দেওয়ানা মদিনা' পালাটির রসবিচার কর


দেওয়ানা মদিনা' পালাটির রসবিচার কর 

উত্তর : মানবিক আবেদন, সত্যভাষণ, প্রণয়ের অমর মহিমা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, অপূর্ব সৌন্দর্য ও কাব্যমূল্য প্রভৃতি দিক থেকে মৈমনসিংহের গীতিকাগুলো বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল সংযোজন। 

সামন্তরূপ এক স্থবির, অচঞ্চল ও গতিহীন, সমাজ কাঠামোর সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে আবর্তিত এ অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনার বাস্তবতা ও মনন-মুক্তির প্রবল আকাঙ্ক্ষায় গীতিকাগুলোতে পরম আন্ত রিকভাবে বিধৃত হয়েছে। এ গীতিকায় অন্যতম পালা 'দেওয়ানা মদিনা ।

“দেওয়ানা মদিনা” পালার মধ্যে দুটি কাহিনির সমাবেশ ঘটেছে। তবে তাদের মধ্যে কাহিনিগত ঐক্য বিদ্যমান। দেওয়ান সোনাফর তার প্রথম স্ত্রীর অনুরোধে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় না। কারণ বিমাতার কুটিল আচরণে পুত্রদের জীবন নাশের সম্ভাবনা থেকে। 

প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর অনেক আত্মীয়স্বজনের অনুরোধে দ্বিতীয় বিয়ে করে এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর কুটিলতার জন্য আলাল- দুলালের বনবাস এবং এর সাথে সোনাফর দেওয়ানের মৃত্যু একটি সম্পূর্ণ আখ্যানের সৃষ্টি করেছে। 

অপর দিকে দুলালের কৃষক পরিবারের সাথে মিশে যাওয়া এবং মদিনার সঙ্গে সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলা, পরিশেষে নবলব্ধ দেওয়ানির সামাজিক মর্যাদার সাথে কৃষক জীবনের দ্বন্দ্ব- এই দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে মদিনার মৃত্যু আরেকটি স্বতন্ত্র শাখার সৃষ্টি করেছে। 

তবে এই দীর্ঘ কাহিনির মধ্যে দুটি স্বতন্ত্র শাখার কাহিনিতে ঐক্য কখনো লুপ্ত হয় নি। তবে দেওয়ানা মদিনা'র কাহিনির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত করুণ রসের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। এ করুণ রসের যাত্রা আরম্ভ হয়েছে মূলত দেওয়ান সোনাফরের স্ত্রীর আর্তনাদ এবং তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। 

সোনাফরের স্ত্রীর মৃত্যুর পর আলাল-দুলাল এবং সোনাফর দেওয়ানের ক্রন্দনের মধ্য দিয়ে তা আরো ঘনীভূত হয়েছে। সোনাফর দেওয়ানের প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর লোকজনের অনেক অনুরোধে দ্বিতীয় বিয়ে করে। আলাল-দুলালের সৎমা তাদেরকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং জন্মাদের মাধ্যমে তা শেষ করতে চায়।

জন্মান কৌশলে তাদেরকে নদীবক্ষে নিয়ে শেষ বারের মতো আল্লার নাম স্মরণ করতে বলে- তখন আলাল-দুলাল তাদের পরিণতির কথা ভেবে আর্তনাদ করে উঠে। পূর্বপুরুষের জমিদারি ফিরে পেয়ে দুলাল আর দশজন বাঙালি পুরুষের মতো স্বাভাবিকভাবেই ভুলে গেছে একসময়ের আশ্রয়দাত্রী এবং দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গিনী মদিনাকে। 

দুলাল মদিনাকে তালাক দিয়ে ভাইয়ের কাছে ফিরে এসেছে। তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত মধুর। সুখে-দুঃখে আনন্দে সোহাগে মদিনা ছিল স্বামীর একান্ত অনুরাগিনী। সংসারের কাজ কর্মে দুলাল মাঠে চলে গেলে মদিনা সময়মতো তার খাবার নিয়ে ক্ষেতের মাঠে গিয়েছে। 

প্রয়োজনমতো কাজে তাকে সাহায্য করেছে। গ্রামবাংলার শান্ত নিস্তরঙ্গ মধুময় প্রেম জীবনের এক উজ্জ্বল আলেখ্য আমরা মদিনার দাম্পত্য জীবনে প্রত্যক্ষ করি। দুলাল চলে যাওয়ার পর মদিনা সেই থেকেই নিত্য তার জন্য অপেক্ষা করে। সে কোনোভাবে দুলালকে ভুলতে পারে না। 

বার বার সে দুলালের কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মদিনা বিলাপে দাম্পত্য জীবনের করুণ মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে।

যেমন-

অথবা,

“হায়রে পরাণের বন্ধু রইলা কোন দেশে। অভাগী কান্দিয়া মরে তোমার উদ্দেশ্যে

“হায়রে পরানের খসম কেমন করিয়া।

কোন পরাণে রইলা আমাকে ছাড়িয়া "

মদিনা একান্তই আমাদের স্বজন-আমাদের দুঃখ-বেদনার এক মূর্ত প্রকাশ। স্বামী তাকে ত্যাগ করলেও মদিনা কোনোদিন স্বামীর স্মৃতিকে মুছতে পারেনি। স্বামীর স্মৃতি সামনে রেখে সে প্রতীক্ষার প্রহর গুনেছে। 

একদিন মদিনা তার ছেলে সুরুজকে ভাইয়ের সাথে দুলালের সন্ধানে বানিয়াচঙ্গে পাঠায়। দুলালের সাথে তাদের বানিয়াচঙ্গে দেখা হয়। দুলাল তাদের অপমান করে পাঠিয়ে দেয়। মদিনা তার ছেলে ও ভাইয়ের কাছ থেকে দুলালের ব্যবহার শুনে কষ্ট পায় এবং স্বামীর শোকে পাগলের মতো হয়ে যায়।

মদিনা সারাদিন স্বামীর শোকে কান্নাকাটি করে এবং খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে দেয়। কিছুদিন পর সে তার স্বামীর চিন্তায় | পাগল হয়ে যায় এবং শেষ পর্যায়ে স্বামীর শোকে মদিনা মৃত্যুবরণ করে। মদিনার মৃত্যুর পরে দুলাল আবার নাটকীয় কায়দায় ফিরে আসে মদিনার কাছে এবং মদিনার কবরের পাশের বাতাসকে করুণ রসে ভারি করে তোলে। পালাকারের ভাষায় :

“কয়বর দেখাইয়া পরে জমিনে পড়িয়া । কান্দিতে লাগিল পুত্র মায়ের লাগিয়া

দুলাল পড়িয়া কান্দে কয়বর উপরে। “হায় গো আল্লাজী পড়লাম কি পাপের ফেরে নিজ হাতে বধ করলাম জননার পরাণ।

এই দুনিয়াতে মোর আর নাই খান ॥”

সাধারণত বেশিরভাগ গীতিকারই পরিণতি ট্র্যাজিকধর্মী, করুণ, বিষাদাত্মক ও বিয়োগাত্মক। 'দেওয়ানা মদিনা'র কাহিনির পরিণতিও করুণ বিষাদাত্মক ও বিয়োগাত্মক। এ পালাতেও করুণ-রসের আধিক্য বিদ্যমান।



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ