কাবুল গমনের দুঃসাহসিক যাত্রাপথের বিবরণ দাও

কাবুল গমনের দুঃসাহসিক যাত্রাপথের বিবরণ দাও 

কাবুল গমনের দুঃসাহসিক যাত্রাপথের বিবরণ দাও
কাবুল গমনের দুঃসাহসিক যাত্রাপথের বিবরণ দাও 

উত্তর : কাবুল যেতে হলে যে সাত আট হাজার ফুট পাহাড় চড়তে হয় নিমলার কিছুক্ষণ পরেই তার আরম্ভ। 

সিলেট থেকে যারা শিলঙ গিয়েছিলেন, দেরাদুন থেকে মুসৌরী, কিম্বা মহাবলেশ্বরের কাছে পশ্চিমঘাট উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের পক্ষে এ রকম রাস্তার চুলের কাঁটার বাঁক হাঁসুলি চাকের মোড় কিছু নতুন নয়- নতুনত্বটা হচ্ছে যে, এ রাস্তার কেউ মেরামত করে দেয় না, এখানে কেউ রেলিং বানিয়ে দেয় না। 

হরেকরকম সাইনবোর্ড দু'দিকের পাহাড়ে সেঁটে দেয় না। বিশেষ সংকীর্ণ সংকট পার হবার জন্য সময় নির্দিষ্ট করে দু'দিকের মোটর আটকানো হয় না। মাটি ধসে রাস্তা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে যতক্ষণ না জন আটেক ড্রাইভার আটকা পড়ে আপন আপন শাবল দিয়ে রাস্তা সাফ করে নেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কিছু করবার নেই। যারা শীতকালে এর রাস্তা দিয়ে গিয়েছেন তাদের মুখে শুনেছি যে রাস্তার বরফও নিজেদের সাফ করতে হয়। 

অবশ্য বরফ সাফ করাতে আভিজাত্য আছে শুনেছি স্বয়ং হুমায়ূন বাদশাহ নাকি শেরশাহের তাড়া খেয়ে কাবুল না কান্দাহার যাবার পথে নিজ হাতে বরফ সাফ করেছিলেন।শিলঙ-নৈনিতাল যাবার সময় গাড়ির ড্রাইভার অন্তত এ সান্ত্বনা দেয় যে, দুর্ঘটনা বড় একটা ঘটে না। এখানে যদি কোনো ড্রাইভার এ রকম কথা বলে তবে আপনাকে শুধু দেখিয়ে দিতে হবে, রাস্তার যে-কোনো এক পাশে, হাজার ফুট গভীর খাদে দুর্ঘটনায় অপমৃত্য দুটো-একটা মোটর গাড়ির কঙ্কাল। 

এক হিল-স্টেশনের চড়াইয়ের মুখে দেখা যায় ড্রাইভারদের বুকে যমদূতের ভয় জাগাবার জন্য রাস্তা কর্তা ব্যক্তিরা একখানা ভাঙা মোটর ঝুলিয়ে রেখেছেন-নিচে বড় বড় হরফে লেখা, 'সাবধানে না চললে এ অবস্থা তোমারও হতে পারে।' 

কাবুলের রাস্তার মুখে সে রকম ব্যাপক কোনো বন্দোবস্তের প্রয়োজন হয় না-চোখ খোলা রাখলে দু'দিকে বিস্তর প্রাঞ্জল উদাহরণ দেখতে পাওয়া যাবে।কখনো হঠাৎ বাঁক নিয়ে সামনে দেখতে পাবেন আধ মাইল লম্বা উটের লাইন। একদিকে পাহাড়ের গা, আর একদিকে হাজার ফুট গভীর খাদ, মাঝখানে গাড়ি বাদ দিয়ে রাস্তার ক্লিয়ারিং এক হাত। তার ভিতর দিয়ে নড়বড়ে উট দূরের কথা, শান্ত গাধাও পেরুতে পারে না।

চওড়া রাস্তার আশায় আধ মাইল লম্বা উটের সারিকে পিছু ঠেলে নিয়ে যাওয়াও অসম্ভব। তখন গাড়িই ব্যাক করে চলে উল্টো দিকে। সে অবস্থায় পিছনের দিকে তাকাতে পারেন এমন স্থিতপ্রজ্ঞ, এমন স্নায়ুবিহীন স্থিতধী মুনিপ্রবর আমি কখনো দেখি নি। সবাই তখন চোখ বন্ধ করে কলমা পড়ে আর মোটর না-থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকে। 

তারপর চোখ খুলে যা দেখে সেও পিলে চমকানিয়া। আস্তে আস্তে একটা একটা করে উট সেই ফাঁকা দিয়ে যাচ্ছে, তারপর বলা নেই কওয়া নেই, একটা উঁট হঠাৎ আধপাক নিয়ে ফাঁক টুকুও আড়াআড়ি বন্ধ করে দেয়। পিছনের উটগুলো সঙ্গে সঙ্গে না থেমে সমস্ত রাস্তা জুড়ে ঝামেলা লাগায়-স্রোতের জল বাঁধ দিলে যে রকম জল চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। 

যে উটটা রাস্তা বন্ধ করেছে তাকে তখন সোজা করে ফের এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য জন পাঁচেক লোক সামনে থেকে টানাটানি করে, আর জন বিশেক পিছন থেকে চেঁচামেচি হৈ-হল্লা লাগায়। 

অবস্থাটা তখন অনেকটা ছোট গলির ভিতর আনাড়ি ড্রাইভার মোটর ঘোরাতে গিয়ে আটকা পড়ার মতো। পার্থক্য শুধু এটুকু যে সেখানে হাজার ফুট গভীর খাদের ভয় নেই, আর আপনি হয়ত রকে বসে বিড়ি হাতে আন্ডা-বাচ্চা নিয়ে গুষ্ঠিসুখ অনুভব করছেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ