২য় পত্র পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় অধ্যায় অনুধাবন প্রশ্ন ও উত্তর এইচএসসি
![]() |
| পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় পত্র ২য় অধ্যায় অনুধাবন প্রশ্ন ও উত্তর |
পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় পত্র ২য় অধ্যায় অনুধাবন প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১। ঔপনিবেশিক শাসন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কোনো আধিপত্যশীল দেশ যখন অন্য দেশের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য দখলকৃত দেশের জনগণকে শোষণ ও জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে তখন সে শাসনব্যবস্থাকে বলা হয় ঔপনিবেশিক শাসন।
এক্ষেত্রে, শক্তিশালী দেশ সরাসরি তুলনামূলক দুর্বল দেশকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের সম্পদ ব্যবহার করে নিজস্ব ক্ষমতা এবং সম্পদ বৃদ্ধি করে।
প্রশ্ন ২। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে কেন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব হিসেবে আরোহণের অল্পকাল পরেই ইংরেজদের সাথে নবাবের চরম বিরোধ দেখা দেয়।
এ বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই ১৭৫৭ সালে নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে পলাশীর যুদ্ধ হয়। আর এ যুদ্ধে নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং নবাবের অনেক আত্মীয় ইংরেজদের সাথে হাত মেলানোর কারণেই পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হয়।
প্রশ্ন ৩। সূর্যাস্ত আইন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৭৮৬ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। লর্ড কর্নওয়ালিশ গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার পর নিয়মিত খাজনা আদায়ের জন্য অন্যান্য আইনের পাশাপাশি সূর্যাস্ত আইন' বলবৎ করেন। মূলত কোম্পানির রাজস্ব একটি নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে দিতে অসমর্থ হলে কোম্পানি জমিদারি নিলামে বিক্রি করত। আর এটিই সূর্যাস্ত আইন বলে পরিচিত ছিল।
প্রশ্ন ৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কী ব্যাখ্যা কর। মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ)
উত্তর: ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে ১৭৮৯ সালে জমিদারদের সাথে একটি 'দশসালা বন্দোবস্তু' করেন এবং তা চিরস্থায়ী করার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালক বোর্ডের অনুমতি চেয়ে পাঠান। পরিচালনা বোর্ড ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ লর্ড কর্নওয়ালিশের দশসালা বন্দোবস্তুকে 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্তু' হিসেবে ঘোষণা করেন।
এর ফলে জমিদারদের জমির ওপর ক্ষমতা, মালিকানা এমনকি হস্তান্তর, পত্তন ও ইজারা দেওয়ার ক্ষমতা লাভ করেন। তবে নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে জমিদাররা কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে জমিদাররা এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে বলেও বিধান রাখা হয়।
প্রশ্ন ৫। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অসাম্প্রদায়িক ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস জনসাধারণকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দলটি নিরপেক্ষ আচরণ করতে ব্যর্থ হয়। বঙ্গভঙ্গ ইস্যুতে কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক আচরণ মুসলমানদের মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
মূলত মুসলমানদের স্বার্থ উপেক্ষা করার কারণেই মুসলিম লীগের জন্মলাভ ঘটে। সর্বোপরি কংগ্রেসে হিন্দু নেতাদের আধিপত্যবাদ দলটিকে অসাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে পরিণত করে। আর তাই বলা হয়, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অসাম্প্রদায়িক আচরণে ব্যর্থ।
প্রশ্ন ৬। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: কংগ্রেস ভারতীয় জনগণের সুসংগঠিত একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনের সভাপতি প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের চারটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা ঘোষণা করেন, তা হলো-
নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভারতীয় জনগণের অভাব-অভিযোগ দূর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার প্রতি ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট করা, শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারিত্ব অর্জন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য আবেদন জানানো। তবে ১৯০৫-১৯০৬ সালের দিকে কংগ্রেসের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হয় স্বরাজলাতের দাবি ও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি।
প্রশ্ন ৭। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ২টি উদ্দেশ্য লেখ।
উত্তর: জাতীয় কংগ্রেস ভারতীয় জনগণের সুসংগঠিত একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। এ সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভারতীয় জনগণের অভাব-অভিযোগ দূর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার প্রতি ব্রিটিশ সরকারের সৃষ্টি আকৃষ্ট করা, শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারিত্ব অর্জন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য আবেদন জানানো।
১৯০৫-১৯০৬ সালের দিকে এসে কংগ্রেসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রধানত দুটি দাবিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে। তা হলো- ১. স্বরাজ লাভের দাবি ও ২. পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি।
প্রশ্ন ৮। বঙ্গভঙ্গ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: প্রশাসনিক কার্যক্রমের সুবিধার্থে ভারতের তদানীন্তন ভাইসরয় লর্ড কার্জন প্রায় ২ লক্ষ বর্গমাইল আয়তনের বিশাল প্রদেশ 'বাংলা প্রেসিডেন্সি'কে বিভক্ত করেন। তিনি পূর্ব বাংলাকে আসামের সাথে যুক্ত করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করেন।
অপরদিকে, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যাকে একত্রিত করে গঠিত হয় বাংলা প্রদেশ। ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলা প্রেসিডেন্সিকে এভাবে দুটি প্রদেশে বিভক্ত করার বিষয়টি ভারতের ইতিহাসে 'বঙ্গভঙ্গ' নামে পরিচিত। প্রশাসনিক সুবিধার কথা উল্লেখ করা হলেও ব্রিটিশদের বঙ্গবিভাগের পিছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ নিহিত ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।
প্রশ্ন ৯। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কেন হয়েছিল?
উত্তর: অবিভক্ত বাংলার আয়তন ছিল প্রায় দুই লক্ষ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি। এ বিশাল আয়তনের প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনা করা একজন গভর্নরের পক্ষে নিতান্ত দুরূহ ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল।
তাছাড়া পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থরক্ষার্থে মুসলিম নেতৃবৃন্দ পূর্ব বাংলাকে আলাদা প্রদেশরূপে গড়ে তোলার জন্য ব্রিটিশ সরকারের নিকট দাবি উত্থাপন করেন।
তাই প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার কথা চিন্তা করে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বঙ্গভঙ্গ করেন।
প্রশ্ন ১০। 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ শাসকরা ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করে শাসনকার্য পরিচালনা করার যে নীতি গ্রহণ করেছিল তাকেই 'ভাগ কর শান কর' নীতি বলে। এ নীতির আওতায় ব্রিটিশরা বাংলাকে বিভক্ত করে একটি সাম্প্রদায়কে নিজেদের অনুকূলে রেখে অপর সাম্প্রদায়কে শাসন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। মূলত তাদের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসন দীর্ঘায়িত করা।
প্রশ্ন ১১। কেন ব্রিটিশ সরকার ভাগ কর ও শাসন কর নীতি গ্রহণ করেছিল।
উত্তর: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর কূটকৌশল ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ছাড়াও সমগ্র ভারতবর্ষে তাদের শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল বিধায় ভারতবাসীরা ব্রিটিশ শাসন-শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করে।
ফলে ব্রিটিশরা তাদের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ভাগ কর ও শাসন 'কর' নীতি গ্রহণ করছিল। এ নীতির আওতায় । তারা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ অর্থাৎ বাংলাকে বিভক্ত করে একটি সম্প্রদায়কে নিজেদের অনুকূলে রেখে অপর সম্প্রদায়কে শাসন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
প্রশ্ন ১২। বঙ্গভঙ্গের যেকোনো একটি কারণ ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: অবিভক্ত বঙ্গদেশই ছিল ব্রিটিশ ভারতের সর্ববৃহৎ প্রদেশ। ১৯০২ সালের এপ্রিল মাসে লর্ড কার্জন কর্তৃক ভাবত সচিবকে লেখা পত্র অনুযায়ী বঙ্গ প্রদেশের আয়তন ছিল দুই লাখ বর্গমাইল এবং প্রায় সাত কোটি আশি লাখ লোকসংখ্যা ছিল।
এ বিশাল আয়তন এবং বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশের একজন মাত্র প্রশাসকের পক্ষে রাজধানী কলকাতা হতে সুষ্ঠু শাসন পরিচালনা করা কঠিন ছিল। তাই প্রশাসনিক সুবিধার্থে তদানীন্তন ভাইসরয় বঙ্গ প্রদেশ ভাগ করেন।
প্রশ্ন ১৩। বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক কারণ কী ছিল?
উত্তর: বঙ্গভলোর পেছনে যে কারণসমূহ বিদ্যমান ছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো রাজনৈতিক কারণ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভূখন্ডে ইংরেজ শাসকদের অনুসৃত কুখ্যাত একটি প্রশাসনিক নীতি ছিল "Divide and Rule' ('ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি)।
ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করে ভারতীয়দের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে তারা ভারতের প্রধান দুটি ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ঘটানোর পরিকল্পনা। করে। এছাড়া ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নস্যাৎ করা এবং বিপ্লবীদের মেরুদন্ড ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বঙ্গভঙ্গ নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে।
প্রশ্ন ১৪। বঙ্গভঙ্গ রদের দুটি কারণ লেখ।
উত্তর: বঙ্গভঙ্গ রদের দুটি কারণ হলো-
১. প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দু গোষ্ঠী বঙ্গভঙ্গকে তাদের বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ ও জাতীয়তাবাদবিরোধী গণ্য করে এবং এর তীব্র। বিরোধিতা করে।
২. বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য ভারতে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের মাধ্যমে বিলেতি পণ্য বর্জন ইংরেজদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন ১৫। স্বদেশী আন্দোলন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: হিন্দু সম্প্রদায় দ্বারা প্রভাবিত কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ সূচনালগ্ন থেকে বিভিন্নভাবে বঙ্গভঙ্গ রদের প্রচেষ্টা চালায়। এরই ধারাক্রমে তারা ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে স্বদেশী আন্দোলনের আদর্শকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
এ আদর্শ অনুযায়ী তারা ব্রিটিশ দ্রব্য বর্জন, বিদেশি রীতিনীতি পরিহার এবং স্বদেশী পণ্য ব্যবহার করে দেশীয় সংস্কৃতিতে উজ্জীবিত হতে জনগণকে আহ্বান করে। এটিই ছিল স্বদেশী আন্দোলন।
প্রশ্ন ১৬। বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়া বর্ণনা কর।
উত্তর: বঙ্গভঙ্গের সুফল ভোগের পূর্বেই তা রদ করায় ভারতের রাজনীতিতে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তা নিম্নরূপ-
১. বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমানদের মধ্যে যে নবউদ্দীপনার সঞ্চার হয় তা বঙ্গভঙ্গ রদের মাধ্যমে দুমড়ে মুচড়ে যায়, যা ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
২. বঞ্চাতকা রদের ফলে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানরা বিরাগভাজন হয় এবং ব্রিটিশ সরকারকে বিশ্বাসঘাতক বলে চিহ্নিত করে।
৩. বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সাম্প্রদায়িকতার জন্ম হয়।।
৪. সর্বোপরি বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়া থেকে পূর্ব বাংলার জনগণকে খুশি করার জন্য ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
প্রশ্ন ১৭। মুসলিম লীগ বলতে কী যোগ?
উত্তর: ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতের জাতীয় কংগ্রোন অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও অল্পকালের মধ্যে তা সাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত হয় এবং কেবল হিন্দুদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যার ফলে ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা দেখা দেয়।
মুসলমানদের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ায় তারা একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অনুভব করে। এ প্রেক্ষাপটেই ১৯০৬ সালে বরেণ্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের নিরন্তন সংগ্রামী প্রচেষ্টায় 'নিখিল ভারত মুসলিম লীগ' নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয়, যা পরে মুসলিম লীগ নামধারণ করে।
প্রশ্ন ১৮। কী উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল?
উত্তর: ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা এবং সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সকল ভুল বোঝাবুঝির অবসান করার জন্য মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল। এছাড়া মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থরক্ষা করা এবং এ লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকারের কাছে - মুসলমানদের দাবি ও আশা-আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরাও অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশ্ন ১৯। মুসলিম লীগ গঠনের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর।
উত্তর: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ভারতবর্ষের মুসলমান নেতৃবৃন্দ তাঁদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করতে থাকেন। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী মুসলিম প্রতিনিধি দল লর্ড মিন্টোর নিকট 'পৃথক নির্বাচনের' দাবি জানালে তিনি তা নীতিগতভাবে মেনে নেন। এর ফলে মুসলিম নেতৃবৃন্দ উৎসাহিত হয়ে পড়েন। ১৯০৬ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এ শিক্ষা সম্মেলনে বসে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রশ্নে মুসলমান নেতৃবৃন্দ মতবিনিময় করেন। ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর নওয়াব ভিখারুল মূলকের সভাপতিত্বে এক বিশেষ অধিবেশনে ঢাকার নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ একটি সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব রাখেন। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এভাবেই 'সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ' বা 'মুসলিম লীগ' নামক একটি রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয়।
প্রশ্ন ২০। ব্রিটিশ আমলে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন প্রয়োজন ছিল কেন?
উত্তর: ব্রিটিশ আমলে মুসলমানরা ছিল রাজনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ। ভারতের তৎকালীন একমাত্র রাজনৈতিক দল কংগ্রেস হিন্দুদের স্বার্থেই পরিচালিত হতো। এক্ষেত্রে মুসলমানরা তাদের অধিকার হতে বঞ্চিত হতো। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে কংগ্রেস এর বিরোধিতা করে। ফলে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে।
এ প্রেক্ষিতে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হলে মুসলমানরা নিজেদের জন্য পৃথক নির্বাচন দাবি করে। মোটকথা, ব্রিটিশ আমলে অবহেলিত মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য পৃথক নির্বাচন প্রয়োজন ছিল।
প্রশ্ন ২১। মলে-মিন্টো সংস্কার আইন, ১৯০৯ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ভারতবর্ষে শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতিতে ১৯০৯ সালের মর্সে-মিন্টো সংস্কার আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। এ আইনের কার্যকারিতা ব্রিটিশ সরকারের কাছে সন্তোষজনক মনে হলেও তা শিক্ষিত, সচেতন ভারতীয়দের তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে ভারতীয়দের আইন পরিষদে প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি অব্যাহত থাকে। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয় এবং মুসলমানদের স্বার্থ ও দাবি আদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন দাবি করে।
এরূপ পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টো এবং ভারত সচিব লর্ড মলে ১৯০৯ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তন করেন, যা 'মলে-মিন্টো সংস্কার আইন' ১৯০৯ নামে পরিচিত।
প্রশ্ন ২২। লক্ষ্ণৌ চুক্তি কী?
উত্তর: ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ১৯১৬ সালে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা লক্ষ্ণৌ চুক্তি নামে পরিচিত। লক্ষ্ণৌ চুক্তি হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও সমঝোতার সুযোগ সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন ২৩। 'জালিয়ানওয়ালাবাগ' হত্যাকান্ড কেন সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর: 'জালিয়ানওয়ালাবাগ' হত্যাকাণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ঘটনা। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল তারিখে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসর শহরে ইংরেজ সেনানায়ক ব্রিগেডিয়ার রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে এই হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় সরকারকে প্রতিশ্রুতি দেয় যুদ্ধ শেষ হলে পরাধীন দেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেও ইংরেজ সরকার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।
ফলে ভারতীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে ব্রিটিশ সরকার বিক্ষুদ্ধ জনতাকে ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জারি করে। এমনই এক সময় প্রায় ২০ হাজার মানুষ শিখদের নববর্ষ উদযাপন করার উদ্দেশ্যে জালিয়ানওয়ালাবাগে জড়ো হলে সেখানে একটানা ১০ মিনিট ধরে গুলি চলে। এতে নিহত হন প্রায় দেড় হাজার মানুষ। ইতিহাসে এটি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন ২৪। দ্বৈতশাসন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রদেশে দ্বৈতশাসন প্রবর্তন। এ আইনের মাধ্যমে প্রাদেশিক বিষয়গুলোকে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়; যেমন-
ক. হস্তান্তরিত বিষয় এবং
খ. সংরক্ষিত বিষয়। হস্তান্তরিত বিষয়গুলো গভর্নর ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা যৌথভাবে পরিচালনা করতেন। আর সংরক্ষিত বিষয় কেবল গভর্নর ও শাসন পরিষদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো।
এভাবে প্রাদেশিক শাসনসংক্রান্ত বিষয়কে দুই ভাগে বিভক্ত করায় একে দ্বৈতশাসন বলে অভিহিত করা হয়।
প্রশ্ন ২৫। খিলাফত আন্দোলন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: খিলাফত আন্দোলন ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ আন্দোলনের ফলে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে এবং তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা পায়। তৎকালে তুরস্কের বিপ্লবী নেতা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের ক্ষমতা দখল করে এবং খিলাফত তথ্য 'তুরস্ক সালতানাতকে' বাতিল ঘোষণা করেন। ফলে ১৯২৪ সালে ভারতে উত্ত আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।
প্রশ্ন ২৬। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বলতে কী বোঝ?
উত্তর: প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বলতে প্রদেশের নিজস্ব শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়। এটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের মূলকথা হলো প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার প্রাদেশিক আইনসভার কাছে জবাবদিহিতা থাকবে এবং আইনসভা হবে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী।
এর মাধ্যমে মূলত দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো হয়। তবে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনে দেশরক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর কর্তৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে।
প্রশ্ন ২৭। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন কেন প্রয়োজন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে 'ক্ষমতা বণ্টন করে দেওয়ার ফলে উভয়েই একে অপরের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে স্ব-স্ব কার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে পারে বিধায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারব্যবস্থা সফল হতে পারে না। তাই সুষ্ঠু, স্বাধীন ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন আবশ্যক।
প্রশ্ন ২৮। ১৯৩৫ সালে প্রবর্তিত ভারতীয় প্রাদেশিক শাসন কীরূপ ছিল?
উত্তর: ১৯৩৫ সালে প্রবর্তিত ভারত শাসন আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন। এ আইনে উল্লেখ করা হয় যে, দেশরক্ষা, পররাষ্ট্রসংক্রান্ত এবং অর্থ এ ত্রিবিধ বিষয়ের কর্তৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিচার, পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয়ের কর্তৃত্ব প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকবে।
এক্ষেত্রে আরও উল্লেখ করা হয় যে, কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। এ ব্যবস্থায় মূলত দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা তাদের যাবতীয় কাজের জন্য প্রাদেশিক আইনসভার নিকট দায়ী থাকবে।
প্রশ্ন ২৯। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর।
উত্তর: ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো-।। প্রথমত, এ আইনের মাধ্যমে ক্ষমতা বিভাজনের নীতিতে প্রাদেশিক ক স্বায়ত্তশাসন কায়েম করার বিধান করা হয়। দ্বিতীয়ত, এই আইনের মাধ্যমে সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
প্রশ্ন ৩০। স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা হলো একচ্ছত্র আধিপত্য দাবি করা এবা কেবলমাত্র স্বীয় ইচ্ছাকেই এর আধিপত্যের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা। এ ক্ষমতার ভিত্তি হলো ক্ষমতা, কোনো প্রকার আইন নয়। একনায়কতন্ত্র ফ্যাসিস্ট এবং কমিউনিস্ট উভয় প্রকার শাসনব্যবস্থাতেই। শাসকের এ ক্ষমতার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দাবি করেন। স্বেচ্ছাযীন ক্ষমতারবলে যেকোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করা যায়।
প্রশ্ন ৩১। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব বর্ণনা কর।
উত্তর: ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা এ নির্বাচনে প্রতীয়মান হয় হিন্দু প্রদেশগুলো হিন্দুদের তথা কংগ্রেসের একক প্রাধান্য এবং মুসলমান অধ্যুষিত প্রদেশগুলোতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র সংগঠন মুসলিম লীগের প্রাধান্য বিদ্যমান। মূলত এ প্রেক্ষাপটেই ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ১৯৪৭ সালে জন্মলাভ করে। এজন্যই ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন ৩২। দ্বিজাতি তত্ত্ব বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: দ্বিজাতি তত্ত্ব হলো ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে ভারতকে রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত করার নির্ণায়ক ও আদর্শাশ্রয়ী একটি রাজনৈতিক মতবাদ। ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন অবসানের প্রাক্কালে বিশ শতকের চল্লিশের দশকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্বের এ ধারণার উন্মেষ ঘটান। এ তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।
প্রশ্ন ৩৩। 'লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তি ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব'- ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের দাবি উত্থাপিত হয়। এসব স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনে ভারতবর্ষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোর সীমানা পরিবর্তন করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়।
মূলত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিজাতি তত্ত্বেও প্রায় এমনটাই বলা হয়েছে। দ্বিজাতি তত্ত্বে ধর্মের ভিত্তিতে দুটি দেশ পঠনের প্রস্তাব করা হয়। তাই বলা যায়, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তি ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব।
প্রশ্ন ৩৪। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রদত্ত তত্ত্বটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের আবাসভূমি। তথাপি এখানেও রয়েছে হিন্দু-মুসলিম দুটি বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। ১৯৪০ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার দ্বিজাতি তত্ত্বে এ প্রস্তাবটি তুলে ধরে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্তিতে ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি কর্মভিত্তিক দেশ গঠনের প্রস্তাব দেন। আর এটিই ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রদত্ত দ্বিজাতি তত্ত্ব।
প্রশ্ন ৩৫। লাহোর প্রস্তাব বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলার কৃতি সন্তান শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক যে প্রস্তাব উত্থাপন করেন সেই প্রস্তাবই লাহোর প্রস্তাব নামে খ্যাত। লাহোর প্রস্তাবে বলা হয়, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সন্নিহিত স্থানসমূহকে অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। 1 প্রয়োজনমতো সীমানা পরিবর্তন করে যেসব স্থানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব অঞ্চলসমূহে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এসব স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম। লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।
প্রশ্ন ৩৬। লাহোর প্রস্তাবের মূলকথা কী ছিল?
উত্তর: শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ভারতবর্ষে স্বায়ত্তশাসিত সার্বভৌম অঙ্গরাজ্য গঠনের চিন্তা থেকে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা করাই ছিল লাহোর প্রস্তাবের মূলকথা।
ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন এবং এসব স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌম নিশ্চিতকরণ, সংখ্যালঘুদের অধিকার ও স্বার্থরক্ষার জন্য উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়ন ও নীতি গ্রহণ ইত্যাদি বিষয় ছিল ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মূলকথা।
প্রশ্ন ৩৭। লাহোর প্রস্তাবের যেকোনো একটি বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল- ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চল নিয়ে পৃথক রাষ্ট্রসমূহ প্রতিষ্ঠা করা। এ প্রস্তাবের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের ইঙ্গিত ছিল, যদিও পরবর্তীতে তা সংশোধন করে একক রাষ্ট্র' গঠনের কথা বলা হয়।
প্রশ্ন ৩৮। লাহোর প্রস্তাবের ২টি বৈশিষ্ট্য লেখ।
উত্তর: লাহোর প্রস্তাবের ২টি বৈশিষ্ট্য হলো-
১. ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে যেসব স্থানে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, সেসব অঞ্চল নিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহ গঠন করতে হবে।
প্রশ্ন ৩৯। মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ভারতে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা ও হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে সকল প্রকারের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধান করাই ছিল মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনার লক্ষ্য। তাই ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস, লর্ড পেথিক লরেন্স ও এ. ভি আলেকজান্ডার এ তিন জন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি মিশন ভারতে পাঠায়।
মিশন ভারতের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় মতৈক্যে পৌছাতে না পারায় ১৯৪৬ সালের মে মাসে ভারতীয় সংবিধান প্রতিষ্ঠায় তার নিজস্ব পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যা মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা নামে খ্যাত। এ মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা ব্রিটিশ-ভারত এবং দেশীয় রাজ্যগুলোকে নিয়ে একটি ভারত ইউনিয়ন গঠন করা হবে। এ ইউনিয়নের হাতে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় অর্পিত হবে।
প্রশ্ন ৪০। ১৯৪৬ সালের মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল কেন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: ১৯৪৬ সালের ১৬ মে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট রিচার্ড অ্যাটলির গঠিত কমিশন একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করে যেটি ঐতিহাসিক মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা বলা হয়। এ মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা বিভিন্ন কারণে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
ভারতের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনাকে ঘিরে বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা কেউই মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা থেকে সন্তুষ্টি লাভকরতে পারেনি। তাই তাদের তোপের মুখে পড়ে মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
প্রশ্ন ৪১। ৩ জুন পরিকল্পনা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার কারণে ভারতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার' গঠন নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। এ সময় ভারতের নতুন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে ক্ষমতা হস্তান্তর ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু এ প্রচেষ্টায় তিনি ব্যর্থ হয়ে ঘোষণা করেন, "ভারত বিভাগ ছাড়া ভারতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প উপায় নেই।
পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহতায় কংগ্রেস ভারত বিভক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এমতাবস্থায় ১৯৪৭ সালের ৩ জুন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দের সাথে এক ঘরোয়া বৈঠকে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন যে পরিকল্পনা তুলে ধরেন তা ইতিহাসে ৩ জুন পরিকল্পনা বা মাউন্ট ব্যাটেন পরিকল্পনা নামে খ্যাত।
প্রশ্ন ৪২। ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের গুরুত্ব সংক্ষেপে বর্ণনা কর।
উত্তর: ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিস্মরণীয় ঘটনা। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এ আইন পাসের মাধ্যমে উপমহাদেশে দীর্ঘ প্রায় দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে।
ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে এবং এ দুটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। যে কারণে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের গুরুত্ব অত্যধিক।
