কাহ্নপার পরিচয় দাও

কাহ্নপা'র পরিচয় দাও 

অথবা, কাহ্নপা সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ ।

কাহ্নপা'র পরিচয় দাও
কাহ্নপা'র পরিচয় দাও 

উত্তর : কাহ্নপা বা কানুপা বাংলা ভাষা-সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের আদি কবিদের মধ্যে অন্যতম। তিনি চর্যাপদের সর্বোচ্চ পদকর্তা হিসেবে তেরোটি পদ [৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৮, ১৯, ৩৬, ৪০, ৪২, ৪৪ ও ৪৫ রচনা করেন। 

এগুলো সংকলিত আছে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম গীতিসংগ্রহ ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়'-এ। ভণিতায় কাহ্ন, কাহিলা, কাহিল প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তাঁর নামের উল্লেখ রয়েছে। তবে কাহ্ন নামাঙ্কিত গানগুলো সব একই ব্যক্তির রচনা নয় বলে পণ্ডিতদের অভিমত। ড. সুকুমার সেন অন্তত দু'জন কাহ্নের অস্তিত্ব অনুমান করেছেন। একজন জালন্ধরপা'র শিষ্য, যাঁর আবির্ভাবকাল আনুমানিক দ্বাদশ শতক। অন্যজন তাঁর পূর্ববর্তী।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, কাহ্নপা ৬৭৫ থেকে ৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। কারো কারো মতে, তাঁর জীবনকাল ৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ের দেবপালের শাসনামলে। কাহ্নপা ছিলেন কর্ণাটকবাসী। নালন্দায় লেখাপড়া করতে এসে তিনি আর ফিরে যাননি। তিনি বাংলার পাহাড়পুরে অবস্থিত বৌদ্ধবিহারেও বাস করতেন বলে ধারণা করা হয়। 

নালন্দায় শিক্ষা শেষে তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে থেকেছেন এবং জ্ঞান বিতরণ করেছেন। তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় জ্ঞানী। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দোহাকোষ’- যা অপভ্রংশ ভাষায় লিখিত। এছাড়া তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলো : শ্রীহেবজ্রপঞ্জিকা, অসম্বন্ধ দৃষ্টি, বজ্রগীতি, গীতিকা, বসন্ততিলক, ভোগরত্নমালা প্রভৃতি। তাঁর পদগুলোতে তৎকালীন সমাজের সুন্দর চিত্র রয়েছে। 

কাহ্নপার পদে চিত্রিত তৎকালীন সমাজের ছবি শিল্পচেতনার চমৎকার নিদর্শন। লোকালয়ের বাইরে একাকিনী ডোমনী তাঁর কুঁড়েঘরে বসবাস করে অস্পৃশ্য ডোমনীর স্থান লোকালয়ে হয় কিন্তু নৃত্য পটিয়সী ডোমনীর ঘরে নিত্য আসা-যাওয়া করে অভিজাত শ্রেণির লোকজন। ডোমনীর নৃত্য-কৌশলে মুগ্ধ কবি তাই ১০নং চর্যাপদে লিখেছেন- “তুলো ডোম্বী হউ কাপালী ।

তোহোর অন্তরে মোএ ঘা লিলি হাড়েরি মালী ॥ ”উদ্দেশ্য।বৌদ্ধধর্মে সহজযান, মহাযান, হীনযান, কালচক্রযান প্রভৃতি শাখা রয়েছে। নির্বাণ লাভই প্রতিটি শাখার মূল নির্বাণ অর্থ বাসনা নিবৃত্তি। নির্বাণের এই সুখবাদ থেকেই পরবর্তীকালে সহজিয়া মতের উৎপত্তি হয়েছে। নির্বাণের মহাসুখকে সহজিয়ারা নাম দিয়েছেন ‘নৈরাত্মাদেবী’। 

এই দেবী শূন্যতার সহচারিণী। এই শূন্যতাই সহজিয়াদের চরম প্রাপ্তি। এর সাথে সাথে মহাসুখ ও করুণা জড়িত । নাথ-সিদ্ধাচার্য জালন্ধরপা'র শিষ্য কাহ্নপা সহজতত্ত্ব সম্পর্কে নিম্নোক্ত পদে বলেন- “ভণ কইসে সহজ বলবা জাই ।

কাঅ-বাকচিঅ জসুণ সমাই আলে গুরু উএসই সীস 1বাক পথাতীত কহিব কীস ॥” (৪০ নং পদ)।

চর্যাপদকর্তাদের মধ্যে একাধিক কাহ্নপাদ থাকলেও কাহ্নপা সম্পর্কে আমরা যে পরিচয় ও চর্যাপদ পাই- তা সেকালের সমাজ ও জীবনকে জানার এবং বিশেষ করে বাংলা সাহিত্য ও ভাষার নিদর্শন হিসেবে গুরুত্ব বহন করে ।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ