মনসবদারি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ কর
![]() |
| মনসবদারি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ কর |
মনসবদারি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশ্লেষণ কর
উত্তর : ভূমিকা : ইতিহাসে মনসবদারি প্রথা বেশ গুরুত্বপূর্ণ আকবরের সামরিক সংস্কারের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মনসবদারি ব্যবস্থার প্রবর্তন।
দিল্লি সালতানাত থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি আরবীয়, পারসিক শাসন ব্যবস্থার সমন্বয় সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের এ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
আর এজন্য তার মনসবদারি ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মনসবদারি প্রথার মাধ্যমে মুঘল সামরিক বাহিনী শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে উঠে। যার ফলে আকবর সবক্ষেত্রে বিজেতা শাসক হন।
→ মনসবদারি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য : মনসবদারি শাসন ব্যাপক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। নিম্নে মনসবদারি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো :
১. সম্রাটের ইচ্ছাধীন নিয়োগ : পদোন্নতি ও পদচ্যুতি সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল ছিল। এ পদে নিয়োগ বংশগত মর্যাদার ভিত্তিতে নয়। তাছাড়া ব্যক্তিগত রণনৈপুণ্য ও দক্ষতার উপর নির্ভরশীল ছিল। সাধারণত সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মনসবদার নিযুক্ত করা হতো।
২. সৈন্য সংখ্যাভিত্তিক মনসবদারি পর্যায় : আকবরের মনসবদারি ব্যবস্থায় মনসবদারগণ তাদের পর্যায় অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য, ঘোড়া, হাতি প্রভৃতি প্রস্তুত রাখতে বাধ্য থাকতেন।
৩. পর্যায়ভিত্তিক মনসবদারদের সংখ্যা : মনসবদারদের অধীনে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য নিয়োজিত থাকত। সর্বোচ্চ পর্যায়ে মনসবদার মোট ১০ হাজার এবং সর্বনিম্ন পর্যায়ের মনসবদার ১০ জন সৈন্য প্রস্তুত রাখার দায়িত্ব প্রাপ্ত হতেন।
তবে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার মনসবদারির পদ সাধারণত রাজপরিবারের জন্য নির্ধারিত ছিল। অবশ্য ৭ হাজার সৈন্যের মনসবদার হিসেবে মানসিংহ, টোডরমল, মির্জা, শাহরুখ প্রমুখ এর ব্যতিক্রম ছিলেন।
৪. জাট ও সাওয়ার : সম্রাট আকবর ৩ হাজারের উপরে মনসবদার এবং পরবর্তীকালে ৫ হাজারের উপরে মনসবদারের পদ সৃষ্টি করেন। যথা- ৭৫০ জাট ও ৬০০ সওয়ার।
সম্রাট আকবর সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের প্রত্যেককে দু'টি পদ জাট ও সওয়ার প্রদান করেন। এ দু'টি স্তরের প্রকৃত ব্যাখ্যা ও এর পার্থক্য নিরূপণ করা কষ্টকর।
জাট হলো মনসবদারসের ব্যক্তিগত পদ। কিন্তু এর সাথে সংযুক্ত কতগুলো অতিরিক্ত অশ্বারোহী সৈন্যপোষণের জন্য একজন মনসবদার অতিরিক্ত ভাতা পেতেন এবং এটা ছিল তার সওয়ার পদ।
এ ব্যবস্থায় তিন শ্রেণির মনসবদার ছিল। যেমন- যে মনসবদারের জাট ও সওয়ার সমান সংখ্যক থাকত তিনি প্রথম শ্রেণির মনসবদার।
যার সওয়ার জাটের অর্ধেক থাকত তাকে দ্বিতীয় শ্রেণির মনসবদার বলা হতো। যে মনসবদারের সওয়ার জাটের অর্ধেকেরও কম বা কোনো সওয়ার ছিল না তাকে তৃতীয় শ্রেণির মনসবদার বলা হতো।
৫. অশ্বচিহ্নিতকরণ : মনসবদারি প্রথাকে দুর্নীতিমুক্ত রেখে সম্রাট আকবর এর উন্নতি বিধানকল্পে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কেননা সে সময় অনেক কর্মচারী ভূয়া সৈন্য সংখ্যা দেখিয়ে ভাতা গ্রহণ করতো।
সম্রাটকে ফাঁকি নিয়েই তারা এ নীতিবহির্ভূত কাজটি করতো। এ ধরনের দুর্নীতি প্রতিরোধ করার জন্য সম্রাট আকবর মনসবদারি ব্যবস্থা চালু করে সুলতান আলাউদ্দিন ও শেরশাহ অনুসৃত নীতি অনুযায়ী অশ্বচিহ্নিতকরণ প্রথা চালু করেন।
৬. জায়গিরদার প্রথার বিলোপ : সম্রাট আকবর কর্তৃক মনসবদারি প্রথা চালু হলে জায়গিরদার প্রথা অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। জায়গির প্রথার জায়গিরদারগণ নিজস্ব এলাকার সংগৃহীত রাজস্ব দ্বারা নিজেদের বেতন ভাতাদি গ্রহণ করতেন এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য প্রতিপালন করতেন।
এ ব্যবস্থা আকবরের কাছে রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র বলে মনে হতো। মনসবদারি প্রথা চালু করে সম্রাট আকবর জায়গিরদার প্রথার বিলোপ করেন।
৭. সৈন্যবাহিনীর প্রতিপালনের সুযোগ : মনসবদারি ব্যবস্থা চালু হওয়ার ফলে শাসন বিভাগ পরিচালনা ছাড়াও বিরাট সৈন্যবাহিনী প্রতিপালন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
সাম্রাজ্যের কোনো অংশে গোলযোগ দেখা দিলে কেন্দ্রের সাহায্যের জন্য অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে গোলযোগ দমন করার ব্যবস্থা করা যেত।
৮. মনসবদারদের মধ্যে ঈর্ষা ও বিরোধ সৃষ্টি : সম্প্রদায়ভিত্তিক মনসবদারি ব্যবস্থা চালু হলে এক মনসবদারদের সাথে অন্য মনসবদারের সম্প্রদায়গত ঈর্যা ও বিরোধ সৃষ্টি হয়।
এতে আকবরের সামরিক শক্তি অনেকটা দুর্বল হয়ে পাড়ে। তাছাড়া মনসবদার তাদের অধীনস্থ সৈন্যদের সম্প্রদায় থেকে নিযুক্ত করা হতো।
ফলে মনসবদারগণ তাদের অধীনস্থ সৈন্যদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আনুগত্য আদায় এমনকি সৈন্যদের একতা ও সংহতি নিশ্চিত করতে পারতেন।
৯. অভিনব সামরিক সংগঠন : আকবরের শাসনামলের পূর্বে সেনাবাহিনীর দক্ষতা সম্ভোৰজনক ছিল না। সে সময় জায়গিরদাররা সম্রাটকে তার প্রয়োজনীয় সৈন্য সরবরাহ করতেন।
কিন্তু এ ব্যবস্থা যুগোপযোগী ছিল না বলে এ থেকে মানসম্মত | সৈনিক পাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু মনসবদারি ব্যবস্থা চালু হওয়ায় মনসবদারদের অশ্বারোহী বাহিনীর দ্বারা মুঘল সামরিক বিভাগ শক্তিশালী হয়ে উঠে।
এসব অশ্বারোহী বাহিনীর যাবতীয় ব্যয়ভার মনসবদারগণ বহন করতেন। ফলে মনসবদারি ব্যবস্থা অল্প দিনেই একটি অভিনব সামরিক সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১০. একের ভিতর : তিনের সম্মিলিত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সামরিক প্রয়োজনে সম্রাট আকবর মনসবদারি ব্যবস্থার প্রচলন করলেও মনসবদারদের শাসনতান্ত্রিক কাজেও নিয়োজিত থাকতে হতো।
এ ব্যবস্থায় শুধুমাত্র সামরিক কর্মকর্তাদেরই মনসবের দায়িত্ব দেওয়া হতো না। বরং বেসামরিক কর্মকর্তাদেরও মনসবদারির দায়িত্বে নিয়োজিত করা হতো। ফলে মনসবদারি একের ভিতর তিনের সম্মিলিত ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সম্রাট আকবরের স্ব-উদ্ভাসিত মনসবদারি প্রথা তার রাজত্বকালে বেশ কার্যকরী ছিল।
তবে এটাকে সত্যিকার অর্থে একটি জাতীয় সেনাবাহিনী বলা মুশকিল। কারণ এটা বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর লোকদের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ায় এদের মধ্যে অনৈক্য বিরাজ করতো।
আওরঙ্গজেবের সময় মনসবদারদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করে। তবে তারা মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
