সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল এর বিবরণ দাও
![]() |
| সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল এর বিবরণ দাও |
সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল এর বিবরণ দাও
- অথবা, সম্রাজ্ঞী নুরজাহানের প্রভাবের বিশেষ উল্লেখপূর্বক সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের বিবরণ দাও।
উত্তর : ভূমিকা : মুঘল আমলের অন্যতম শাসক হলেন সম্রাট শাহজাহান। পূর্বসূরীদের মতো তিনিও সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী এ লিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টাও করেন।
পিতা আকবরের মৃত্যুর পর ১৬০৫ সালে সেলিম “নূরুদ্দিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজি" উপাধি গ্রহণ করে মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেন।
এছাড়া সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে খসরুর বিদ্রোহ, সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের প্রভাব, বাংলা, মেবার ও কাংড়া বিষয়, দাক্ষিণাত্য অভিযান, শাহজাহান ও মহাত খানের বিদ্রোহ দমন, পারস্য ও ইউরোপীয়দের সাথে সম্পর্ক প্রভৃতি কারণে তার রাজত্বকাল উল্লেখযোগ্য হয়ে রয়েছে।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল : বিভিন্ন কাঙ্ক্ষিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ভরপুর সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল নিম্নে আলোচনা করা হলো।
১. প্রথম নওরোজ উৎসব : ১৬০৬ সালের মার্চ মাসে সম্রাট জাহাঙ্গীর অত্যন্ত আড়ঘর ও জাকজমকের সাথে মুঘল সাম্রাজ্যে নওরোজ উৎসব পালন করেন। এ অনুষ্ঠানটি পরবর্তীকালে মুঘল সাম্রাজ্যের উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়।
২. জনকল্যাণমূলক কার্যাবলি : সিংহাসনে আরোহণ করেই সাম্রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীর 'দান্তরুল আলম' নামে ১২টি জনকল্যাণমূলক আইন প্রণয়ন করেন। যেমন-
© মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ণয়।
© চুরি-ডাকাতি নিয়ন্ত্রণমূলক আইন।
© বন্দিদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন ও জোরপূর্বক সম্পত্তি দখল নিষিদ্ধ।
© অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার।
© অপরাধের শক্তি হিসেবে নাক ও কান কাটা প্রথা নিষিদ্ধ ও মাদকদ্রব্য প্রস্তুত ও বিক্রয় নিষিদ্ধ।
© রোববারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
© হাসপাতাল নির্মাণ।
© মনসব জায়গির প্রথা অনুমোদন ও ওয়াকফ সম্পত্তি নির্দিষ্টকরণ ও নির্দিষ্ট দিনে পশু হত্যা নিষিদ্ধকরণ।
৩. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা : সম্রাট জাহাঙ্গীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য এবং নিরীহ মজলুম প্রজাদের অভিযোগ শোনার জন্য আগ্রা দুর্গের শাহ বুরজি থেকে যমুনা নদীর তীর পর্যন্ত ৬০টি ঘন্টাযুক্ত ৩০ গলা লম্বা ও ৪ মণ ওজনের একটি সোনার শিকল ঝুলিয়ে রাখেন।
যেকোনো ব্যক্তি ঐ শিকল টেনে তার অভিযোগের ব্যাপারে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতেন। এটা সম্রাটের ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় বহন করেন।
৪. শাহজাদা খসরুর বিদ্রোহ দমন : ১৬০৫ সালে সিংহাসন নিয়ে ষড়যন্ত্রের কারণে সম্রাট তার জ্যেষ্ঠ পুত্র খসরুকে নজরবন্দি করেন। কিন্তু ১৬০৭ সালে সরু ৩০০ অশ্বারোহীসহ আগ্রা থেকে পাঞ্জাবে পালিয়ে লাহোর দখলের চেষ্টা করলে সম্রাটের সেনাপতি দেলোয়ার খান ও সৈয়দ খান তা ব্যর্থ করে দেন।
পরে সম্রাটের নিকটি খসরু জগনধারের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চিনাব নদী অতিক্রমকালে অনুচরবর্গসহ বন্দি হন। খসরুর দুই সহযোগী মথুরার হুসেন বেগ এবং আব্দুল আজিজকে অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।
খসরুকে অন্ধ করে দিয়ে সম্রাট তার দ্বিতীয় পুত্র পারভেজকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। দশ বছর কারারুদ্ধ থাকার পর ১৬২২ সালে পেটের পীড়ায় খসরু মৃত্যুমুখে পতিত হন।
৫. শিখ গুরু অর্জুনের ফাঁসি : শিখ সম্প্রদায়ের পঞ্চম শুরু অর্জুন সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিদ্রোহী পুত্রকে অর্থ সাহায্য করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর প্রথমে এ কাজের জন্য কৈফিয়ত তলব করেন এবং অর্জুনকে প্রচুর অর্থ জরিমানা করেন।
কিন্তু অর্জুন জরিমানা দিতে অস্বীকার করলে সম্রাট তাকে ফাঁসির আদেশ দেন। সম্রাট শিখ গুরুকে রাজাদেশ অবজ্ঞা এবং বিদ্রোহীকে সমর্থন করার জন্যই ফাঁসির আদেশ দেন, এতে ধর্মীয় কোনো কারণ জড়িত ছিল না। ড. স্মিথ বলেন, "গুরু অর্নের ফাঁসি কোনো ধর্মীয় কারণে ছিল না। এটা ছিল বিদ্রোহীকে সাহায্য করার শাস্তি।”
৬. শাহজাদা খুররমের বিদ্রোহ ও আত্মসমর্পণ : খুররমের কান্দাহারে অভিযান করতে অস্বীকৃত জানালে নুরজাহান তার বিরুদ্ধে সম্রাটকে ক্ষিপ্ত করে তোলেন। জাহাঙ্গীর খুররমের সকল পদ ও জায়গির প্রত্যাহার করে নেন।
ফলে খুররম বিমাতার হাতের ক্রীড়নক হন এবং পিতা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেন। শাহজাদা খুররমের বিদ্রোহে সম্রাট অত্যন্ত মর্মাহত হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্রাটের বিরুদ্ধে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয় ভেবে ১৬২৫ সালে খুররম আত্মসমর্পণ করেন।
৭. কান্দাহার হস্তচ্যুত : সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য সম্রাট আকবর আফগানিস্তানের কান্দাহার দখল করেন। জাহাঙ্গীরের আমলে শাহজাদা খসরুর বিদ্রোহের সুযোগ এবং কূটনীতির মাধ্যমে ৯০ দিন অবরোধের পর পারল্যের সম্রাট শাহ আব্বাস কান্দাহার দখল করে নেন।
সম্রাট শাহজাদা খুররমকে কাম্পাহার পুনর্দখলের নির্দেশ দেন। কিন্তু সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ষড়যন্ত্রে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় খুররম সুদূর কান্দাহারে অভিযান করতে অস্বীকার করেন এবং সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ফলে কান্দাহার চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যায়।
৮. মহব্বত খানের বিদ্রোহ : নূরজাহানের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অভ্যন্ত অন্তরঙ্গ মহব্বত খান বিদ্রোহ ঘোষণা করে দাক্ষিণাত্যে বিদ্রোহী গুররমের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন।
নূরজাহানের এসব ষড়যন্ত্রের মূল কারণ ছিল তার জামাতা শাহজাদা শাহরিয়ারকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করে শাসনক্ষেত্রে আধিপত্য বজায় রাখা।
৯. শাহজাদা : পারভেজের মৃত্যু পারতে ছিলেন একজন মদ্যপ। ১৬২৬ সালে খুররমের প্রতিদ্বন্ধী শাহজাদা পারভেজ ইন্তেকাল করেন। সম্ভবত মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানই তার মৃত্যুর জন্য দায়ী।
১০. রাজ্য বিজয় : সম্রাট জাহাঙ্গীর পিতা আকবরের ন্যায় সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন। তিনি মহামতি আকবরের নীতি অনুসরণ করে সাম্রাজ্য বিস্তারে মনযোগী হন। যেমন-
(ক) বাংলা অধিকার : ১৫৭৫ সালে সম্রাট আকবর বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করলেও আফগান নেতাগণ মুঘলদের আধিপত্য মেনে না নিয়ে বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খানের পুত্র মুসা খান এবং ওসমান খানের নেতৃত্বে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে মুঘলদের বিরোধিতায় আকুন্ঠ নিমজ্জিত করেন।
সম্রাট ১৬০৬ সালে ইসলাম খানকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করে তার উপর আফগান নেতাদের বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
ইসলাম খান বাংলার রাজধানী রাজমহল হতে ঢাকায় স্থানান্তর করে সম্রাটের নামানুসারে এর নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর।
(খ) মেবার অধিকার : সম্রাট আকবর রানা প্রতাপ সিংহকে বিতাড়িত করে মেবার দখল করলেও জাহাঙ্গীরের সময় রাজপুতরা রানা প্রতাপ সিংহের পুত্র রানা অমর সিংহের নেতৃত্বে মুঘলদের বিরুদ্ধে বৈরিতা শুরু করে।
সম্রাট কর্তৃক প্রেরিত শাহজাদা পারভেজ ও মহব্বত খান এবং আব্দুল্লাহ খানের অভিযানগুলো ব্যর্থ হলে ১৬১৫ সালে শাহজাদা তৃতীয় বার অভিযান করে অমর সিংহকে পরাজিত করেন। ফলে মেবার পুনরায় মুঘলদের অধিকারে চলে আসে।
(গ) কাংড়া বিজয় : মহামতি আকবর উত্তর পাঞ্জাবের দুর্গম পার্বত্যাঞ্চলে অবস্থিত কাংড়া দুর্গটি দখল করে যেতে পারেননি। শাহজানা দূরথম ১৬১০ সালে ১৪ মাস অবরোধের পর কাংড়া দুর্গটি দখল করেন।
(ঘ) কিন্তুাওয়ার অধিকার : ১৬২০ সালে কাশ্মীরের শাসনকর্তা দিলাওয়ার খান কিন্তুাওয়ারের রাজাকে পরাজিত করে মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেন।
(ঙ) দাক্ষিণাত্য অভিযান : সম্রাট পিতার ন্যায় দাক্ষিণাত্যে নজর দিলেও তা নানা কারণে ব্যর্থ হয়।
১১. জাহাগীরের সাথে ইউরোপীয়দের সম্পর্ক : সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে জেসুইটরা ছাড়াও ওলন্দাজ বা ডাচ এবং ইংরেজরা ভারতবর্ষে আসে।
তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুবিধা লাভের জন্য সম্রাটের দরবারে যাতায়াত করতো। মি. হকিন্স, টমাস রো, এডয়ার্ড টেরি প্রমুখ ইংরেজ বণিক জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীর ও নুরজাহান : ১৬১১ সালে হারেমের মিনা বাজারে সম্রাট মেহেরুন্নেসাকে দেখে তার রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে বিবাহ করেন এবং নূরজাহান উপাধি দিয়ে সম্রাজ্ঞীর মর্যাদা লাভ করেন।
এরপর থেকে নূরজাহান সম্রাটের উপর অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। তার এ প্রভাবকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা : সুপ্রভাব ও কুপ্রভাব।
নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
সুপ্রভাব : নূরজাহান মুঘল দরবারের গৌরব ও শ্রীবৃদ্ধি করেন। তিনি শুধু অসামান্য রূপবতী মহিলাই ছিলেন না, বরং তিনি সাহিত্য, কবিতা ও ফারসি ভাষায় তার অগাধ ব্যুৎপত্তিও ছিল।
তিনি বিভিন্ন ধরনের রেশমি ও সুতিবস্ত্রের এবং সুন্দর সুন্দর অলঙ্কারের নমুনা তৈরি করেন। মুনতা-খাবাতুল-খুবাব গ্রন্থের রচয়িতা ঐতিহাসিক হাশিম কাফি বলেন, “নূরজাহান মুঘল আমলে যে ফ্যাশন চালু করেন, তা আজো সমাজে প্রচলিত আছে।"
সম্রাজ্ঞী নূরজাহান মুঘল দরবারে নিপীড়িত ও নির্যাতিতদের শেষ আশ্রয়স্থল ছিলেন। মুহাম্মদ হাদি মন্তব্য করেন, “সকল বিপদগ্রস্তদের আশ্রয়মহল ছিলেন সম্রাজ্ঞী নূরজাহান এবং তিনি ব্যক্তিগত অর্থে অসহায় মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন।"
কুপ্রভাব : সম্রাট জাহাঙ্গীরের উপর সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের কুপ্রভাব বলতে সাধারণত রাজনৈতিক প্রভাবকে বুঝানো হয় ।
এ সম্পর্কে মোঃ হাদি বলেন, “নূরজাহান প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী শাসক হয়ে বসলেন এবং সম্রাট তার হাতের পুতুলে পরিণত হন।
নূরজাহানের চেষ্টায় তার পিতা মির্জা গিয়াস বেগ ‘ইতিমাদ-উদ-দৌলা' উপাধি লাভ করেন এবং তার ভাই খান-ই- সামান নিযুক্ত হন।
নূরজাহান তার কন্যা লাভলী বেগমকে শাহজাদা শাহরিয়ারের সাথে বিয়ে দিয়ে তাকে সিংহাসনে বসানোর জন্য তদবির করেন।
যেকোনো রাজকীয় ফরমান নূরজাহানের স্বাক্ষর ছাড়া মূল্যহীন বলে বিবেচিত হতো। মুদ্রায় সম্রাটের নামের সাথে তার নামও অঙ্কিত হতে থাকে।
নূরজাহানের পুরুষোচিত ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে শাহজাদা খুররম ও মহব্বত খান সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। নূরজাহানের রাজনৈতিক স্বার্থপরতার কারণে কান্দাহার মুঘলদের হাতছাড়া হয়ে যায় ।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সম্রাট জাহাঙ্গীর ছিলেন মুঘল ইতিহাসের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অর্জুনের ফাঁসি, বাংলা অধিকার, মেবার অধিকার, কাংড়া বিজয়, কিন্তুাওয়ার অধিকার এবং দাক্ষিণাত্যে সফল অভিযান পরিচালনা করেন।
জাহাঙ্গীরের শাসনামলের কৃতিত্বের জন্য সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের অবদান অনস্বীকার্য হলেও সাম্রাজ্যে গোলযোগ, বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলার জন্য তার ভূমিকা নেহাত কম ছিল না।
