কোনো কোনো জিনিসগুলো কাবুলের প্রাণ ধরে রেখেছে? কীভাবে?

 কোনো কোনো জিনিসগুলো কাবুলের প্রাণ ধরে রেখেছে? কীভাবে?
কোনো কোনো জিনিসগুলো কাবুলের প্রাণ ধরে রেখেছে কীভাবে

কোনো কোনো জিনিসগুলো কাবুলের প্রাণ ধরে রেখেছে? কীভাবে?

উত্তর : কাবুলের প্রাণ ধরে রেখেছে সে দেশের বাজার, বাজারের পাশে সরাই আর ইরানিদের কণ্ঠে হাফিজের গজল । বাবুর বাদশা কাবুলের বাজার দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। 

বহু জাতের ভিড়ে কান পেতে যেসব ভাষা শুনেছিলেন, তার একটা ফিরিস্তিও তাঁর আত্মজীবনীতে দিয়েছেন;- আরবি, ফারসি, তুর্কি, মোগলী, হিন্দী, আফগানী, পশাঈ, প্রাচী, গেবেরী বেরেকী ও লাগমানী। 'প্রাচী' হলো পূর্ব-ভারতবর্ষের ভাষা, অযোধ্যা অঞ্চলের পূরবীয়া-বাঙালা ভাষা তারই আওতায় পড়ে। সেসব দিন গেছে; তামাম কাবুলে এখন যুক্তপ্রদেশের তিনজন লোকও আছে কি না সন্দেহ। 

তবু প্রাণ আছে, আনন্দ আছে। বাজারের শেষপ্রান্তে প্রকাণ্ড সরাই। সেখানে সন্ধ্যার নামাজের পর সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য কাজকর্মের ইস্তফা দিয়ে বেঁচে থাকার মূল চৈতন্যবোধকে পঞ্চেন্দ্রিয়ের রসগ্রহণ দিয়ে চাঙ্গা করে তোলে। 

মঙ্গোলরা পিঠে বন্দুক ঝুলিয়ে ভারি রাইডিং বুট পরে, বাবরী চুলে ঢেউ খেলিয়ে গোল হয়ে সরাই-চত্বরে নাচতে আরম্ভ করে। বুটের ধমক, তালে তালে হাততালি আর সঙ্গে সঙ্গে কাবুল শহরের চতুর্দিকের পাহাড় প্রতিধ্বনিত করে তীব্র কন্ঠে আমুদরিয়া-পারের মঙ্গোল সংগীত। 

থেকে থেকে নাচের তালের সঙ্গে ঝাঁকুনি দিয়ে মাথা নিচু করে দেয়, আর কানের দু'পাশের বাবরী চুল সমস্ত মুখ ঢেকে ফেলে। লাফ দিয়ে তিন হাত উপরে উঠে শূন্যে দু'পা দিয়ে ঘন ঘন ঢেরা কাটে, আর দু'হাত মেলে দিয়ে বুকে চেতিয়ে মাথা পিছনের দিকে ঠেলে বাবরী চুল দিয়ে জামা ঢেকে দেয়। কখনো কোমর দু'ভাঁজ করে নিচু হয়ে বিলম্বিত তালে আস্তে আস্তে হাততালি, কখনো দু'হাত শূন্যে উৎক্ষিপ্ত করে ঘূর্ণি হাওয়ার চর্কিবাজী। সমস্তক্ষণ চক্কর ঘুরেই যাচ্ছে, ঘুরেই যাচ্ছে।


আবার এ সমস্ত হট্টগোল উপেক্ষা করে দেখবেন, সরাইয়ের এক কোণে কোনো ইরানি কানের কাছে সেতার রেখে মোলায়েম বাজনার সঙ্গে হাফিজের গজল গাইছে। আর পাঁচজন চোখ বন্ধ করে বুঁদ হয়ে দূর ইরানের গুল বুলবুল আর নিঠুরা নিদয়া প্রিয়ার ছবি মনে মনে এঁকে নিচ্ছে। 

আরেক কোণে পীর-দরবেশ চায়ের মজলিশের মাঝখানে দেশ-বিদেশের ভ্রমণকাহিনী, মেশেদ-কারবালা, মক্কা-মদিনার তীর্থের গল্প বলে যাচ্ছেন। কান পেতে সবাই শুনছে, বুড়োরা ভাবছে কবে তাদের উপর আল্লার করুণা হবে, মৌলা কবে তাদের মদিনায় ডেকে নিয়ে যাবেন, প্রাণ তো ওষ্ঠাগত- লবো পর হৈ দম আয় মুহম্মদ সমহালো, মেরে মৌলা মুঝে মদিনে বোলা লো! ঠোঁটের উপর দম এসে গেছে বাঁচাও মুহম্মদ, হে প্রভু আমার ডাকো মদিনায়, ধরেছি তোমার পদ ।

পুস্তিন ব্যবসায়ীর কুঠরিতে কবির মজলিশ। অজাতশ্মশ্রু সুনীলগুক্ষ, কাজল-চোখ, তরুণ কবি মোমবাতির সামনে হাঁটু মুড়ে বসে তুলোট কাগজে লেখা কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন। 

তাঁর এক পদ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তামাম মজলিশ একগলায় পদের পুনরাবৃত্তি করছে মাঝে মাঝে উৎসাহিত হয়ে মরহাবা, আফরীন, শাবাশ বলে উচ্চকণ্ঠে কবির তারিফ করছে। সব মিলিয়ে কাবুলের জীবন এখনো প্রাণবন্ত ও সজীব।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ