ফাতেমীয় খলিফা আল কাইম এর শাসনামল আলোচনা কর
![]() |
| ফাতেমীয় খলিফা আল কাইম এর শাসনামল আলোচনা কর |
ফাতেমীয় খলিফা আল কাইম এর শাসনামল আলোচনা কর
- অথবা, খলিফা আবুল কাশেম আল কাইম বিল্লাহর শাসনকাল আলোচনা কর।
উত্তর : ভূমিকা : ইসলামের ইতিহাস পঠন-পাঠনে যে সকল বিষয় খুবই গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হয় তার মধ্যে ফাতেমীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা অন্যতম। এটি এমন একটি রাজনৈতিক বিষয় যা বিশ্বজনীন এক ঘটনা।
মিশরের ফাতেমীয় রাজ বংশের দ্বিতীয় খলিফা হলেন আল কাইম। তিনি দীর্ঘ এক যুগের অধিক সময় ক্ষমতায় থেকে ফাতেমীয় খিলাফতকে মজবুত করেন।
তিনি সাহসীকতার সাথে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। এছাড়া ভূমধ্য সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি খারেজিদের হাতে থেকে রাজধানী মাহাদীয়াকে রক্ষা করেন।
আল কাইমের পরিচয় ও সিংহাসন আরোহণ : আল কাইম ওবায়দুল্লাহ আল মাহদীর সুযোগ্য পুত্র। আল কাইম সিরিয়ার সালামিয়ায় ৮৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন দক্ষ শাসক ছিলেন।
তিনি সামরিক ক্ষেত্রে পারদর্শী ছিলেন। আল মাহদীর শাসনামলে তিনি বার্বারদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে বিজয় লাভ করেন।
তিনি নিজেকে একজন সামরিক যোদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত করেছিলেন। আল কাইম ছিল মূলত তার উপাধি। তার প্রকৃত নাম ছিল আবুল কাসেম।
পিতা মৃত্যুর পর ৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আল কাইম উপাধি গ্রহণ করে খলিফার আসনে বসেন। অত্যন্ত সফলতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করার পর ৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
খলিফা আল কাইমের রাজত্বকাল : মিশরের ফাতেমীয় খলিফা আল কাইমের রাজত্বকালের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ | পর্যালোচনা করা হলো।
১. নৌ-বিভাগ গঠন : খলিফা আল কাইম সর্বপ্রথম নৌ-বিভাগ গঠনে মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নৌ-বাহিনী গঠন করেন। পরবর্তীতে তার পুত্র আল মুইজ এই বাহিনীকে একটি অপ্রতিরোধ্য বাহিনীতে পরিণত করেন।
২. ভূমধ্যসাগরে আধিপাত্য প্রতিষ্ঠা : ফাতেমীয়দের অধীনস্ত বন্দরসমূহে ইতালির জলদস্যুরা পিসা ও লিবিয়ান উপকূলে এসে নানাভাবে উৎপাত চালাত।
খলিফা আল কাইম তাদের আক্রমণ করে ভূমধ্যসাগরে ফাতেমীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার নৌ-বাহিনী সে সকল স্থানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন তা নিম্নে আলোচনা করা হলো ।
(ক) জেনোয়া দখল : আল কাইমের নৌবাহিনী ৯৩৫ সালে ভূ-মধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সের উপকূলীয় অঞ্চলে পৌঁছায় এবং ফ্রান্সের বিখ্যাত বন্দর জেনোয়া দখল করেন।
(খ) ফালারিয়া উপকূল আক্রমণ : ৯৩৫ সালে জেনোয়া দখলের পর আল কাইমের নৌ-বাহিনী ফ্রান্সের বিখ্যাত সমৃদ্ধ অঞ্চল ফালাবিয়া আক্রমণ করেন এবং এই অভিযানে তিনি বিপুল ধন-সম্পদ ও দাস-দাসী অর্জন করেন।
৩. খারিজিদের দমন : আৰু ইয়াজিদ নামক একজন খারিজি ও বার্বার নেতা ৯৪২-৯৪৩ সালে ফাতেমীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে।
তিনি ফাতেমীয় বংশের ধ্বংস সাধন করে বাবার রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য স্পেনের উমাইয়া খলিফা নাসিরকে আমন্ত্রণ জানান। ইয়াজিদ আওরাস পর্বত এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায় ফলে ফাতেমীয় সৈন্যরা তাকে কঠোরভাবে দমন করে।
৪. উপকূলীয় শহর রক্ষা : ইয়াজিদ এর নেতৃত্বে দুর্ধর্ষ বার্বার বাহিনীর আবার কাতেমীর উপকূলগুলো আক্রমণ করলে আল ফাইম তাদের কঠোরভাবে দমন করে উপকূলীয় এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
৫. রাজধানী সুরক্ষা : বার্বারা ফাতেমীয় রাজধানী দখল প্রচেষ্টা চালালে খলিফা আল কাইম তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দূরদর্শীতার সাথে লড়াই করে। ফাতেমা এবং সানজাহ গোত্র আল কাইমকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। প্রবল আক্রমনের মুখে ইয়াজিদ পলায়ন করে।
৬. তিউনিসিয়া দখল : খলিফা আল কাইম ইয়াজিদকে দমনের পাশাপাশি সমগ্র ভিউনেসিয়ায় আক্রমণ করে তা নিজের অধিকারে আনতে সক্ষম হন। এ সময় ইয়াজিদ এর শক্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। ফাতেমীয় এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
৭. মাগ্বিরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা : বার্বারগণ সমগ্র মাগবিরে এক বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ফলে শান্তি বিনষ্ট হয়। আল কাইম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাদের মোকাবেলা করেন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
৮. মিশর আক্রমণ : মিশর বিজয় করে ফাতেমীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা ছিল আল কাইমের বাসনা। ফলে তিনি মিশর আক্রমণ করলেও ইখশিয়দের আধিপাত্য থাকায় তা সফল হয়নি।
আমিরের ভাই ওবায়দুল্লাহ ১৫০০ অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে খলিফা আল কাইমের বাহিনীকে আলেক জান্দ্রীয়ায় বিধ্বস্ত করেন।
৯. ফাতেমীয় বংশের ঐক্যের বিধান : খলিফা আল কাইম খারেজি এবং বার্বারদের সম্মেলিত বিরোধিতার মূলে কুঠারাঘাত করে ফাতেমীয়দের ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এ ছাড়াও তিনি জলদস্যুদের দমন করে উপকূলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন ।
১০. খলিফা আল কাইমের ইন্তেকাল : বার্বার নেতা আবু ইয়াজিদ ৯৪৬ সালে দমা অবরোধ করলে আল কাইম তার বিরুদ্ধে অভিযান প্রস্তুতি গ্রহণ করার সময় ইন্তেকাল করেন । এর মধ্যে দিয়ে একজন সাহসী বীর সৈনিকের যুগের অবসান ঘটে ।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, আল কাইম ছিলেন একজন দক্ষ সৈনিক সেনাপতি এবং সমরবিদ । তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ফাতেমীয়দের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় লড়াই করে গেছেন।
অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অনুকূলে থাকলে তিনি আরও সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারতেন। তবে তিনি ভূমধ্যসাগরের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
ফাতেমীয় খিলাফতের স্থায়িত্ব বিধান এবং সংহতি বিধানের জন্য তার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে।
