াসউদ্দিন বলবন দিল্লি সুলতানকে সুদৃঢ় করার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করেছিলেন।

প্রশ্ন-৬। মাহিমের দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়ে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় বসে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই উক্ত সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এটিকে সরকার মহাপরিকল্পনা বলে ঘোষণা দেয়। সরকারি এই ব্যবস্থার কথা পত্রিকায় পড়ে মাহিম এই সরকারকে দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক বলে অভিহিত করেন।


ক. দিল্লির কোন যুগকে তুর্কি যুগ বলা হয়?


খ. দিল্লির প্রাথমিক সুলতানি যুগকে মামলুক যুগ বলা হয় কেন? ২ গ. উদ্দীপকের সরকারকে মাহিমের মুহাম্মদ বিন তুঘলক অভিহিত করার কারণ ব্যাখ্যা কর।


ঘ. মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ব্যর্থতা থেকে উদ্দীপকের সরকার কীভাবে শিক্ষা নিতে পারে? বিশ্লেষণ কর।


উত্তর


ক. ১২০৬-১২৯০ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত সময়কালকে দিল্লির তুর্কি যুগবলা হয়।


খ. কুতুবউদ্দিন আইবেক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ সাধারণত মামলুক বা দাস বংশ নামে পরিচিত। ১২০৬ থেকে ১২৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে এ বংশ শাসনকার্য পরিচালনা করে। এ বংশের উল্লেখযোগ্য তিনজন শাসকই যথা— কুতুবউদ্দিন আইবেক, ইলতুৎমিশ ও গিয়াসউদ্দিন বলবন প্রথম জীবনে ক্রীতদাস ছিলেন। এ কারণে তাদের শাসনকালকে দাস বংশ বা মামলুক বংশ বলা হয়। মূলকথা : প্রাথমিক পর্যায়ের শাসকগণ জীবনের প্রথমে ক্রীতদাস ছিলেন বলে এ বংশকে মামলুক বংশ বলা হয়।


গ. উদ্দীপকের সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল; অনুরূপভাবে দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকও শাসনব্যবস্থায় সংস্কার সাধনের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। মাহিম কর্তৃক উদ্দীপকের সরকারকে মুহাম্মদ বিন তুঘলক নামে অভিহিত করার যথার্থতা নিরূপণের চেষ্টা করা হলো-


মুহাম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন উচ্চাভিলাষী সুলতান। রাজত্বের প্রথমভাগে পাঁচটি উচ্চাকাঙ্ক্ষামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। প্রকৃতি অনুযায়ী এ পরিকল্পনাসমূহকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়;


যথা- ক. শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা এবং খ. রাজ্য বিজয় পরিকল্পনা। সুলতানের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক পদক্ষেপ ছিল দিল্লি থেকে দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর। মূলত মোঙ্গল আক্রমণ থেকে দিল্লিকে রক্ষা, কৌশলগত সুবিধা, প্রশাসনিক কারণ এবং অবাধ্য দিল্লিবাসীদের সমুচিত শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে সুলতান ১৩২৬- ২৭ খ্রিষ্টাব্দে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন; যা ছিল মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালের উল্লেখযোগ্য ও অভিনব একটি পদক্ষেপ। ১৩২৯-১৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত সোনা ও রৌপ্যমুদ্রার পরিবর্তে তাম্রমুদ্রা প্রবর্তন করেন। দিল্লি সালতানাতের 'শস্যভাণ্ডার' নামে খ্যাত দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি ছিল মুহাম্মদ বিন তুঘলকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিকল্পনা। সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং শাসনব্যবস্থাকে সুগঠিত ও কার্যক্রম পরিচালনা করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের উদ্দেশ্যে সুলতান দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি করেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির ন্যায় মুহাম্মদ বিন তুঘলকও বিশ্ব জয়ের লক্ষ্যে রাজ্যবিস্তারের দুটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন; যথা- ক. খোরাসান অভিযান পরিকল্পনা এবং খ. কারাচিল অভিযান পরিকল্পনা।


সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, এ উদ্দীপকের সরকারের ন্যায় মুহাম্মদ বিন তুঘলক মহাপরিকল্পনা | ব গ্রহণ করেছিলেন ।


মূলকথা : উচ্চাভিলাষী সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন।


ঘ. উদ্দীপকে আলোচ্য সরকারের গৃহীত মহাপরিকল্পনায় মুহাম্মদ বা বিন তুঘলকের গৃহীত মহাপরিকল্পনার চিত্র ফুটে উঠেছে।


উচ্চাভিলাষী মুহাম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। রাজত্বের প্রথমভাগে পাঁচটি উচ্চাকাঙ্ক্ষামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন; কিন্তু বিভিন্ন কারণে তার এ পরিকল্পনাসমূহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সুলতানের প্রথম পরিকল্পনা ছিল রাজধানী দিল্লি থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর; কিন্তু দিল্লির জনগণ নতুন পরিবেশ ও দেবগিরির আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং হিন্দু-অধ্যুষিত দেবগিরিতে দিল্লির মুসলমানদের বসবাসে অসম্মতি থাকায় এ পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। তাছাড়া মোঙ্গল আক্রমণের আশঙ্কায় উত্তর ভারতে সুলতানের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা এবং এতদঞ্চলের উপর সুলতানের আধিপত্যের শিথিলতা ইত্যাদি কারণেও এ পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং তিনি পুনরায় দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর করেন। পারস্যের তদানীন্তন ইলখানি শাসক আবু সাইদের দুর্বলতার সুযোগে ও দিল্লির দরবারে আশ্রয়প্রাপ্ত কতিপয় খোরাসানি আমিরের প্ররোচনায় সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক খোরাসানে আক্রমণ করেন। কিন্তু এ সময় মধ্য এশিয়ায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ট্রান্স অক্সিয়ানায় মোঙ্গল নেতা তারমাশিরীনের ক্ষমতাচ্যুতি এবং মিসরের সুলতান নাসির ও পারস্য সম্রাট সাঈদের মধ্যে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ায় সুলতান তার অভিযানের সাফল্যে সন্ধিহান হয়ে পরিকল্পনা বন্ধ করেন। এতে অযথা রাজ্যের অনেক অর্থ ব্যয় হয়, বহু লোক কর্মহীন হয় এবং সুলতানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।


সুলতানের ৩য় পরিকল্পনা তাম্রমুদ্রা প্রবর্তনও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়; এ ব্যবস্থা প্রবর্তনে মুদ্রার মান কমে যায় এবং মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। জনগণ জাল মুদ্রায় রাজস্ব পরিশোধ করায় রাষ্ট্র আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কারাচিল অভিযানে সেনাপতির হঠকারিতা, পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক বাধা এবং আকস্মিক প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে সুলতানি বাহিনী বিপর্যস্ত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে; উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুলতান পার্বত্য সর্দারদের আনুগত্য ও করদানের স্বীকৃতি আদায় করে অভিযানের সমাপ্তি টানেন। তাছাড়া দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধির ফলে কৃষকদের যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়; ঠিক সেই সময়ই বর্ধিত হারে রাজস্ব আরোপের ফলে কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে বিদ্রোহ শুরু করে। ফলে এ পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়। তাই বলা যায়, কোনো দেশের প্রধান যদি জনগণের দিক না বুঝে নিজের খেয়ালের বশে কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তা কখনো সফল হয় না। জনগণের উন্নয়নের লক্ষ্যে তথা দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে যদি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতেই হয় তবে সে বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এর সুফল-কুফল দিকটি বিবেচনা করে তবেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ব্যর্থতা থেকে উদ্দীপকের সরকার এ শিক্ষাটি গ্রহণ করবে বলে আমি মনে করি।


প্রশ্ন-৭। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনক্ষমতা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সোহাগ তার বন্ধু সুমনকে বলে, এমন একজন শাসক এ উপমহাদেশ শাসন করেছেন, যিনি প্রথম জীবনে মোঙ্গলদের নিকট বন্দি হয়ে বাগদাদে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রীত হন। যখন তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তখন সেনাবাহিনী পুনর্গঠন, দিল্লির নিরাপত্তা বিধান, দোয়াবে বিশৃঙ্খলা দমনসহ নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেন।


ক. মোঙ্গলদের একজন দুর্ধর্ষ নেতা কে ছিলেন?

খ. সুলতান রজিয়ার কৃতিত্ব ব্যাখ্যা কর ।

গ. উদ্দীপকে যে শাসকের পরিচয় ফুটে উঠেছে শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনে তার কৃতিত্ব ব্যাখ্যা কর।

ঘ. তুমি কি মনে কর, দিল্লির নিরাপত্তা বিধানে ওই শাসক সক্ষম হয়েছিলেন? তোমার মতের সপক্ষে যুক্তি দাও ।


উত্তর


ক. মোঙ্গলদের একজন দুর্ধর্ষ নেতা ছিলেন চেঙ্গিস খান।


খ. ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাসে রাজিয়াই ছিলেন একমাত্র নারী, যিনি দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।

ঐতিহাসিক মিনহাজের রচনায় জানা যায়, সুলতান রাজিয়া ন্যায়, সততা, সুবিচার ও সুদক্ষ শাসক ছিলেন। যুদ্ধবিদ্যায় তিনি যেমন পারদর্শিনী ছিলেন তেমনি দয়া-দাক্ষিণ্যে, বিদ্বানের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি ছিলেন সাহসী, ধৈর্যশীলা, বিচক্ষণা ও দৃঢ় চরিত্রের অধিকারিণী। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহ দমনের সাথে সাথে রাষ্ট্রকে সুসংহত করেন। মূলকথা : তিনি ছিলেন বিচক্ষণা, পারদর্শী যোদ্ধা ও দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী।


গ. উদ্দীপকে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের পরিচয় ফুটে উঠেছে। শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনে গিয়াসউদ্দিন বলবনের কৃতিত্ব নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-


বলবন সিংহাসনে আরোহণ করে প্রথমে শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন। সুলতান ইলতুৎমিশের সময় থেকে আমিরদের হাতে অনেক ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল। সুলতান আমিরদের সম্মান করতেন এবং নিজের সমতুল্য মনে করতেন। ইলতুৎমিশের শাসনে একনায়কত্ব ছিল না অর্থাৎ সুলতান এবং আমিরদের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন করা ছিল। ইলতুৎমিশের দুর্বল উত্তরাধিকারীদের সময় এ ব্যবস্থার কুফল ধরা পড়ে। তাই বলবন এ ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করেন। তিনি মনে করেন, সুলতান সব ক্ষমতার উৎস, ক্ষমতার বণ্টন মানে দুর্বলতা। তাই বলবন প্রথমেই সুলতানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং তার শাসনব্যবস্থায় আমিররা সুলতানের হুকুমবরদার বা আজ্ঞাবাহক ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, সুলতান স্বীয় মর্যাদা রক্ষা না করলে তার কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে নির্বাহ করা যায় না, ফলে শাসিতরা অবাধ্য হয়ে পড়ে এবং অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখা দেয় । পরিশেষে বলা যায়, গিয়াসউদ্দিন বলবন আমির-ওমরাহদের ক্ষমতা হ্রাস করে সুলতানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন, যার মাধ্যমে রাজ্যের বিশৃঙ্খলা দূর হয়।


মূলকথা : উদ্দীপকে গিয়াসউদ্দিন বলবনের পরিচয় ফুটে উঠেছে।


ঘ. গিয়াসউদ্দিন বলবন বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে রাজ্যের নিরাপত্তা বিধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি দিল্লির নিরাপত্তা বিধানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। নিচে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো-


শাসনব্যবস্থা এবং সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠনের পর সুলতান বলবন রাজধানী দিল্লির নিরাপত্তা বিধান ও দস্যুদের দমন করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল দিল্লির চতুর্দিকে এবং দোয়াব অঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা। ওই সময় মেওয়াটি দস্যুরা নানারূপ গোলযোগ সৃষ্টি করত। তারা দিল্লির চতুর্দিকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুটতরাজ এবং দস্যুবৃত্তিতে তৎপর ছিল। তাদের উৎপাত এমন বৃদ্ধি পায় যে, মাঝে মধ্যে তারা দিল্লিতে প্রবেশ করে নিরীহ লোকদের উপর জোরজুলুম করত এবং শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটাত। তাদের উৎপাত এতই বৃদ্ধি পায়, আসরের নামাজের পর দিল্লির পশ্চিম দিকের গেট ও সদর দরজা বন্ধ করে দিতে হতো। সুলতান সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠন করার পর দিল্লিকে এ মেওয়াটি দস্যুদের অত্যাচার থেকে মুক্ত করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। দস্যুরা যেসব জঙ্গলে আশ্রয় নিত, তিনি সেসব জঙ্গল পরিষ্কার করেন এবং দস্যুদের কঠোর শাস্তি দেন। তিনি ওই এলাকায় স্থানে স্থানে অনেক থানা স্থাপন করে দুর্ধর্ষ আফগান সেনাপতিদের হাতে ন্যস্ত করেন। তারা যাতে তাদের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারেন, সেজন্য আফগানদের জন্য বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করেন। তিনি বিভিন্ন ধরনের কাজের মাধ্যমে দিল্লির নিরাপত্তা বিধান করেন।


সুতরাং বলা যায়, গিয়াসউদ্দিন বলবন তার বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, দক্ষতা ও কঠোরতার মাধ্যমে দিল্লি থেকে সমস্ত মেওয়াটি দস্যু, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী দলকে বিতাড়িত করেন। এবং পরিপূর্ণভাবে দিল্লির নিরাপত্তা বিধানে সক্ষম হন।

মূলকথা : গিয়াসউদ্দিন বলবন দিল্লি থেকে মেওয়াটি দস্যু, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী দলকে নির্মূল করেন এবং ওই এলাকায় থানা স্থাপন করে আফগান সৈন্যদের দিল্লির নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত করেন।


প্রশ্ন-৯। জমিদার আবুল হাসান মৃত্যুর পূর্বে তার বিদুষী ও বুদ্ধিমতী কন্যা হাসনা বানুকে তার বিশাল জমিদারির উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। আপনজনদের নানামুখী বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে তাকে জমিদারি হারাতে হয়েছিল। কিন্তু শত্রুদের হাতে তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর পুনরায় তিনি জমিদারি ফিরে পান। সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীসুলভ দুর্বলতার কারণে তিনি নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কাঙ্ক্ষিত সফলতার পরিচয় দিতে পারেননি । | সকল বোর্ড - ২০১৬/

ক. 'আইবেক' শব্দের অর্থ কী?

খ. রক্তপাত ও কঠোর নীতি কেন গ্রহণ করা হয়েছিল?

গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত জমিদারের কন্যার সাথে দিল্লি সালতানাতের কোন শাসকের মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. হাসনা বানু ও উক্ত নারী শাসকের ব্যর্থতার কারণ একই সূত্রে গাঁথা- উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।

উত্তর

ক. 'আইবেক' শব্দের অর্থ চন্দ্রদেবতা।

খ. সুলতান ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পরবর্তী ত্রিশ বছর তার উত্তরাধিকারীদের অযোগ্যতার দরুন রাষ্ট্রের কার্যাবলি বিশৃঙ্খলায় পতিত হয়। তাই অভ্যন্তরীণ দৈন্য ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলা করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে গিয়াসউদ্দিন বলবন 'Blood and Iron Policy, অর্থাৎ 'রক্তপাত ও কঠোর নীতি গ্রহণ করেন।


মূলকথা : শাসনব্যবস্থা সুদৃঢ়ীকরণে রক্তপাত ও কঠোর নীতি গ্রহণ করেন।


গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত জমিদারের কন্যার সাথে দিখি সালতানাতের শাসক সুলতান রাজিয়ার মিল রয়েছে। নিচে সুলতান রাজিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হলো-

সুলতান রাজিয়া ইলতুৎমিশের কন্যা ছিলেন। ইলতুৎমিশ কন্যা রাজিয়াকেই তার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত5

করেন। কিন্তু দিল্লির অভিজাত তুর্কি আমিররা একজন নারীর ক্ষমতারোহণ মেনে নিতে পারেননি। তাই তারা রাজিয়ার স্থলে ইলতুৎমিশের পুত্র রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে সমাসীন করেন। কিন্তু অল্প দিনেই রুকনউদ্দিন ফিরোজের অযোগ্য শাসনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে সে সুযোগে তার উচ্চাভিলাষী মাতা শাহ তুরকান ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু মাতা-পুত্রের যথেচ্ছ ও স্বেচ্ছাচারী শাসনে আমির-ওমরাহরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। মুলতান, লাহোর, বদাউন ও হানসির শাসনকর্তারা সেনাদলসহ দিল্লির দিকে এগিয়ে এলে রুকনউদ্দিন বাধা দিতে গিয়ে নিহত হন। সে সুযোগে সুলতান রাজিয়া দিল্লির আমিরদের সহায়তায় সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান রাজিয়ার অভিষেক সম্পন্ন হয়।

উপরের আলোচনার আলোকে বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত জমিদারকন্যার সাথে দিল্লি সালতানাতের শাসক সুলতান রাজিয়ার মিল রয়েছে।

মূলকথা : সুলতান রাজিয়ার সাথে মিল রয়েছে।


ঘ. উদ্দীপকের হাসনা বানু ও উক্ত নারী শাসকের ব্যর্থতার কারণ একই সূত্রে গাঁথা। নিচে উক্তিটি বিশ্লেষণ করা হলো-

দিল্লি সালতানাতের এক ক্রান্তিলগ্নে সুলতান রাজিয়া সিংহাসন লাভ করে অত্যন্ত দক্ষতা ও প্রশাসনিক কার্যকলাপের দ্বারা দিল্লি সালতানাতের সংহতি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেও বিভিন্ন কারণে তার পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। কারণগুলো হলো,


⇒ তিনি ছিলেন বিচক্ষণ, ন্যায়নিষ্ঠ, দয়াশীল ও জ্ঞানী-গুণীর পৃষ্ঠপোষক, ন্যায়বিচারক, প্রজাকল্যাণকামী, ও সুনিপুণ সমরকুশলী। একজন শাসকের সব গুণ থাকা সত্ত্বেও তিনি শাসক হিসেবে ব্যর্থ হন। এ ব্যর্থতাই তার পতনের জন্য দায়ী। ⇒ তিনি পুরুষের পোশাক পরে প্রকাশ্যে দরবারে রাজকার্য পরিচালনা এবং অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করায় গোঁড়া মুসলমানরা তার উপর ক্ষিপ্ত হয়। ⇒ হাবসি ক্রীতদাস ইয়াকুতের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ও উচ্চপদে নিযুক্তি অভিজাত ও আমিরদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল ।


⇒ ভি. ডি. মহাজন বলেন, “যদি রাজিয়া একজন নারী না হতেন, তাহলে তিনি ভারতের অন্যতম সফলকাম শাসক হতে পারতেন। কিন্তু তার বড় দুর্বলতা ছিল যে, তিনি একজন নারী, যা তার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।” উপরের আলোচনার থেকে এ কথা বলা যায়, উদ্দীপকের হাসনা বানু ও দিল্লি সালতানাতের একমাত্র নারী শাসক সুলতান রাজিয়ার ব্যর্থতার কারণ একই সূত্রে গাঁথা। মূলকথা : উক্তিটির যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে।


প্রশ্ন-১১। একটি পাঁচ টাকার কয়েন পালয়ে করে তা দশ টাকায় বিক্রি করার ফলে হঠাৎ করে ‘ক’ দেশে ধাতব মুদ্রার অভাব দেখা দেয় । অভাব মোকাবিলায় সরকার উর্বর দক্ষিণ | অঞ্চলের কর বৃদ্ধি করে। ওদিকে ব্যবসায়ীরা মুদ্রার অভাবে সিলযুক্ত কাগজের স্লিপ ব্যবহার করতে থাকে, কিন্তু অসাধু ব্যক্তিরা এসব স্লিপ জাল করে দেশের অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। [সকল বোর্ড-২০১৫|


ক. কারাচিল কোথায় অবস্থিত?


খ. দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তরের প্রধান কারণটি ব্যাখ্যা কর। ২ গ. উদ্দীপকে উল্লেখিত উর্বর দক্ষিণাঞ্চলের সাথে ভারতের কোন অঞ্চলের তুলনা করা যায়? ব্যাখ্যা কর ।


ঘ. উদ্দীপকে উল্লিখিত মুদ্রাব্যবস্থার মতোই মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ‘প্রতীক মুদ্রা' পরিকল্পনাটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়- উক্তিটি মূল্যায়ন কর।


উত্তর


ক. কারাচিল চীন ও ভারতের মধ্যবর্তী হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত।


খ. সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর করে এর নতুন নামকরণ করেন দৌলতাবাদ। দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তরের প্রধান কারণ ছিল ভৌগোলিক অবস্থান ও গুরুত্ব। দৌলতাবাদ ছিল বিশাল দিল্লি সালতানাতের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। তাই প্রশাসনিক সুবিধার্থে রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে রাজধানী স্থাপন অধিক যৌক্তিক বলে মনে করা হয়েছিল। তাছাড়া দাক্ষিণাত্যের উপর নজরদারি বহাল রাখার জন্যও দেবগিরি দিল্লি অপেক্ষা উপযুক্ত স্থান ছিল।


মূলকথা : ভৌগোলিক অবস্থান ও গুরুত্বের কারণে রাজধানী দৌলতাবাদে স্থানান্তর করা হয়েছিল।


গ. উদ্দীপকে ধাতব মুদ্রার অভাব মোকাবিলায় সরকার উর্বর দক্ষিণাঞ্চলে কর বৃদ্ধি করে। এখানে যে দক্ষিণাঞ্চলের কথা বলা

হয়েছে,


তার সাথে ভারতের দোয়াব অঞ্চলের তুলনা করা যায়। ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নতি, লেনদেন ও বিনিময় সহজ করার জন্য সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার স্থলে প্রতীকী তাম্রমুদ্রা প্রবর্তন করেন। ফলে মুদ্রার মান কমে যায় এবং মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় মুদ্রা ব্যাপকভাবে জাল হতে থাকে এবং জনগণ জাল মুদ্রার রাজস্ব পরিশোধ করায় রাষ্ট্র আর্থিক ক্ষতির রুপার- সম্মুখীন হয়। ব্যবসায়-বাণিজ্য ব্যাহত হয় এবং সোনা ও অভাব ইত্যাদি কারণে দেশে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে মুহাম্মদ বিন তুঘলক প্রতীকী তাম্রমুদ্রা বাতিল করেন এবং রাজাদের সমস্ত আসল ও নকল তাম্রমুদ্রার বিনিময়ে রাজকোষ থেকে রৌপ্যমুদ্রা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। এর ফলেও রাষ্ট্রের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়। এ ক্ষতি থেকে উত্তরণের জন্য সুলতান দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধির আদেশ জারি করেন। গঙ্গা ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী উর্বর অঞ্চল দোয়াব নামে পরিচিত। দিল্লি সালতানাতের শস্যভাণ্ডার নামে খ্যাত এ দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি ছিল মুহাম্মদ বিন তুঘলকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ ।


মূলকথা : ভারতের দোয়াব অঞ্চল দিল্লি সালতানাতের 'শস্যভাণ্ডার' নামে খ্যাত ছিল।


ঘ. সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ১৩২৯-৩০ খ্রিষ্টাব্দে প্রচলিত স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার পরিবর্তে তাম্রমুদ্রা প্রবর্তন করেন।


এটি ছিল সুলতানের একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন, “সুলতান ছিলেন প্রভতিভাবান, তিনি সৃজনশীল ও পরীক্ষামূলক পরিকল্পনা গ্রহণে আনন্দ পেতেন।” অনেকে মনে করেন, চীনের মোঙ্গল সম্রাট কুবলাই খান এবং পারস্যের গাইকাতুর খানের প্রতীকী কাগজি মুদ্রার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সুলতান প্রতীকী তাম্রমুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। সুলতান স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার মতো তাম্রমুদ্রাকেও বিনিয়োগ প্রতীকী মুদ্রা বলে ঘোষণা করেন । সন্দেহ নেই পরিকল্পনা হিসেবে সুলতানের এ পদক্ষেপ তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। তবে তার মুদ্রানীতি কার্যকর করার বিষয়টি ছিল ত্রুটিযুক্ত। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, সুলতানের এ পরিকল্পনাটি যুগের অগ্রগামী ছিল। ফলে জনগণ এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। রক্ষণশীল জনগণ একে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি। তাছাড়া তাম্রমুদ্রা প্রচলনে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় মুদ্রা ব্যাপকভাবে জাল হতে থাকে। জাল নিরোধে সরকারি পদক্ষেপ না থাকায় অসাধু ব্যক্তিরা অসংখ্য জাল মুদ্রা তৈরি করে বাজারে ছাড়ে। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে মুহাম্মদ বিন তুঘলক প্রতীকী তাম্রমুদ্রা বাতিল করেন এবং বাজারের সমস্ত আসল ও নকল তাম্রমুদ্রার বিনিময়ে রাজকোষ থেকে রৌপ্যমুদ্রা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।


এভাবে সুলতানের তাম্রমুদ্রা প্রচলন ব্যর্থ হয়ে পড়ে। উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, “উদ্দীপকে উল্লেখিত মুদ্রাব্যবস্থার মতোই মুহাম্মদ বিন তুঘলকের 'প্রতীক মুদ্রা' পরিকল্পনাটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।


মূলকথা : তাম্রমুদ্রা জনগণ গ্রহণ না করায় এবং ব্যাপক জাল মুদ্রা তৈরি হওয়ায় এটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল।


প্রশ্ন-১২। মি. আলেক্স উত্তরাধিকার সূত্রে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হন । ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি লক্ষ করলেন অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণে সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। তিনি নিজেকে “ঈশ্বরের প্রতিনিধি' বলে ঘোষণা করেন। সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করেন। রাজতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার জন্য কঠোর নীতি অবলম্বন করেন । তার এ পদক্ষেপ সাম্রাজ্যের সংহতির জন্য সহায়ক হয়। তিনি দীর্ঘদিন দাপটের সাথে শাসনকার্য পরিচালনায় সক্ষম |


সকল বোর্ড-২০১৮/


ক. . কার নামানুসারে কুতুব মিনার নামকরণ করা হয়?


খ. ক্ষমতা গ্রহণের পর ইলতুৎমিশের সমস্যা চিহ্নিত কর।


গ. উদ্দীপকের সাথে দাস বংশের কোন শাসকের কর্মকাণ্ডের মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা কর ।


ঘ. উক্ত শাসকের পদক্ষেপ সালতানাতের ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিল-মন্তব্য কর।


উত্তর


ক. সুফি সাধক কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকির নামানুসারে কুতুব মিনার নামকরণ করা হয়।


খ. ১২১১ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আসীন হয়ে শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হন !


কুতবি আমিরদের সিংহাসন লাভের ষড়যন্ত্র ইলতুৎমিশের জন্য একটি বড় সমস্যা ছিল। একই সাথে সিন্ধুতে নাসিরউদ্দিন কুবাচা স্বাধীনতা ঘোষণা করে পাঞ্জাবের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। গজনির সুলতান তাজউদ্দিন ইয়ালদুজ তখনো মুহাম্মদ ঘুরির ভারত উপমহাদেশস্থ রাজ্য অধিকারের আশা পোষণ করেন। বাংলায় আলী মর্দান খলজি দিল্লির অধীনতা অস্বীকার করেন এবং নিজেকে সুলতান আলাউদ্দিন উপাধিতে ভূষিত করেন। হিন্দু রাজা ও সর্দাররাও স্বাধীনতা হারিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কয়েকজন কুতবি আমির ইলতুৎমিশের শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করলে এ বিপদ আরও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া দুর্ধর্ষ মোঙ্গল অনুপ্রবেশ তার অন্যতম সমস্যা ছিল।


মূলকথা : ক্ষমতা গ্রহণের পর ইলতুৎমিশ অভ্যন্তরীণ ও বহিঃসমস্যায় পড়েন।


গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত মি. আলেক্সের কর্মকাণ্ডের সাথে দিল্লি সালতানাতের দাস বংশের সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবনের কর্মকাণ্ডের মিল রয়েছে।


উদ্দীপকে বর্ণনা করা হয়েছে, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি মি. আলেক্স ক্ষমতা গ্রহণের পর অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর মুখোমুখি হন। এসব শত্রু দমন এবং নিজ ক্ষমতা সুদৃঢ় করতে তিনি নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন- তিনি নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে ঘোষণা করেন। সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করেন এবং রাজতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার জন্য কঠোর নীতি অবলম্বন করেন। নিজ ক্ষমতা সুদৃঢ়ীকরণে মি. আলেক্সের কর্মকাণ্ডের সাথে দিল্লি সালতানাতের দাস বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের কর্মকাণ্ডের মিল পাওয়া যায়। বলবন ক্ষমতায় উপবিষ্ট হয়ে দেখেন রাজ্যময় বিশৃঙ্খলা, জনগণ শাসক শ্রেণিকে সম্মান করছে না, তুর্কি আমির ও সভাসদদের ঔদ্ধত্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরম পর্যায়ে উপনীত, দুর্ধর্ষ মোঙ্গল জাতির পুনঃপুন আক্রমণ প্রভৃতি দিল্লি সালতানাতকে পতনের দিকে ধাবিত করছে। এজন্য নিজ ক্ষমতা ও দিল্লি সালতানাতকে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী করতে বলবন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । তিনি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে 'Blood and Iron Policy' বা 'রক্তপাত ও কঠোর নীতি' অবলম্বন করেন। তিনি সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মনে রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে ভীতির সঞ্চার করতে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি মনে করতেন যে, শাসক হচ্ছেন ‘আল্লাহর প্রতিনিধি'; এজন্য তিনি 'জিল্লুল্লাহ' বা 'আল্লাহর ছায়া' উপাধি ধারণ করেন। শাসনকাজের স্থিতিশীলতা ও রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা আনতে তিনি সামরিক বাহিনীর সংস্কার করেন। তাছাড়া অশান্তি সৃষ্টিকারী ও উদ্ধৃত চল্লিশ চক্রের ক্ষমতা বিলোপ সাধন করেন। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োচিত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে বলবন দিল্লি সালতানাতের ভিত্তি শক্তিশালী করেন; যা উদ্দীপকের মি. আলেক্সের কর্মকাণ্ডের সাথে মিল রয়েছে।


মূলকথা : মি. আলেক্স ও সুলতান বলবনের কর্মকাণ্ড সাদৃশ্যপূর্ণ।


ঘ. হ্যাঁ, উক্ত শাসক অর্থাৎ সুলতান বলবনের গৃহীত পদক্ষেপ দিল্লি সালতানাতের ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিল। বলবনের পদক্ষেপ যেভাবে সালতানাতের ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিল তা নিচে আলোচনা করা হলো-


সুলতান বলবন অরাজকতাপূর্ণ ও ভীতিকর একটি সাম্রাজ্য লাভ করেছিলেন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হন যে রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও বিদ্রোহ- বিশৃঙ্খলা দূর করতে হলে সুলতানদের মর্যাদাসম্পন্ন হতে হবে। তাই তিনি প্রথমে সুলতানদের মর্যাদা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মনে রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে ভীতির সঞ্চার করতে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি মনে করতেন, রাজা হচ্ছেন 'আল্লাহর প্রতিনিধি' আর রাজার হৃদয় হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহের ভাণ্ডার। এজন্য তিনি 'জিল্লুল্লাহ' বা 'আল্লাহর ছায়া' উপাধি ধারণ করেন এবং রাজতন্ত্রকে শ্রদ্ধান্বিত করার জন্য মুদ্রায় আব্বাসীয় খলিফার নামাঙ্কিত করেন। তিনি রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি ও সালতানাতের ভিত্তি সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করেন-


১। সিংহাসনে বলবনের বংশগত কোনো দাবি ছিল না; তাই জনসম্মুখে আত্মসম্মান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিজেকে পৌরাণিক বীর 'আফরাসিয়াবের' বংশধর বলে দাবি করেন;


২। রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি ধর্ম রক্ষা ও শরিয়তের শাসন কায়েম, পাপাচার ও দুর্নীতি বিলোপ, ধার্মিক ও সদবংশীয় লোকদের রাজকাজে নিয়োগ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন;


৩। জনমনে ভীতি ও শ্রদ্ধার উদ্রেক করার জন্য বলবন সেলজুক ও খাওয়ারিজম রাজকীয় ঐতিহ্যের অনুকরণে জমকালো রাজদরবার প্রতিষ্ঠা, সুলতানের আভিজাত্য রক্ষা ও তার অবাধ ক্ষমতা প্রমাণের জন্য পারস্য রীতি অনুযায়ী রাজদরবারে সুলতানকে ‘সিজদাহ' (আভূমি কুর্ণিশ) ও 'পাইবস' (পদচুম্বন) করার রীতি প্রচলন করেন। রাজদরবারের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য রক্ষায় রাজসভায় লঘু চপলতা, হাসিঠাট্টা বারণ এবং মদ্যপান ও নৃত্য-গীত নিষিদ্ধ করা হয়;


৪। তিনি সব সময় জনসাধারণের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে, চলতেন; সব সময় রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত থাকতেন। নীচ বংশীয় লোকদের সাথে মেলামেশা বা কথাবার্তা ও তাদের কোনো দান-উপহারও গ্রহণ করতেন না।

'তবে সালতানাতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে বলবন আরও কিছু কাজ করেন। যেমন- উদ্ধত আমির চল্লিশ চক্রের ক্ষমতা বিলোপ, রাজকোষ পুনর্গঠন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও গুপ্তচর প্রথা প্রচলন, মেওয়াটি, দোয়াব, কাথিয়া উপজাতি প্রভৃতি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন এবং দুর্ধর্ষ মোঙ্গলদের প্রতিহত করেন। এভাবে সুলতান বলবনের গৃহীত পদক্ষেপ দিল্লি সালতানাতের ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিল।


মূলকথা : বলবনের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পদক্ষেপ দিল্লি সালতানাতকে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী করেছিল।


প্রশ্ন-১৩। জনাব আলিম এক সংকটাপন্ন অবস্থায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেশের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি কর আদায়ে উদারতা ও যুদ্ধ অপেক্ষা শান্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি কর্মসংস্থান এবং কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের প্রতি সহায়তাদানসহ বহু জনহিতকর কাজ সম্পাদন করেন। এতে রাজকোষের ঘাটতি দেখা দিলেও একজন প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।


(সকল বোর্ড-২০১৮।


ক. ‘ভারতের তোতাপাখি' কাকে বলা হয়?


খ. মালিক কাফুরের খ্যাতির কারণ কী?

গ. উদ্দীপকের শাসকের সাথে তুঘলক বংশের কোন শাসকের সাদৃশ্য রয়েছে? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. উদ্দীপকের আলোকে উক্ত শাসকের সংস্কার কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন কর।


উত্তর


ক. আমির খসরুকে 'ভারতের তোতাপাখি' বলা হয়।


খ. ‘হাজার দিনারি' উপাধিপ্রাপ্ত মালিক কাফুর ছিলেন একজন খোজা হিন্দু ও আলাউদ্দিন খলজির সেনাপতি। আলাউদ্দিন খলজি তার ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে 'মালিক, 'তাজ-উল-মালিক-কাফুরি' উপাধিতে ভূষিত করেন। তার এ খ্যাতির কারণ হলো তিনি তার অসামান্য রণকৌশল দ্বারা দাক্ষিণাত্যের দেবগিরি, তেলিঙ্গানা, হয়সোল ও দ্বারসমুদ্র জয় করে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ও মুসলিম সালতানাতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন ।


মূলকথা : দাক্ষিণাত্য বিজয় মালিক কাফুরকে খ্যাতির শীর্ষে উপনীত করেছে।


গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত শাসকের সাথে ভারতের দিল্লি সালতানাতের তুঘলক বংশের তৃতীয় শাসক ফিরোজ শাহ তুঘলকের সাদৃশ্য রয়েছে। এ সম্পর্কে নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-


উদ্দীপকে বর্ণিত জনাব আলিমের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করার সাথে ফিরোজ শাহের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করার সাদৃশ্য দেখা যায়। ১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ বিন তুঘলক মৃত্যুবরণ করার পর • সিংহাসন শূন্যতার সুযোগে মোঙ্গল সেনা ও বিদ্রোহী আমির-ওমরাহগণ সুলতানি প্রাসাদ ও সম্পদ লুণ্ঠনের চেষ্টা করেছিলেন। এ অবস্থায় মুহাম্মদ বিন তুঘলকের অনুগত আমির-ওমরাহগণ তার চাচাতো ভাই ফিরোজ শাহকে সিংহাসনে বসতে অনুরোধ করেন। ঐতিহাসিক শামস-ই- সিরাজি আফিফের মতে, “ফিরোজ শাহ প্রথমে সিংহাসনে বসতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও সেনাপতি ও আমিরদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হন। উদ্দীপকের শাসকক্ষমতা গ্রহণের পর কর আদায়ে উদারতা দেখিয়েছেন এবং যুদ্ধনীতি অপেক্ষা শান্তিনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। এরূপ উদারতা ও যুদ্ধনীতি ফিরোজ শাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফিরোজ শাহ রাজ্য • জয়ে তেমন আগ্রহী ছিলেন না; তবে বাধ্য হয়ে বাংলা, উড়িষ্যা, নাগরকোট, সিন্ধু ও গুজরাটের বিদ্রোহ দমনে অভিযান করেছিলেন কিন্তু সন্ধি ও করের বিনিময়ে তিনি সর্বত্র শান্তি স্থাপন করেন। ফিরোজ শাহ প্রজাদের ঋণ মওকুফ করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত চার প্রকার কর ব্যতীত সব ধরনের বৈধ-অবৈধ কর রহিত করে উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া সুলতান ফিরোজ শাহ উদ্দীপকের আলিম সাহেবের মতো কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের প্রতি সহায়তা প্রদানসহ বহু জনহিতকর কাজ করেছেন। ফিরোজ শাহের এ ধরনের জনহিতকর কার্যাবলি মাতামহীসুলভ ব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত হয়। এ কাজের জন্য তিনি 'দিওয়ান-ই-খয়রাত' নামে আলাদা একটি বিভাগ চালু করেন। তিনি বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা করেন।

উপর্যুক্ত ব্যাখ্যার আলোকে বলা যায় যে, উদ্দীপকের শাসক জনাব আলিমের রাজক্ষমতা গ্রহণ ও শাসন কার্যাবলির সাথে তুঘলক শাসক সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের ক্ষমতা গ্রহণ ও কার্যাবলির সাদৃশ্য রয়েছে।


মূলকথা : তুঘলক শাসক ফিরোজ শাহের সাথে উদ্দীপকের শাসকের সাদৃশ্য রয়েছে।


ঘ. উদ্দীপকের জনাব আলিমের মতো ফিরোজ শাহ তুর্থলকও বহু সংস্কারমূলক কাজ করেছেন, বিশেষ করে রাজস্ব সংস্কার, সামরিক সংস্কার ও যুদ্ধনীতি, মুদ্রা সংস্কার, করনীতি, জায়গিরদার প্রথা প্রভৃতি সংস্কারমূলক কার্যাবলির জন্য ফিরোজ শাহ ইতিহাসে একজন আলোচিত সমালোচিত শাসক হিসেবে পরিচিত। নিচে তার সংস্কারমূলক কাজের মূল্যায়ন করা হলো-


সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক তার সংস্কারমূলক কার্যাবলির দ্বারা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও তাকে অনেক ক্ষেত্রে তুঘলক বংশের পতনের জন্য দায়ী করা হয়।


প্রথমত, ফিরোজ শাহ যদিও জনপ্রিয় সুলতান ছিলেন, কিন্তু সিংহাসনের মূলভিত্তিকে তিনি রক্ষা করতে পারেননি। সাম্রাজ্যের বিদ্রোহ, বিশৃঙ্খলা দমনে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যর্থ । রাজ্য বিস্তার নীতি পরিহার করে তিনি সাম্রাজ্য রক্ষার পরিবর্তে ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিয়েছিলেন।


দ্বিতীয়ত, তার আরেকটি বড় ভুল ছিল জায়গিরদারি প্রথার পুনঃপ্রবর্তন। এর ফলে অভিজাতবর্গ ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে এবং কেন্দ্রীয় শাসনের ক্ষমতা শিথিল হয়ে পড়ে। ভি. ডি. মহাজন বলেন, “বড় বড় জায়গির প্রদান বিপদের সৃষ্টি করে এবং পরিণামে তা তুঘলক সাম্রাজ্যের পতনের পথ সৃষ্টি করে।”


তৃতীয়ত, তিনি সেনাবাহিনীতে বংশানুক্রমিক চাকরির অধিকার প্রদান করে সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের মূলে কুঠারাঘাত করেন। এই নীতি তার সামরিক বাহিনীর যোগ্যতা ও দক্ষতা বহুল পরিমাণে ব্যাহত করেছিল।


চতুর্থত, তার করপ্রথা নির্ধারণ জনকল্যাণকামী ও ইসলামের আদর্শভিত্তিক হলেও যুগোপযোগী কর রহিত করায় রাজস্বের ঘাটতি দেখা যায়। এক্ষেত্রে তিনি করের হার কমাতে পারতেন। তাই বলে মাত্র চার ধরনের কর বজায় রেখে অন্য সব কর রহিত করা তার ঠিক হয়নি।


পঞ্চমত, সুলতান যুদ্ধনীতি পরিহার করায় সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ষষ্ঠত, সুলতান ফিরোজ শাহ শাসনকার্যে উলামাদের প্রাধান্য দেওয়ায় অসুন্নি মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের রোষানলে পতিত হন। সপ্তমত, অপরাধীদের শাস্তি প্রদান রহিত করার ফলে দুর্নীতি বেড়ে যায় এবং দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীরা সরকারি অর্থসম্পদ লুট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে রাজ্যের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। সর্বোপরি ফিরোজ শাহের সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড রাজকোষের আর্থিক ঘাটতি ও সালতানাতের ভিতকে দুর্বল করলেও সাম্রাজ্যে শান্তি স্থাপন ও প্রজাকল্যাণের ক্ষেত্রে এসব সংস্কার. চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


মূলকথা : ফিরোজ শাহ তুঘলকের সংস্কারমূলক কার্যাবলির ভালো-মন্দ উভয় দিকই ছিল।


প্রশ্ন-১৪। শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে আধুনিক বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর দেশ-বিদেশের কতিপয় অভিজাত শ্রেণির সমালোচনার মুখোমুখি হন। কিন্তু নিজ মেধা ও কর্মদক্ষতার গুণে তিনি সব বিশৃঙ্খলা দূর করে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন । [ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম-২০১৭/


ক. সালতানাতের শেষ সুলতান কে ছিলেন?


খ. আলাউদ্দিন খলজির মোঙ্গল নীতি ব্যাখ্যা কর।

গ. উদ্দীপকে বর্ণিত মহিলা শাসকের সাথে দিল্লি সালতানাতের কোন মহিলা শাসকের সাদৃশ্য রয়েছে? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. উক্ত মহিলা শাসকের কৃতিত্ব তোমার পাঠ্যবইয়ের আলোকে বিচার কর।


উত্তর


ক. নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ।

খ. মোঙ্গলরা ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে ভারতে আক্রমণ চালাত এবং হত্যা ও ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে চলে যেত। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নতুন নতুন দুর্গ নির্মাণ করেন এবং পুরাতন দুর্গগুলো সংস্কার করেন। তিনি অপেক্ষাকৃত যোগ্য সেনাপতিগণকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিয়োগ দেন। এছাড়া মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এক বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন । এগুলোই আলাউদ্দিন খলজির মোঙ্গল নীতি ।


মূলকথা : মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য আলাউদ্দিন খলজি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তা-ই মোঙ্গল নীতি।

দক্ষ


গ. উদ্দীপকে বর্ণিত মহিলা শাসক অর্থাৎ শ্রীমাভো বন্দর নায়েকের সাথে দিল্লি সালতানাতের প্রথম এবং একমাত্র মহিলা শাসক সুলতান রাজিয়ার সাদৃশ্য রয়েছে। নিচে তার সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-


সুলতান রাজিয়া ছিলেন সুলতান ইলতুৎমিশের কন্যা। ইলতুৎমিশের পুত্ররা ছিল অকর্মণ্য ও অযোগ্য। পক্ষান্তরে সুলতান রাজিয়া ছিলেন বিদুষী, দূরদর্শী ও শাসন পরিচালনায় অধিকতরযোগ্য। তাই ইলতুৎমিশ তার কন্যা রাজিয়াকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু দিল্লির অভিজাত তুর্কি আমিররা একজন নারীর ক্ষমতারোহণকে মেনে নিতে পারেননি, তাই তারা রাজিয়ার স্থলে ইলতুৎমিশের পুত্র রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে বসান। কিন্তু রুকনউদ্দিনের কুশাসনে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। মুলতান, লাহোর, বদাউন ও হাদির শাসনকর্তারা সেনাদলসহ দিল্লির দিকে এগিয়ে এলে রুকনউদ্দিন বাধা দিতে গিয়ে নিহত হন। এই সুযোগে সুলতান রাজিয়া দিল্লির আমিরদের সহায়তায় ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন ।


পরিশেষে বলা যায়, সুলতান রাজিয়া ছিলেন দূরদর্শী ও উচ্চাভিলাষী শাসক। তিনি একজন নারী হয়েও মধ্যযুগের ইতিহাসে ভারতবর্ষের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।


মূলকথা : উদ্দীপকের শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের সাথে দিল্লির সুলতান রাজিয়ার সাদৃশ্য রয়েছে।


ঘ. ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মহিলা শাসক সুলতান রাজিয়া ছিলেন অসাধারণ কৃতিত্বসম্পন্ন শাসক। স্বীয় যোগ্যতা ও দূরদর্শিতা দিয়ে তিনি বিরোধী আমির-ওমরাহদেরকে নিজের পক্ষে নিয়ে এসেছিলেন। নিচে শাসক হিসেবে সুলতান রাজিয়ার কৃতিত্ব মূল্যায়ন করা হলো-


সুলতান রাজিয়া যে একজন কৃতিত্বসম্পন্ন শাসক ছিলেন সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা মধ্যযুগে একজন নারীর পক্ষে শাসনক্ষমতা গ্রহণ করা সাধারণ কথা নয়। সুলতান রাজিয়া সিংহাসনে আরোহণের পরপরই তিনি নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হন। উজির জুনাইদি ও অন্য ক্ষমতাবান আমিরগণ তার বিরোধিতা করেন। রাজিয়া স্বীয় সাহস ও চাতুর্যের দ্বারা বিদ্রোহী মালিক ও শত্রুদের কঠোরহস্তে দমন করেন। বঙ্গদেশ ও উচ্-এর শাসনকর্তাগণও তার আনুগত্য স্বীকার করে নেন। মিনহাজ উস সিরাজ তার 'তাবকাত-ই- নাসিরি' গ্রন্থে বলেন, 'লক্ষ্মণাবতী থেকে দেবল ও ডামরিলা পর্যন্ত এলাকার সব মালিক ও আমির তার আনুগত্য ও প্রভুত্ব স্বীকার করে নেন।' মূলাহিদ ও কারামতি সম্প্রদায়ের বিদ্রোহও তিনি কঠোরহস্তে দমন করেন ।মুসলিম শাসনের ইতিহাসে রাজিয়াই একমাত্র নারী, যিনি দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। দীর্ঘদিন রাজত্ব করতে না পারলেও তিনি তাঁর দক্ষতা, যোগ্যতা ও অসাধারণ শাসন কৌশল দ্বারা দিল্লি সালতানাতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন। ঐতিহাসিক মিনহাজের রচনা থেকে জানা যায় যে, রাজিয়া ন্যায়, সততা, সুবিচার ও সুদক্ষ শাসনের যথেষ্ট পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নির্ভীক যোদ্ধা ও সেনাপতি। দয়া- দাক্ষিণ্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতায়ও তার অসামান্য অবদান ছিল। তাই বলা যায়, ভারতীয় সালতানাতের ইতিহাসে সুলতান রাজিয়ার অবদান অসামান্য।


মূলকথা: সুলতান রাজিয়া ভারতবর্ষের প্রথম নারী শাসক।


প্রশ্ন-১৭। উচ্চাভিলাষী জমিদার প্রবাল রায়ের অত্যাচার ও কঠোর কর আদায় নীতির কারণে সাধারণ প্রজাগণ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় বন্ধ করে দেয়, কৃষক কৃষিকাজ ফেলে পালিয়ে যায়। বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের অনুরোধে চাচাতো ভাই শ্যামল রায় নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে জমিদারির দায়িত্ব নেন। তিনি জমিদারের প্রতি প্রজাদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক জনকল্যাণকর কাজ করেন। তিনি সাধারণ প্রজার বকেয়া কর মাফ করে দেন। ব্যবসায়ীদের বকেয়া কর ও ঋণ মাফ করে দেন। নতুনভাবে কাজ শুরু করার জন্য আবার ঋণ প্রদান করেন । তবে অধিক হারে ঋণ প্রদান ও বেহিসাবি দান- খয়রাতের ফলে রাজকোষে প্রচণ্ড অর্থঘাটতি দেখা দেয়। ফলে জমিদারির দূরবস্থার জন্য তাকে দায়ী করা হয়।


[ যশোর, বরিশাল, কুমিল্লা, সিলেট, দিনাজপুর বোর্ড-২০১৭|


ক. মালিক কাফুর কে ছিলেন?


খ. দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধির কারণ কী? ব্যাখ্যা কর।

গ. উদ্দীপকে উল্লেখিত জমিদার শ্যামল রায়ের সাথে কোন ভারতীয় সুলতানি শাসকের সাদৃশ্য রয়েছে? ব্যাখ্যা কর ।

ঘ. উদ্দীপকের জমিদার শ্যামল রায়ের মতো উক্ত সুলতানকেও তার বংশের পতনের জন্য দায়ী করা যায় কি? উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও ।


উত্তর


ক. সুলতান আলাউদ্দিনের শ্রেষ্ঠ ও নির্ভীক সেনাপতি ।


খ. সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ক্ষমতা লাভের পর রাজস্ব বিভাগের কিছু সংস্কার করেন। ১৩৩৪ খ্রিষ্টাব্দে দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি তারই অংশবিশেষ ছিল। গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী উর্বর অঞ্চলে কর বৃদ্ধি করার পেছনে সুলতানের উদ্দেশ্য ছিল সে অঞ্চলের বিদ্রোহী প্রজাদের শাস্তি প্রদান করা। হেগের মতে, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও শাসনব্যবস্থাকে কার্যক্ষম করার উদ্দেশ্যে দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি করা হয়। এছাড়া রাজধানী স্থানান্তর, খোরাসান ও কারাচিল অভিযান এবং মুদ্রা প্রবর্তনের ফলে রাজকোষ অর্থশূন্য হয়ে পড়লে তিনি দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি করেন।


মূলকথা : রাজস্ব ঘাটতিই দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধির প্রধান কারণ।


গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত প্রজাদরদি রাজার কার্যাবলি দিল্লি সালতানাতের মুঘল বংশীয় শাসক ফিরোজশাহ তুঘলকের কার্যাবলিকে ইঙ্গিত করে।


ফিরোজশাহ কৃষির উন্নতির জন্য বহুসংখ্যক সেচ ও খাল খনন করেন। এ খালগুলো-


১. শতদ্রু নদী ঘাগর নদী পর্যন্ত বিস্তৃতকরণ, ২. মাধুরী ও সিরমুর পর্বতের কাছ থেকে হাপি ও হিসার পর্যন্ত বিস্তৃতকরণ, ৩. ঘাগর নদী থেকে হিরণীখেরা গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃতকরণ ও ৪. যমুনা নদী থেকে ফিরোজাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃতকরণ।

এছাড়াও সুলতানের আদেশে ১৫০টি কূপ খনন করা হয়েছিল, এসব সেচখাল ও কূপ খননের ফলে অসংখ্য অনুর্বর, অনাবাদি ও পতিত জমি কৃষিকাজের উপযোগী হয়। জনগণের * কল্যাণার্থে তিনি নতুন কয়েকটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তার প্রবর্তিত এ ব্যবস্থাবলি 'মাতামহীসুলভ' ব্যবস্থা নামে পরিচিত। মহানুভব সুলতান দরিদ্র মুসলিম কন্যাদের বিবাহের জন্য এবং অনাথ ও বিধবাদের ভরণপোষণের জন্য "দিওয়ান- ই-খয়রাত' নামের একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে এবং দরিদ্র প্রজাদের সাহায্যদানের জন্য 'দেওয়ান-ই-ইস্তিকার' নামক আরেকটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর জন্য বার্ষিক বরাদ্দ ছিল ৩৬ লাখ তঙ্কা। সুলতান রাজ্যের বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য চাকরি দপ্তর স্থাপন করেন। দিল্লির কোতোয়ালের উপর কর্মক্ষম বেকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব প্রদান করা হতো। তাদের সার্বিক অবস্থা ও গুণাবলি দেখে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেওয়া হতো। তিনি দিল্লিতে একটি বিরাট হাসপাতাল নির্মাণ করেন, যার নাম ছিল ‘বিমারিস্তান'। গরিব রোগীদের এখানে রাষ্ট্রীয় খরচে চিকিৎসা ও ওষুধপথ্য প্রদান করা হতো।


মূলকথা : উদ্দীপকের প্রজাদরদি শাসকের সাথে সুলতান ফিরোজশাহ তুঘলকের সাদৃশ্য রয়েছে।


ঘ. অনেকেই ফিরোজশাহ তুঘলকের কার্যাবলিকে তার বংশের পতনের জন্য দায়ী করেন, আমিও অনেকাংশে তাদের সাথে একমত। উত্তরের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হলো-


মানবতাবাদী ও বিচক্ষণ নরপতি ফিরোজশাহের কিছু মহৎ উদ্দেশ্য ও জনহিতকর কার্যক্রম তার রাষ্ট্রীয় সংহতি ও অর্থনৈতিক অবস্থাকে সংকটাপন্ন করে। তার যেসব মানবীয় সংস্কার ও উদার নীতির মধ্যে তুঘলক বংশের পতনের বীজ নিহিত ছিল-


প্রথমত, সুলতান ফিরোজশাহ দুর্বল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। কঠোরতা প্রদর্শন করে নয়, ক্ষমা ও উদারতা দ্বারা তিনি জনগণের মন জয় করতে চেয়েছিলেন। রক্তপাত পছন্দ করতেন না বলে তিনি সমরাভিযান প্রত্যাহার করে নেন এবং এর ফলে হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এতে তুঘলক সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়ে পড়ে, বাংলা স্বাধীন হয়ে যায়। এবং দাক্ষিণাত্য দিল্লির প্রভুত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সুলতানের অত্যধিক কোমলতার কারণে জনগণ শ্রদ্ধা করত কিন্তু ভয় করত না, তার এ চারিত্রিক দুর্বলতা সালতানাতের ভিত্তি দুর্বল করেছিল।


দ্বিতীয়ত, জায়গির প্রথার পুনঃপ্রবর্তন সুলতানের মারাত্মক পদক্ষেপ ছিল, যার ফলে অভিজাতবর্গ ও সামন্তপ্রভুরা নিজ নিজ এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং সুলতানের নির্ভরতার কারণে তাদের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পায় ।


তৃতীয়ত, সুলতানের দুর্বল সেনাবাহিনী তুঘলক বংশের | পতনের জন্য দায়ী ছিল এবং এ দুর্বলতার মূলে ছিল বন্ধ ৩ | অযোগ্য লোকের সমাবেশ ও জায়গির প্রথার পুনঃপ্রবর্তন।। সেনাবাহিনীতে বংশানুক্রমিক চাকরির অধিকার প্রদান মানবতার দিক থেকে প্রশংসনীয় হলেও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি /

সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল।


চতুর্থত, দেওয়ান-ই-খয়রাত' প্রতিষ্ঠা করে দুস্থদের বিশাল ক্রীতদাস বাহিনী গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের জনহিতকর কর্মকাণ্ডের ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে। এতে একদিকে অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে যায়।ক্রীতদাসগণ বিভিন্ন অনাচার ও অবিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এভাবে ফিরোজশাহ তুঘলকের কার্যাবলি তুঘলক বংশের পতনে |

সাথে সরাসরি জড়িত না থাকলেও এর পতনের পথ সুগম করেছিল।


মূলকথা : সুলতান ফিরোজশাহ তুঘলকের মাতামহীসুলভ আচরণই বংশের পতনের পথ ত্বরান্বিত করেছিল।


প্রশ্ন-১৮। উত্তরাধিকার সূত্রে তকী খান এক বিশাল জমিদারির মালিক হন। তিনি এতিম, অসহায়দের সাহায্যার্থে বিভিন্ন দফতর প্রতিষ্ঠা করেন এবং এ কাজে রাজকোষের প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। এছাড়া জমিদারি পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিশেষ করে খাজনা-ট্যাক্স আদায়ে যথেষ্ট নমনীয়তার পরিচয় দেন। এতে জমিদারের প্রতি জনগণের ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশ পেলেও রাজ্যে সুদূরপ্রসারী আর্থিক সংকট দেখা দেয়। যার পরিণতিতে ধীরে ধীরে জমিদারি পতনের দিকে ধাবিত হয়।


(সকল বোর্ড-২০১৫ |


ক. ফিরোজশাহ তুঘলক কত খ্রিষ্টাব্দে সালতানাতে অধিষ্ঠিত হন?


খ. ফিরোজশাহ ছিলেন ক্রীতদাসদের প্রতি অনুরক্ত- ব্যাখ্যা কর ।


গ. উদ্দীপকে তকী খানের প্রজাহিতৈষী কাজের সাথে তোমার পঠিত কোন শাসকের কাজের সাদৃশ্য রয়েছে? ব্যাখ্যা কর


ঘ. উদ্দীপকে উল্লিখিত তকী খানের জমিদারির পরিণতির সাথে তুঘলক বংশের পরিণতি আলোচনা কর ।


উত্তর


ক. ফিরোজশাহ তুঘলক ১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দে সালতানাতে অধিষ্ঠিত হন।


খ. ফিরোজশাহ তুঘলক ক্রীতদাসদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তার সময়ে সাম্রাজ্যে ১,৮০,০০০ জন দাস ছিল এবং এদের মধ্যে ৪০,০০০ জন্য রাজপ্রাসাদে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিল। বিশাল এ দাস বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের সুযোগ- সুবিধা তদারকির জন্য সুলতান 'দেওয়ান-ই-বন্দেগান' নামে একটি পৃথক দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে তাদের উপযুক্ত শিক্ষা এবং চাকরির সুবন্দোবস্ত করা হয়েছিল। এ কারণে ফিরোজশাহ তুঘলকের সময় দাস প্রথার বিস্তার ঘটে।


মূলকথা : ফিরোজশাহ তুঘলক দাসদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছিলেন।


গ. উদ্দীপকে তকী খানের সাথে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের কাজের সাদৃশ্য রয়েছে। ফিরোজশাহ তুঘলক একজন দয়াদ্রচিত্ত ও প্রজারঞ্জক সুলতান ছিলেন। তার প্রজাহিতৈষী কয়েকটি পদক্ষেপ ইতিহাসে ‘মাতামহীসুলভ' ব্যবস্থা নামে পরিচিত।


এ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য দিকের মধ্যে ছিল বিবাহ দপ্তর, চাকরি দপ্তর ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা। দিওয়ান-ই-খায়রাত'-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিবাহ দপ্তরের মাধ্যমে গরিব ও অনাথ মুসলিম মেয়েদের সরকারি খরচে বিয়ে এবং বেওয়ারিশ লাশের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো। চাকরি দপ্তরের কাজ ছিল যোগ্যতা অনুযায়ী বেকার যুবকদের চাকরির ব্যবস্থা করা। দিওয়ান-ই-ইস্তিকাক নামক দপ্তর থেকে দরিদ্র, অনাথ ও বিধবাদের আর্থিক সাহায্য দেওয়া হতো। প্রজাসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুলতান ‘দার-উস-শেফা', “বিমারিস্তান' বা 'সিফাখানা' নামক দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন, করেছিলেন। এসব দাতব্য চিকিৎসালয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, এমনকি দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধও সরবরাহ করা হতো। জনদুর্ভোগ লাঘব, রায়তদের অবস্থার উন্নতি এবং জনপ্রশাসনের প্রতি তাদের অবস্থা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সুলতান কৃষকদের বকেয়া সরকারি ঋণ মওকুফ করে দেন | পূর্ববর্তী সময়ে কৃষকদের উপর যেসব অবৈধ ও নিপীড়নমূলক কর ধার্য করা হয়েছিল তা বাতিল করা হয় ।


মূলকথা : ফিরোজশাহ তুঘলক একজন পয়ানচিত্ত ও প্রজারঞ্জক সুলতান ছিলেন।


ঘ. উদ্দীপকে তকী খানের জমিদারি যেভাবে ধীরে ধীরে পতনের দিকে ধাবিত হয় সেভাবেই সুলতান ফিরোজশাহ তুঘলকের সংস্কারমূলক কার্যক্রমের পর তুঘলক বংশের পতন শুরু হয়।


ফিরোজশাহ তুঘলক বহুবিধ সংস্কারসাধনসহ জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলেও তার কোনো কোনো নীতি ও কাজ শুধু তুঘলক বংশের নয়, দিল্লি সালতানাতের পতনের জন্যও দায়ী ছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, পূর্ববর্তী শাসনকালের বিপরীতে ফিরোজের রাজত্বকালে কোমলতা ও বহু জনহিতকর কাজ পরিদৃষ্ট হলেও তার শাসনকাল অনেকাংশে দিল্লির সালতানাতের ভিত্তিকে দুর্বল করেছিল। উদারচিত্ত ও দুর্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী সুলতান ফিরাজশাহ কঠোরতার পরিবর্তে কোমলতা ও দয়া-দাক্ষিণ্য দ্বারা প্রজাসাধারণের আনুগত্য নিশ্চিত করতে প্রয়াসী ছিলেন। আর এজন্যই তিনি কঠোর হাতে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দমন করতে ব্যর্থ হন। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার অভাবে তিনি অপাত্রে দয়া বর্ষণ করে সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল করে তোলেন।


জায়গির প্রথার পুনঃপ্রবর্তন ফিরোজশাহ তুঘলকের একটি বড় ভুল ছিল। "কেননা এর ফলে জায়গিরপ্রাপ্ত অভিজাতবর্গ নিজ নিজ এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে; যা পরিণামে তুঘলক বংশের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুলতানের সেনাবাহিনীতে বংশানুক্রমিক নিয়োগ রীতি প্রবর্তন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশংসনীয় হলেও তা রাষ্ট্রনায়কোচিত্ বিজ্ঞতার পরিচায়ক ছিল না। কেননা এর ফলে সেনাবাহিনীর কর্মদক্ষতা ও শক্তি-সামর্থ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সুলতানের অনুসৃত ধর্মীয় নীতিও তুঘলক বংশের পতনে আংশিকভাবে দায়ী ছিল। শাসনকাজে সুন্নি উলামাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় অসুন্নি এবং হিন্দুদের মধ্যকার ক্ষোভ ও বিরোধিতা তুঘলক বংশের পতনে ভূমিকার রাখে। পরিশেষে ঐতিহাসিক আর. পি. ত্রিপাঠীর মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, “ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, যেসব গুণ ফিরোজকে জনপ্রিয় করেছিল, সেগুলো বিশেষভাবে দিল্লি সালতানাতের অস্তিত্বকে দুর্বল করে ফেলেছিল।"


মূলকথা : ফিরোজশাহ তুঘলকের অতি নমনীয়তা তুঘলক বংশের পতনে ভূমিকা রাখে ।


প্রশ্ন-১৯। কাজী পরিবারের গৃহভৃত্য মারুফ অত্যন্ত মেধাবী ও সাহসী ছিলেন। কাজী সাহেবের মৃত্যুর পর তার সন্তানরা মারুফকে জনৈক দাস ব্যবসায়ীর নিকট বিক্রয় করেন। পশ্চিমাঞ্চলের অধিপতি দাস ব্যবসায়ীর নিকট হতে মারুফকে ক্রয় করেন এবং তার মেধা ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। ইতমধ্যে মারুফ পার্শ্ববর্তী পূর্বাঞ্চল রাজ্য জয় করেন। আকস্মিকভাবে পশ্চিমাঞ্চল অধিপতির মৃত্যু হলে পরবর্তী শাসক মারুফকে দাসমুক্ত করেন এবং বিজিত পূর্বাঞ্চলের স্বাধীন শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সামান্য অবস্থা থেকে নিজ দক্ষতা, মেধা ও বুদ্ধিমত্তায় গৃহভৃত্য মারুফ পৃ বাঞ্চলে স্বাধীন শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।


ক. 'আইবেক' শব্দের অর্থ কী?


খ. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের গুরুত্ব বর্ণনা কর।


গ. উদ্দীপকে মারুফের প্রাথমিক জীবন দিল্লির কোন সুলতানের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা কর ।


ঘ. উদ্দীপকের আলোকে উক্ত সুলতানের কৃতিত্ব পর্যালোচনা কর। ৪ ৩ উত্তর ৩


উত্তর


ক. 'আইবেক' শব্দের অর্থ চন্দ্রদেবতা।


খ. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয় লাভের ফলে মুসলিম অধিকার প্রায় দিল্লির উপকণ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এর পর থেকে হিন্দুরা আর মুসলিম আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। এই যুদ্ধ উত্তর ভারতে মুসলিম আধিপত্যের ভিত্তি স্থাপন করে। প্রকৃতপক্ষে তরাইনের এ বিজয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ভিত্তি রচনা করেছিল। সুতরাং ভারতবর্ষের রাজনৈতিক  ইতিহাসে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম।


মূলকথা : তরাইনের এ বিজয়ে মুসলিম শাসনের ভিত্তি রচিত হয় বলে এর গুরুত্ব অপরিসীম।


গ. উদ্দীপকে মারুফের প্রাথমিক জীবন দিল্লির মামলুক সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-


উদ্দীপকের মারুফের ন্যায় কুতুবউদ্দিন আইবেকও ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার। শৈশবে কুতুবউদ্দিন পারস্যের একজন দাস ব্যবসায়ীর হাতে পড়েন। উক্ত পারসিক ব্যবসায়ী তাকে নিশাপুরের কাজি ফখরুদ্দিন আব্দুল আজিজ কুফির নিকট বিক্রি করে দেন। কাজি তার পুত্রদের সাথে আইবেকের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং তিনি ধর্মশাস্ত্র ও সমরবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কাজির মৃত্যুর পর তার পুত্রগণ কুতুবউদ্দিন আইবেককে একজন দাস ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। এ ব্যবসায়ী তাকে গজনির মুহাম্মদ ঘুরির নিকট বিক্রি করেন। কুতুবউদ্দিন দেখতে কুৎসিত হলেও জন্মসূত্রে তিনি নানা প্রশংসনীয় গুণসম্পন্ন ও চিত্তগ্রাহী ভাবমূর্তির অধিকারী ছিলেন। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস, দূরদৃষ্টি ও সমরকুশলতার গুণে আইবেক সামান্য অবস্থা থেকে মুহাম্মদ ঘুরির সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য অনুচরে পরিণত হন। ১১৯২-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি মুহাম্মদ ঘুরির প্রতিনিধি হিসেবে ভারত শাসন ও রাজ্য বিস্তারে নিয়োজিত ছিলেন। ঘুরি অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে কুতুবউদ্দিন ক্ষমতা গ্রহণ করে দিল্লি সালতানাতের পত্তন ঘটান ।অনুরূপভাবে উদ্দীপকের মারুফও দাস ব্যবসায়ীর হাত থেকে পশ্চিমাঞ্চলের অধিপতির হাতে উপনীত হয়ে যোগ্যতা ও সাহসিকতার বলে উক্ত শাসকের সেনাপতি হন এবং পূর্বদিকে রাজ্য জয় করেন । একসময় পশ্চিমাঞ্চলের শাসকের মৃত্যু হলে মারুফ তার বিজিত অঞ্চলের স্বাধীন শাসকে পরিণত হন। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের মারুফের সাথে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সাদৃশ্য রয়েছে।


মূলকথা : মারুফের জীবন ও চরিত্রের সাথে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সাদৃশ্য রয়েছে।


ঘ.  উদ্দীপকের মারুফের চরিত্রের মধ্য দিয়ে কুতুবউদ্দিন আইবেকের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। কুতুবউদ্দিন ছিলেন অনন্য কৃতিত্ব ও চরিত্রের অধিকারী। নিচে তার কৃতিত্ব পর্যালোচনা করা হলো-


কুতুবউদ্দিন আইবেক ছিলেন উন্নত চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারী। তিনি ছিলেন ক্ষমতাধর ও সুযোগ্য শাসক। একজন সামান্য ক্রীতদাস হিসেবে কর্মময় জীবন শুরু করে তিনি দিল্লির প্রথম স্বাধীন সুলতান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তার কৃতিত্ব সম্পর্কে ড. এ. এল. শ্রীবাস্তব বলেন,


“আইবেক ছিলেন ভারতে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রথম কার্যত সুলতান।” অসাধারণ কর্মশক্তি ও উঁচু দরে প্রতিভাবান সামরিক নেতা হিসেবে তিনি তুর্কির অসম সাহসিকতার সাথে পারসিক মার্জিত রুচি ও উদারতার সমন্বয় সাধন করেন। কুতুবউদ্দিন শুধু বিজেতা এবং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, একজন যোগ্যতাসম্পন্ন শাসক হিসেবেও সমসাময়িক বিশ্বে খ্যাত ছিলেন। তার শান্তিময় রাজত্বকাপে ধনাগারে কোনো প্রহরীর দরকার ছিল না, মেষপালকের কোনো রাখালের প্রয়োজন ছিল না। চোর ও চৌর্যবৃত্তি সম্বন্ধে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারত না।আইবেক একজন বিদ্যোৎসাহী শাসক হিসেবেও ইতিহাসে খ্যাত ছিলেন। হাসান নিজামি, ফখরে মুদাব্বীর এবং অন্য উলামা ও বিদ্বান লোকদের তিনি স্বীয় দরবারে উচ্চমর্যাদা দান করেন। স্থাপত্যশিল্পের প্রতিও কুতুবউদ্দিনের সমান অনুরাগ ছিল। দিল্লির কুতুব মিনার নির্মাণ ছিল তার শ্রেষ্ঠ কি এছাড়া ১১৯১-৯২ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে কুয়াত-উল-ইসলাম এবং আজমিরে 'আড়াই দিনকা-ঝোপড়া' মসজিদটি নির্মাণ করেন। সুতরাং বলা যায়, দিল্লির প্রথম স্বাধীন সুলতান হিসেবে কুতুবউদ্দিন আইবেকের কৃতিত্ব ছিল অসাধারণ ।


মূলকথা : কুতুবউদ্দিন আইবেকের চরিত্র ও কৃতিত্ব ছিল অসাধারণ।


প্রশ্ন-২১। স্বনামধন্য 'সেন্ট্রাল গার্মেন্টস' চেয়ারম্যানের আকস্মিক মৃত্যুর পর তার শুশুর মি. মাহিন চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হন। সমস্যা মোকাবিলার জন্য তিনি 'কঠোর নীতি' গ্রহণ করেন। অবাধ্য ও দর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের তিনি বরখাস্ত করেন এবং চেয়ারম্যানের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নিজ অফিস কক্ষটি জমকালোভাবে সজ্জিত করেন। প্রশাসনিক শক্তি সম্পর্কে কর্মচারীদের মনে ভীতি সঞ্চার করতে চেয়ারম্যানের কক্ষে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেন। তিনি অফিসে সার্বক্ষণিক নজরদারিরও ব্যবস্থা করেন। ফলে সর্বক্ষেত্রে তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে 'সেন্ট্রাল গার্মেন্টস' পুনরায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।


সকল বোর্ড-২০১৯


ক. কোন সুলতান মেওয়াটি দস্যুদের দমন করেন?

খ. মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়াসউদ্দীন বলবন কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন?

গ. উদ্দীপকের মি. মাহিনের কঠোর নীতির ন্যায় দিল্লি সালতানাতের কোন সুলতানের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. উদ্দীপকের মি. মাহিনের সাথে উক্ত সুলতানের রাজকীয় মর্যাদা ও ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার তুলনামূলক আলোচনা কর।


• উত্তর


ক. সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন মেওয়াটি দস্যুদের দমন করেন ।


খ. সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবিলা করা। তাই মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন


যেমন-

১. বৃদ্ধ সৈনিকদের ছাঁটাই করে দক্ষ ও উন্নত সমরাত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী গঠন করেন।

২. সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সামরিক নতুন ঘাঁটি নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করেন।

৩. সামানা, মুলতান ও দিপালপুরকে নিয়ে সীমান্তবর্তী প্রদেশ গঠন এবং সুদক্ষ শাসনকর্তা নিয়োগ ।

৪. নতুন রাজ্য বিস্তার নীতি পরিহার, দূরবর্তী প্রদেশে যুদ্ধাভিযান বন্ধ করা এবং এবং সর্বদা রাজধানীতে অবস্থান করা।

৫. মোঙ্গল আক্রমণকারীদের গতিবিধির উপর লক্ষ রাখার জন্য সীমান্ত অঞ্চলে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়।


মূলকথা : মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করতে বলবন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তনীতি গ্রহণ করেন।


গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত মি. মাহিনের কঠোর নীতির সাথে দিল্লির মামলুক সালতানাতের শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের কঠোর নীতির মিল রয়েছে।

১২৬৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির মামলুক সালতানাতে উপবিষ্ট হয়ে গিয়াসউদ্দিন বলবন নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হন। শূন্য রাজকোষ, মর্যাদাহীন সালতানাত, তুর্কি আমিরদের ঔদ্ধত্য, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, মোঙ্গল আক্রমণ প্রভৃতি কারণে সালতানাতের শক্তি হ্রাস পায়। এসব সমস্যা মোকাবিলা করে সালতানাতকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করতে বলবন 'Blood and Iron Policy' বা 'রক্তপাত ও কঠোর নীতি' গ্রহণ করেন; যা উদ্দীপকের মি. মাহিনের কঠোর নীতির প্রতিনিধিত্ব করছে।


মি. মাহিন তার জামাতার মৃত্যুর পর 'সেন্ট্রাল গার্মেন্টস'-এর চেয়ারম্যান হিসেবে উপবিষ্ট হন। চেয়ারম্যান হয়ে তিনি দেখলেন যে প্রতিষ্ঠানটি নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। এসব সমস্যা দূর করতে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেন। চেয়ারম্যানের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তার অফিসটি জমকালোভাবে সজ্জিত করেন। কর্মচারীদের মনে ভীতিসঞ্চার করতে চেয়ারম্যানের কক্ষে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেন। সুলতান বলবনও পতনোন্মুখ দিল্লি সালতানাতকে রক্ষা করতে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন, “সুলতান হিসেবে বলবনের কার্যক্রম ছিল অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও বহিরাক্রমণের বিরুদ্ধে একটি সংগ্রাম।” বলবন "বন্দেগান ই চেহেলগান' বা চল্লিশ চক্রের ক্ষমতা বিলোপ করেন। রাজদরবারে কঠোর আদব-কায়দা চালু করেন। যেমন- পাইবস প্রথা। তিনি জায়গির প্রথা বিলুপ্ত করে নগদ বেতনে সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠন করেন। তিনি রাজকোষ পুনর্গঠন ও গুপ্তচর প্রথা চালু করেন। তার ও সালতানাতের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করেন; যা তার কঠোর নীতিরই ফল।


সুতরাং বলবনের কঠোর নীতির সাথে মি. মাহিনের নীতির সাদৃশ্য দেখা যায় ।


মূলকথা : মি. মাহিনের কঠোর নীতির নীতির সাথে বলবনের রক্তপাত ও কঠোর নীতির মিল রয়েছে।


ঘ. দিল্লি সালতানাতের সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন এবং উদ্দীপকের চেয়ারম্যান মি. মাহিন উভয়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবে মি. মাহিনের পদক্ষেপের চেয়ে বলবনের গৃহীত পদক্ষেপ তুলনামূলক বেশি। নিচে আলোচনা করা হলো-


বলবন ও মি. মাহিন উভয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দেখলেন যে, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ক্ষমতা ও প্রধানের মর্যাদার অভাবে খুবই ক্ষীণ ও দুর্বল। তাই উভয় মর্যাদা ও ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে বলবন মনে করতেন যে, রাজতন্ত্র হচ্ছে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অপর নাম। বাংলার ঐতিহাসিক এ. বি. এম. হবিবুল্লাহর মতে, “বলবন ব্রিটেনের স্টুয়ার্ট রাজাদের মতো রাজার দৈবসত্তায় বিশ্বাসী ছিলেন।" বলবন মনে করতেন, “রাজার অন্তর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের আধার এবং এ বিবেচনায় মানবসমাজে তার সমকক্ষ কেউ নেই।" বলবন আরও মনে করতেন, “সুলতান নিজে নিজের সম্মান রক্ষা না করলে শাসিতরা অবাধ্য হয়ে পড়বে এবং অরাজকতা ও নৈরাজ্য দেখা দিতে পারে। প্রজাদের আনুগত্য নিশ্চিত ও সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্যই রাজার অতি মানবসুলভ ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা এবং স্বেচ্ছাচারী রাজক্ষমতা প্রয়োগ আবশ্যক।” এরূপ ধারণার বশবর্তী হয়ে রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি ও সুলতানকে সকলের নিকট শ্রদ্ধান্বিত করার উদ্দেশ্যে তিনি কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ।


যেমন-

⇒ জনসম্মুখে আত্মসম্মান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি নিজেকে পৌরাণিক বীর ‘আফরাসিয়াবের' বংশধর বলে দাবি করেন; ⇒ তিনি পৃথিবীতে নিজেকে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করেন; ⇒ জনমনে ভীতি ও শ্রদ্ধার উদ্রেক করার জন্য বলবন সেলজুক ও খাওয়ারিজম ...রাজকীয় ঐতিহ্যের অনুকরণে জমকালো রাজদরবার প্রতিষ্ঠা এবং সুলতানের আভিজাত্য রক্ষা ও তার অবাধ ক্ষমতা প্রমাণের জন্য পারস্য নীতি অনুযায়ী রাজদরবারে সুলতানকে ‘সিজদাহ' (আভূমি কুর্ণিশ) ও 'পাইবস' (পদচুম্বন) করার রীতি প্রচলন করেন। রাজদরবারের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য রক্ষায় রাজসভায় লঘু চপলতা, হাসিঠাট্টা বারণ এবং মদ্যপান ও নৃত্য-গীত নিষিদ্ধ করা হয়।


→ রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি ধর্ম রক্ষা ও শরিয়তের শাসন কায়েম, পাপাচার ও দুর্নীতি বিলোপ, ধার্মিক ও সদ্বংশীয় লোকদের রাজকাজে নিয়োগ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন;

→ বলবন সুলতানের ব্যক্তিগত সমমর্যাদা, বাহ্যিক আড়ম্বর ও মর্যাদার ব্যাপারে বিশেষ সচেতন ছিলেন। তিনি সব সময় জনসাধারণের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। সব সময় রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত থাকতেন। নীচ বংশীয় লোকদের সাথে মেলামেশা বা কথাবার্তা ও তাদের কোনো দান-উপহারও গ্রহণ করতেন না।

এরপ কঠোর নীতি প্রবর্তন করে সুলতান বলবন রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং সালতানাতের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করেন। অন্যদিকে উদ্দীপকের মি. মাহিন সেন্ট্রাল গার্মেন্টস-এর মর্যাদা এবং নিজ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অফিস কক্ষ জমকালোভাবে সজ্জিত করেন, কক্ষে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেন, নজরদারির ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সুলতান বলবন ও চেয়ারমান মাহিনের মর্যাদা ও ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ কমবেশি হলেও কার্যকরী ছিল।


মূলকথা : নিজের ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি ও পুনরস্থারের জন্য বলবন ও মি. মাহিন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

প্রশ্ন-২২। বিদেশি বন্ধু সোহেল ঢাকায় তার বন্ধু শাওনদের বাড়িতে এসে শাওনের সাথে কাওরানবাজারে বাজার করতে যায়। বাজারে ঢোকার পথেই তার চোখে পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের।বীজ দামসম্বলিত একটি মূল্য তালিকা বোর্ড। তালিকা অনুযায়ী পিয়াজের দাম ১৫ টাকা হওয়া সত্ত্বেও বাজারে পিয়াজের মূল্য চল্লিশ টাকা। বিস্মিত সোহেল খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে সরকারের সার, ইত্যাদিতে ভর্তুকির পরিমাণ কম হওয়ায় পিয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম তালিকা থেকে অনেক বেশি।

ক. ইবনে বতুতা কে ছিলেন? ১

খ. আলাউদ্দিন খলজির দাক্ষিণাত্য অভিযানের উদ্দেশ্য কী ছিল?

গ. সোহেলের দেখা মূল্য তালিকা বোর্ডের সাথে তোমার পঠিত কোন শাসকের মূল্যনিয়ন্ত্রণ নীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. শাওনের দেশের সরকার কীভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? উত্তরের সপক্ষে তোমার যুক্তি দাও। 

উত্তর

ক. ইবনে বতুতা ছিলেন আফ্রিকান পর্যটক।

খ. আলাউদ্দিন খলজি ছিলেন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাম্রাজ্যবাদী সুলতান। নতুন অঞ্চল জয় করে নিজ সাম্রাজ্যের সীমা সম্প্রসারণের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে ছিল। তবে দাক্ষিণাত্যের প্রভৃত সমৃদ্ধি ও ধনৈশ্বর্যও যে তাকে দাক্ষিণাত্য

বিজয়ে প্রলুব্ধ করেছিল তাতে সন্দেহ নেই। তাছাড়া দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি নিজের

সাফল্যের উজ্জ্বল সম্ভাবনাও দেখতে পেয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবিলা এবং উত্তর ভারত জয়ের উদ্দেশ্যে তিনি বিশাল বাহিনী গঠন করেছিলেন। এ বাহিনীকে কর্মক্ষম ও কাজে ব্যস্ত রাখার জন্যও সুলতানের নতুন অঞ্চলে অভিযান প্রেরণ প্রয়োজন ছিল।।

মূলকথা: আলাউদ্দিন খলজি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে দাক্ষিণাত্যে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।

গ. সোহেলের দেখা মূল্য তালিকা বোর্ডের সাথে আমার পঠিত খলজি বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক আলাউদ্দিন খলজির মূল্যনিয়ন্ত্রণ নীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আলাউদ্দিন খলজির প্রবর্তিত অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। 

মূলত সৈন্যরা যেন তাদের নির্ধারিত অল্প বেতনেই নিজ প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় এবং স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে সেজন্য সুলতান দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেন। 

সুফি নাসিরউদ্দিন চিরাগের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন খলজি প্রজাকল্যাণ সাধন রাজার কর্তব্য বলে মনে করতেন; আর এ কর্তব্যবোধের কারণেই তিনি মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো একটি উদ্ভাবনী ও কঠিন কাজে হাত দেন। 

প্রকৃতপক্ষে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যেই আলাউদ্দিন খলজি মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। ভূস্বামীদের জমি বাজেয়াপ্ত এবং দক্ষিণ ভারত থেকে সংগৃহীত প্রচুর ধনরত্নের কারণে দিল্লিতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। 

মুদ্রার মূল্য মান হ্রাস পাওয়ায় নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। ফলে এ অবস্থায় সামরিক-বেসামরিক নির্বিশেষে প্রজাসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবের উদ্দেশ্যে সুলতান খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেন। 

তবে সুলতান দোকানদারগণকে এ নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রয়ের নির্দেশ দেন এবং এটি অপেক্ষা অধিক মূল্য দাবি করা অপরাধ হিসেবে গণ্য করেন। 

কিন্তু সোহেলের বন্ধু শাওনের দেশের সরকার দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করলেও সার, বীজ ইত্যাদিতে ভর্তুকির পরিমাণ কম হওয়ায় পিয়াজসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য তালিকা থেকে বেশি হয় ।

পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে আলাউদ্দিন খলজির মূল্যনিয়ন্ত্রণ নীতিই প্রতিফলিত হয়েছে।

মূলকথা : সুলতান আলাউদ্দিনের প্রবর্তিত অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

ঘ . উদ্দীপকে শাওনের দেশের সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু মূল্য নির্ধারণ করলেই চলবে না, তা নিয়ন্ত্রণের জন্যও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে রাখালের দেশের সরকার যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে তা নিচে তুলে ধরা হলো-

প্রথমত, দ্রব্যাদির চাহিদা অনুসারে সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

দ্বিতীয়ত, অজন্মা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কারণে খাদ্যঘাটতি পূরণের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি শস্যভাণ্ডার গড়ে তুলবে। তাছাড়া চাখিদেরকে ফসলের দ্বারা রাষ্ট্রের শস্যাগারে রাজস্ব জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করতে পারে ।

তৃতীয়ত, সুলতান আলাউদ্দিন খলজির ন্যায় উৎপাদনকারীকে দশ মণের অধিক খাদ্যশস্য নির্ধারিত মূল্যে সরকারের নিকট বিক্রয়ের নির্দেশ দিতে পারে।

চতুর্থত, কোনো শস্য বিক্রেতা ও ব্যবসায়ী যেন সরকারের অনুমতি ব্যতীত শস্যাদি বিক্রয় করতে না পারে সেদিক নজর রাখবে।

পঞ্চমত, অধিক মূল্যে বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে চাষি, ব্যবসায়ী বা শস্য বিক্রেতাগণ যাতে খাদ্যশস্য গোলাজাত করতে না পারে সেদিকেও সরকারের নজর রাখতে হবে।

এসব ব্যবস্থা ছাড়াও সরকার দ্রব্যাদির সরবরাহ সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সুষ্ঠু পরিবহনব্যবস্থারও প্রবর্তন করতে পারে। তাছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণে গৃহীত ব্যবস্থাগুলো তত্ত্বাবধানের জন্য শাহানা-ই-মণ্ডির ন্যায় একদল বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ করতে পারে।

 বাজারের অবস্থা নিয়মিতভাবে অবগত হওয়ার জন্য একদল পরিদর্শক ও গোয়েন্দাও নিযুক্ত করতে পারে। বিক্রেতা ক্রেতাকে যাতে ওজনে না ঠকায় সে ব্যাপারে কঠোর বিধিবিধান আরোপ করতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, শাওনের দেশের সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য উপরে বর্ণিত ব্যবস্থাগুলো করতে পারে।

মূলকথা : উপরে বর্ণিত ব্যবস্থাসমূহ গ্রহণের মাধ্যমে কোনো দেশের সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ