সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন আলোচনা কর

শাহজাহানের রাজত্বকালকে স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন
সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন আলোচনা কর

সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন আলোচনা কর

  • অথবা, সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালকে মুঘল শাসনের স্বর্ণযুগ হিসেবে গণ্য করা হয় কেন? 
  • অথবা, সম্রাট শাহজাহানকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলার কারণসমূহ আলোচনা কর।

উত্তর : ভূমিকা : সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকাল ভারতের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তার সময় স্থাপত্য শিল্প, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রভৃতির চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়। 

ঐতিহাসিক হান্টার বলেন, “সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্য শক্তি ও জাঁকজমকের চরম শিখরে আরোহণ করেছিল”।

→ সম্রাট শাহজাহানের স্বর্ণযুগ বলার কারণ : রাজ্য সম্প্রসারণ, সুশাসন, স্থাপত্য শিল্প, শিল্পকলা, সাহিত্য-সংস্কৃতির উৎকর্ষ সমৃদ্ধির বিচারে সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়। নিজে শাহজাহানের রাজত্বকালকে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলার কারণ আলোচনা করা হলো।

১. শাসন নীতি ও শাসনব্যবস্থা : সম্রাট শাহজাহানের শাসন দক্ষতা সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণ ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি তার পূর্বসূরীদের শাসন নীতি অনুসরণ করে সাম্রাজ্যে শান্তি- শৃঙ্খলা নিশ্চিত করেন। 

তার শাসনামলে কোনো বৈদেশিক আক্রমণ সংঘটিত হয়নি। তিনি শাসনকার্যের প্রতিটি বিভাগ নিজে তদারক করতেন। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি বিধানে তিনি কখনই দ্বিধা করতেন না।

২. অর্থনৈতিক অবস্থা : সম্রাট শাহজাহানের আমলে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়। ভূমি রাজস্ব ছাড়াও তিনি পণ্য কর, বিক্রয় কর, তীর্থ কর প্রভৃতি আদায় করতেন। 

এ সময় পশ্চিম এশিয়ার সাথে রপ্তানি বাণিজ্যের উন্নতি সাধিত হয়। এর ফলে সাম্রাজ্যের শক্তি ও সমৃদ্ধি উন্নতির শীর্ষে পৌঁছে ।

৩. শিল্প ও স্থাপত্যের উৎকর্ষ সাধনকারী : সম্রাট শাহজাহান এর ন্যায় সৌন্দর্য ও জাকজমকপূর্ণ নরপতি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। 

স্থাপত্যশিল্পের দিক দিয়ে পৃথিবীর আর কোনো সম্রাটই এতো গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হননি। তার স্থাপত্য কীর্তির অন্যতম নিদর্শন হলো তাজমহল, মতি মসজিদ, লালকেল্লা, লিল্লির জামে মসজিদ, ময়ূর সিংহাসন ইত্যাদি।

৪. বিচারব্যবস্থা : সম্রাট শাহজাহানের বিচারব্যবস্থা মুঘল আমলে অনন্য নজির স্থাপন করেছে। তিনি কর্মচারীদের উপর সজাগ দৃষ্টি রাখতেন এবং কর্তব্যে অবহেলার জন্য কঠোর শাস্তি দিতেন। সাধারণ অপরাধের জন্য তিনি অঙ্গচ্ছেদন এবং গুরুতর অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতেন।

৫. জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার : সাহিত্যের প্রতি শাহজাহানের প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। বহু কবি, সাহিত্যিক, পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক তার রাজসভা অলংকৃত করে। 

তার পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষা, সাহিত্য ও কাব্যের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিল এবং শিক্ষা প্রসারের জন্য বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা স্থাপন করেন।

৬. শিল্পকলার সমৃদ্ধি : শাহজাহান একজন শিল্পানুরাগী সম্রাট ছিলেন। অনেক ঐতিহাসিক তাকে "The Prince of Builders or Engineer King" বলে অভিহিত করেছেন। 

তার আমলে চিত্রশিল্পের এবং স্থাপত্যশিল্পের ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়। তার নির্মিত ইমারতাদির মধ্যে তাজমহল, মতি মসজিন, দেওয়ান-ই-আম, জামে মসজিদ তার অপূর্ব স্থাপত্য কীর্তির সাক্ষর বহন করেছে। 

অধুনালুপ্ত ময়ূর সিংহাসন তার শিল্পানুরাগের এক অনন্য নিদর্শন। শাহজাহান নামে তিনি যে নগর নির্মাণ করেন তাই বর্তমান কালের বিখ্যাত নতুন দিল্লি।

মূল্যায়ন : সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সর্বোপরি স্থাপত্যশিল্পে সবচেয়ে বেশি উৎকর্ষ লাভ করে। মুঘল বংশের আর কোনো শাসকের সময় উন্নতি সাধিত হয়নি।

এজন্য সম্রাট শাহজাহানকে স্থাপত্য শিল্পের নির্মাতা বলা হয় এবং তার শাসনকালকে মুঘলদের স্বর্ণযুগ বলা হয়। 

ড. ঈশ্বরীপ্রসাদ বলেন, “যে শাহজাহানের জীবনকাল অপূর্ব জাঁকজমক ও প্রাণ প্রাচুর্যের মধ্যে শুরু হয় তা অন্যতম গ্রিক বিয়োগান্ত নাটকের বেদনা-বিধুর পরিস্থিতির মধ্যে পরিসমাপ্তি ঘটে।”

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে সম্রাট শাহজাহান মুঘল বংশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। 

তিনি তার দক্ষতা, রণনৈপুণ্য দ্বারা যেসব স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন রেখে গেছেন তা পৃথিবীর বুকে আজো শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার । 

বর্তমানে ঐতিহাসিকগণও সম্রাট শাহজাহানের স্থাপত্যশিল্পকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে স্বীকার করেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ