ভারতবর্ষকে তাবৎ প্রাচ্য সভ্যতার মিলনভূমি বলা হয়েছে কেন?
ভারতবর্ষকে তাবৎ প্রাচ্য সভ্যতার মিলনভূমি বলা হয়েছে কেন?
![]() |
| ভারতবর্ষকে তাবৎ প্রাচ্য সভ্যতার মিলনভূমি বলা হয়েছে কেন? |
উত্তর : লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী কাবুল যাত্রাকালে পথের মধ্যে এক সরাইয়ে রাত কাটান। সরাইয়ের সার্বিক পরিবেশ বসবাসের অনুপযোগী হলেও মানুষে মানুষে হৃদ্যতার বিষয়টি তাঁকে খুবই আকৃষ্ট করে।
সরাইয়ে কারো কোনো নিতান্ত ঘরোয়া ব্যাপার নেই। তাই পার্সোনাল ইডিয়সিংক্রেসি বা খেয়ালখুশির ছিট নিয়ে কেউ সরাইয়ে আশ্রয় নেয় না। তাতে করে ভালোমন্দ দুই-ই হয়। একদিকে যেমন গরম ধুলো, তৃষ্ণা সত্ত্বেও মানুষ একে অন্যকে প্রচুর বরদাস্ত করতে পারে। অন্যদিকে সকলেই সরাইয়ের কুঠরি চত্বর নির্মমভাবে নোংরা করে।
একদিকে নিবিড় সামাজিক জীবনযাত্রার অন্যদিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিকাশ। ভাবতে ভাবতে দেখি সরাইয়ে এক রাত্রি বাস করেই আমি আফগান তুর্কোমান সম্বন্ধে নানারকম মতবাদ সৃষ্টি করতে আরম্ভ করেছিলেন। হুঁশিয়ার হয়ে ভিতরের দিকে তাকানো বন্ধ করলেন। তবে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান সেই আগের দিনকার জনপদ বা জনশূন্য শিলাপর্বত ।
সর্দারজীকে বললেন রাতে যখন তার গা বিড়োচ্ছিল তখন একটু সুপারি পেলে বড় উপকার হতো। কিন্তু সরাইয়ে পানের দোকান তো চোখে পড়ে না। সর্দারজী বললেন, “পান কোথায় পাবেন বাবুসায়েব? পেশাওয়ারেই শেষ পানের দোকান।
তার পশ্চিমে আফগানিস্তান, ইরান, কোথাও পান দেখিনি পল্টনে ড্রাইভারি করার সময় এসব দেশে আমার ঘোরা হয়ে গিয়েছে। পাঠানও তো পান খায় না। পেশাওয়ারের পানের দোকানের গ্রাহক সব পাঞ্জাবী।"
তখন লেখকের মনে পড়ল, কলুটোলা জাকারিয়া স্ট্রিটে হোটেলের গাড়ি বারান্দার বেঞ্চে বসে কাবুলিরা শহর রাঙা করে না বটে। আরো মনে পড়ল, দক্ষিণ ভারতে বর্মা মালয়ে এমন কি খাসিয়া পাহাড়েও প্রচুর পান খাওয়া হয় যদিও এদের কেউই কাশী লক্ষ্ণৌয়ের মতো তরিবৎ করে জিনিসটার রস উপভোগ করেতে জানে না।
তবে কি পান অনার্য জিনিস? ‘পান' কথাটা তো আর্য 'কর্ণ' থেকে 'কান, 'পর্ণ' থেকে ' পান'। তবে 'সুপারি'? পূর্ববঙ্গে 'গুয়া' কথাটার 'গুবাক' না পূবাক' কি একটা সংস্কৃত রূপ আছে। কিন্তু তাহলেও তো কোনো কিছুর সমাধান হয় না, কারণ পাঞ্জাব দোয়াব এসব উন্নাসিক আর্যভূমি ত্যাগ করে খাঁটি গুবাক হঠাৎ পূর্ববঙ্গে গিয়ে গাছের ডগায় আশ্রয় নেবেন কেন? আজকের দিনে হিন্দু-মুসলমানের সব মাঙ্গলিকেই সুপারির প্রয়োজন হয়।
লেখকের একবার মনে হয়েছে এ নিতান্তই অনার্যজনসুলভ সামগ্রী। পূর্বপ্রাচ্য থেকে উজিয়ে উজিয়ে পেশোয়ার অবধি পৌঁছেছে। এ কারণে লেখক বলেছেন- "ভারতবর্ষ তাবৎ প্রাচ্য সভ্যতার মিলনভূমি।"
