জাহাঙ্গীরের শাসনামলে নূরজাহানের রাজনৈতিক প্রভাব আলোচনা কর
![]() |
| জাহাঙ্গীরের শাসনামলে নূরজাহানের রাজনৈতিক প্রভাব আলোচনা কর |
জাহাঙ্গীরের শাসনামলে নূরজাহানের রাজনৈতিক প্রভাব আলোচনা কর
- অথবা, সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে নুরজাহানের রাজনৈতিক ভূমিকা বিশ্লেষণ কর।
উত্তর : সূচনা : সম্রাট জাহাঙ্গীর মুঘল আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তার জীবন সঙ্গিনী হলেন নূরজাহান। তাদের প্রেম ও প্রণয় এ উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির অন্যতম।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে প্রায় ১৫ বছর যাবৎ নূরজাহান সাম্রাজ্যের শাসনকার্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নূরজাহানের অপর নাম মেহের-উন-নেসা।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে বিবাহের পর তার নাম হয় নূরজাহান। তিনি অসাধারণ রূপবতী ছিলেন। বুদ্ধিমতী, ফারসি সাহিত্য ও কাব্য এবং শিল্পের প্রতি অনুরাগী, বহুমুখী মানবিক গুণ তার শ্রেষ্ঠত্বের মূল চাবিকাঠি ছিল । মুঘল দরবারের গৌরব ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে তার প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না।
→ নূরজাহানের রাজনৈতিক ভূমিকা : সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে নূরজাহানের রাজনৈতিক ভূমিকা সুদূরপ্রসারী ছিল। নিম্নে তার রাজনৈতিক ভূমিকা আলোচনা করা হলো :
১. সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদান : নূরজাহানের অকৃত্রিম ভালোবাসা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও বিচক্ষণতা সম্রাট জাহাঙ্গীরকে এত মুগ্ধ করেছিল যে, তিনি প্রশাসনের সকল দায়িত্ব নূরজাহানের হাতে অর্পণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি।
তিনি নূরজাহানকে ‘বাদশাহ বেগম' সম্মানে ভূষিত করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর বলেন, “এক পেয়ালা মদ এবং এক ডিশ স্যুপের বিনিময়ে আমি আমার রাজ্যকে আমার প্রিয়তমা রানির হাতে বিক্রয় করেছি।”|
২. পিতাকে প্রধানমন্ত্রী : সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে যখন নূরজাহানের বিবাহ হয় তখন তার পিতা মির্জা গিয়াস বেগ কাবুলের দেওয়ান ছিলেন। পরবর্তীতে প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তিনি স্বীয় পিতাকে 'ইতিমান-উদ-দৌলা' উপাধি প্রদান করে সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত করেন।
৩. ভাইকে উচ্চ পদ প্রদান : নূরজাহান তার প্রতি স্বামীর দুর্বলতার সুযোগে স্বজনপ্রীতিপরায়ণ হয়ে উঠেন। ফলে পিতার পর সম্রাজ্ঞী নুরজাহান তার আতা আসফ খানকে খান-ই-সামান' পদে নিয়োগ করেন। এতে রাজদরবারে তার ক্ষমতা কয়েক গুণে বেড়ে যায়।
৪. কন্যার বিবাহ দান : পিতা ও ভাইকে উচ্চ পদে আসীন করার পর নূরজাহান তার ক্ষমতাকে আরো সুদৃঢ় করার মানসে পূর্ব স্বামী শের আফগানের ঔরসজাত কন্যা লাভলী বেগমের সাথে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ পুত্র শাহরিয়ারের বিবাহ দেন।
৫. জামাতাকে উত্তরাধিকারী মনোনয়নের চেষ্টা : সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে নূরজাহান সিংহাসনের অন্তরাল থেকে সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। তখন তিনি স্বীয় | জামাতা শাহরিয়ারকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করার প্রয়াস পান।
৬. যুবরাজ খুররমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র : সম্রাট জাহাঙ্গীরের জ্যেষ্ঠ পুত্র খসরুর বিদ্রোহের সুযোগে পারস্যের সম্রাট শাহ আব্বাস কান্দাহার পুনর্দখল করে নেয়।
এমতাবস্থায় নূরজাহান তার জামাতার উত্তরাধিকারে বাধা সৃষ্টিকারীকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার মানসে যুবরাজ খুররমকে কান্দাহার পুনরুদ্ধারে প্রেরণে সম্রাটকে অনুপ্রাণিত করেন।
বিমাতার ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে খুররম কান্দাহার অভিযানে যেতে অস্বীকার করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নূরজাহান সম্রাটকে নিয়ে খুররমের সকল পদ ও জায়গির বাতিল করেন।
ফলে খুররম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে মহব্বত খানের নিকট পরাজিত হয়ে ১৬২৫ সালে পিতার নিকট আত্মসমর্পণ করেন।
৭. মহব্বত খানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র : শাহজাহান খুররমকে পরাজিত করে মহব্বত খান মুঘল রাজদরবারে প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। এতে সন্দেহপরায়ণ নূরজাহান কৌশলে তাকে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠান।
এছাড়া অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে খাজা ওমর নকসাবন্দীর পুত্রের সাথে স্থির হওয়া মহব্বত খানের কন্যার বিয়ে ভেঙে দেন।
ফলে মহকাত খান বিদ্রোহ ঘোষণা করে ৫০০ রাজপুত যোদ্ধাসহ কাবুলে আসেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীর ও নূরজাহান ঝিলাম নদী অতিক্রম করার সময় তাদের বন্দি করেন।
পরে কূটকৌশলে উভয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্তিলাভ করেন। মহব্বত খান দাক্ষিণাত্য গিয়ে শাহজানা খুররমের নিকট আশ্রয় নেন।
৮. মুদ্রায় নামাঙ্কন : নূরজাহান তার রাজনৈতিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য মুদ্রায় সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামের পাশাপাশি তার নামও অঙ্কিত করার ব্যবস্থা করেন।
সাধারণত নিরঙ্কুশ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী শাসকেরই নামই মুদ্রায় অঙ্কন করা হয়ে থাকে। এ সূত্রে নূরজাহান ও যৌথভাবে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারিণী ছিলেন।
৯. রাজকীয় ফরমানে স্বাক্ষর প্রদান : যেকোনো রাজকীয় ফরমানে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে নূরজাহানও যৌথ স্বাক্ষর প্রদান করতেন। নূরজাহানের স্বাক্ষর ছাড়া রাজকীয় ফরমান মূল্যহীন বলে বিবেচিত হতো। সাম্রাজ্যের সকল বিষয়ে নূরজাহান সর্বময় কর্ত্রী হয়ে বসেন এবং সম্রাট তার হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হন।
১০. একচ্ছত্র শাসনকর্ত্রী : সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের উপর সাম্রাজ্যের শাসন সংক্রান্ত যাবতীয় ভারার্পণ করে সম্রাট জাহাঙ্গীর অনেকটা আরামপ্রিয় হয়ে উঠেন।
স্বীয় সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞার দ্বারা জাহাঙ্গীরের উপর এতটাই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, নূরজাহানের সম্মতি ব্যতীত সম্রাট জাহাঙ্গীর কোনো কাজই করতেন না।
সম্রাটের নির্ভরশীলতা নূরজাহানকে একচ্ছত্র শাসনকর্তায় পরিণত করে। সাম্রাজ্যের অভিজাতবর্গ এবং প্রভাবশালী অমাত্যবর্গ শাসনতান্ত্রিক প্রতিটি বিষয়ে অবনত মস্ত কে নূরজাহানের পরামর্শ গ্রহণ করেন ।
১১. সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিষ্ঠুরতা প্রশমন : সম্রাট জাহাঙ্গীর ছিলেন পরস্পরবিরোধী চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারী। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিষ্ঠুরতা প্রশমনে ভূমিকা রাখেন।
ফলে সম্রাট শেষ জীবনে নিষ্ঠুরতা তুলে উদার মনের মানুষে পরিণত হন। ফলে বিদ্রোহ দমন, সাম্রাজ্যের বিস্তার ও সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম হন।
১২. রাজকীয় দান খয়রাত : এক পর্যায়ে নূরজাহান বলতে রাজকীয় বদান্যতাকে বুঝাতো। তিনি সকল বিপদগ্রস্তদের আশ্রয়স্থল হয়েছিলেন এবং ব্যক্তিগত অর্থে অসহায় মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করতেন ।
১৩. রাজনীতি থেকে অব্যাহতি গ্রহণ : ১৬২৭ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর শাহজাহান মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করে নূরজাহানকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতি দেন।
এরপর তিনি কন্যা লাভলী বেগমকে নিয়ে লাহোরে অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতে থাকেন। ১৬৪৫ সালে নূরজাহান মৃত্যুবরণ করলে লাহোরের সহদরায় জাহাঙ্গীরের সমাধির পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, নূরজাহান ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রেম উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির অন্যতম। নূরজাহান অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন।
পৃথিবীর খুব কম মহিলাই নূরজাহানের মতো অসাধারণ যোগ্যতা, মনোবল ও রাষ্ট্রপরিচালনায় নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে পেরেছেন। মুঘল দরবারের গৌরব ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে তার প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না।
তবে জাহাঙ্গীরের শাসনামলের কৃতিত্বের জন্য সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের অবদান অনস্বীকার্য হলেও সাম্রাজ্যে গোলযোগ, বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার জন্য তার দায় নেহায়েত কম ছিল না।
