কোনো মানুষ কোনো বিষয়ে বিশেষ শিক্ষা লাভ করলে, সে সেই বিষয়ের গোড়ার দিককে তেমন খাতির করে না।”-উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কেকাধ্বনি' প্রবন্ধের আলোকে ব্যাখ্যা কর


কোনো মানুষ কোনো বিষয়ে বিশেষ শিক্ষা লাভ করলে, সে সেই বিষয়ের গোড়ার দিককে তেমন খাতির করে 
না।”-উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কেকাধ্বনি' প্রবন্ধের আলোকে ব্যাখ্যা কর  

উত্তর : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন প্রবন্ধ গ্রন্থে তাঁর চিন্তাশীল ও ভাবুক মনের পরিচয় মেলে। তিনি যেসব প্রবন্ধ লিখেছেন তার মধ্যে 'বিচিত্র প্রবন্ধ' সংকলনটি অন্যতম একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ। 

বিচিত্র প্রবন্ধ' গ্রন্থের আত্মভাবনিষ্ঠ প্রবন্ধের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রবন্ধ 'কেকাধ্বনি' নামক প্রবন্ধটি। এ প্রবন্ধে লেখক ইন্দ্ৰিয়লব্ধ কোন বিষয়ের চেয়ে মনের দ্বারা আবিষ্কৃত বিষয়কে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।

বিচিত্র প্রবন্ধ' গ্রন্থের আত্মভাবনিষ্ঠ প্রতিনিধিত্বমূলক প্রবন্ধ 'কেকাধ্বনি'। প্রবন্ধটি লেখক শিল্পসার্থক ও সৌন্দর্যগুণে সুষমামণ্ডিত করে তুলেছেন। 'কেকা' শব্দের অর্থ হলো ময়ূরের ডাক। আর এ কেকাধ্বনিকে তিনি মন থেকে নতুন রূপে আবিষ্কার করে তাকে বর্ষাঋতুর সাথে সহযোগ ঘটিয়ে অপূর্ব শিল্প সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছেন। 

সাধারণ মানুষের কাছে কোকিলের ডাক, কেকাধ্বনি বা ব্যাঙের ডাক তেমন কিছুই নয়। কিন্তু কবিদের কাছে কোকিলের স্বর হলো বসন্তের আগমনী গান, আর কেকাধ্বনি আর ব্যাঙের ডাক হলো বর্ষার গান। মধ্যযুগের কবি বিদ্যাপতির কাছে বর্ষা এসেছে নতুন ছন্দে ও নতুন তালে। তার কাব্যে বর্ষা অত্যন্ত সজীব ও জীবন্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। 

কবি বিদ্যাপতি বিশেষ এক পরিবেশে ব্যাঙের ডাককে মিষ্ট জ্ঞান করেছেন। বিরহিনীর বিরহবেদনার সঙ্গে কবির কেকারব জড়িত থাকার কারণ তা শ্রুতিমধুর বলে পথিকবধূকে ব্যাকুল করে না-তা বর্ষার মর্মোদঘাটন করে দেয়। 

রনারীর প্রেমের মধ্যে একটি অত্যন্ত আদিম প্রাথমিক ভাব আছে, তা বহিঃপ্রকৃতির অত্যন্ত নিকটবর্তী, তা জল-স্থল আকাশের গায়ে গায়ে সংলগ্ন। ষড়ঋতু আপন পুষ্পপর্যায়ের সাথে সাথে এ প্রেমকে নানান রঙে সাজায়ে দিয়ে যায়। 

যাতে পল্লবকে স্পন্দিত, নদীকে তরঙ্গিত, শস্যশীর্ষকে হিলোয়িত করে, তা একেও অপূর্ব চাঞ্চল্যে আন্দোলিত করতে থাকে। 

লেখক এ প্রবন্ধে বলেছেন, কোনো মানুষ কোনো বিষয়ে বিশেষ শিক্ষা লাভ করলে, সে সেই বিষয়ের গোড়ার দিককে তেমন খাতির করে না, তার কৌতূহলের বিষয় থাকে আরও গভীরে, অপরদিকে যে অশিক্ষিত সে তার গোড়ার অংশটুকু বুঝে, তার চেয়ে বেশি সীমা সে পায় না, এ জন্য সেই অগভীর অংশই তার একমাত্র আনন্দ। 

এ প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন, “সমজদারের আনন্দকে সে একটা কিম্ভুত ব্যাপার বলিয়া মনে করে; অনেক সময় তাহাকে কপটতার আড়ম্বর বলিয়াও গণ্য করিয়া থাকে।

এ জন্যই সর্বপ্রকার কলাবিদ্যা সম্বন্ধে শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের আনন্দ ভিন্ন ভিন্ন পথে যায়। তখন এক পক্ষ বলে, 'তুমি কি বুঝবে।' আর এক পক্ষ রাগ করে বলে, 'যাহা বুঝিবার তাহা কেবল তুমিই বুঝ জগতে আর কেহ বুঝি বুঝে না।' 

একটি সুগভীর সামঞ্জস্যের আনন্দ, সংস্থান সমাবেশের আনন্দ, দুরবর্তীর সাথে যোগ-সংযোগের আনন্দ, পার্শ্ববর্তীর সাথে বৈচিত্র্য সাধনের আনন্দ- এগুলো মানবিক আনন্দ। ভিতরে প্রবেশ না করলে, না বুঝলে, এ আনন্দ ভোগ করার উপায় নেই। 

উপর থেকে চট্ করে যে সুখ পাওয়া যায় এটা তা অপেক্ষা স্থায়ী ও গভীর।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ