ব্যতিরেক অলংকার এর উদাহরণ দাও
ব্যতিরেক অলংকার এর উদাহরণ দাও
উত্তর : যদি উপমানের চেয়ে উপমেয়কে উৎকৃষ্ট কিংবা নিকৃষ্ট করে দেখানো হয়, তবে তাকে ব্যতিরেক অলংকার বলে। উপমেয় কেন উৎকৃষ্ট কিংবা নিকৃষ্ট তা কোথাও থাকে উক্ত, আবার কোথাও অনুক্ত ব্যতিরেক ভেদ প্রধান অলংকার।
সাধারণত তিনভাবে এর বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যথা : সাদৃশ্যবাচক শব্দের সাহায্যে, অর্থের সাহায্যে এবং কোথাও ব্যঞ্জনায় ।
(i) কিমতে বোলিব ভাল তুলনা মৃগাঙ্গ! সকলঙ্ক চন্দ্রিমা ললাট নিষ্কলঙ্ক - আলাওল এখানে উপমেয়-ললাট এবং উপমানচন্দ্রিমা । কলঙ্কযুক্ত কিন্তু ললাট কলঙ্কচিহ্নহীন, সুতরাং উৎকৃষ্ট। ব্যতিরেক সার্থক উদাহরণ।
(ii) ভাগ্যের উদয়-স্থপী ললাট সুন্দর। দ্বিতীয়ার চন্দ্র জিনি অতি মনোহরঃ চন্দ্ৰ- আলাওল
এখানে 'জিনি' শব্দ দিয়ে কবি বুঝিয়েছেন ললাট এত সুন্দর যে তার সৌন্দর্য দ্বিতীয়ার চন্দ্রকেও হার মানায়। উপমেয় ললাট এখানেও উৎকৃষ্ট।
(iii) দেখ আসি সুখে রোহিণী-গঞ্জিনী বধূ; পুত্র যাঁর রূপে শশাঙ্ক কলঙ্কী মানে।
—মধুসূদন
এখানে বধূ ও পুত্র উপমেয় উৎকৃষ্ট রোহিণী (গঞ্জিনী) এবং শশাঙ্ক (কলঙ্কী মানে) উপমান থেকে ।
(iv) এর ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে,এল মানুষ-ধরার দল গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এখানে 'নখ' ‘মানুষ-ধরার দল' উপমেয় এবং নেকড়ের (নখর) ও 'অরণ্যে' উপমান। রবীন্দ্রনাথের আফ্রিকা কবিতার থেকে এ উদাহরণ উদ্ধৃত হয়েছে। 'ওরা' ‘মানুষ-ধরার দল' বলতে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজকে এবং 'তোমার' অর্থে আফ্রিকাকে বুঝানো হয়েছে।
আফ্রিকার নেকড়ের (নখর) চেয়েও নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের থাবা (নখ-এর ভাবার্থে) এবং সেই মানুষ- ধরার দল (ইংরেজ) যারা গর্বে অন্ধ, সূর্যহীন আফ্রিকার অন্ধকার অরণ্যের চেয়ে। সুতরাং এখানে উপমেয়ের অপকর্ষ বা নিকৃষ্টত্বের প্রমাণ ।
(v) ঐ তব দোলো দোলো গতি-নৃত্য দুষ্টদল রাজহংসী জিনি চিনি সব চিনি । -কাজী নজরুল ইসলাম এখানে 'তব' (পূজারিণী) গতি উপমেয়ের উৎকর্ষ, কারণ উপমান-রাজহংসীর 'গতি' জিনি ।
(vi) 'বাতাসের চেয়ে স্বচ্ছ তোমার সে প্রত্যাশাকে নিয়ে —জীবনানন্দ দাশ বসে থাকা শেষ হয়ে গেছে এখানেও উপমেয়ের উৎকর্ষ। উপমান ‘বাতাসের' চেয়েও যেহেতু 'স্বচ্ছ' প্রত্যাশা (উপমেয়)।
(vii) যে জন না দেখিয়াছে বিদ্যার চলন সেই বলে ভাল চলে মরাল বারণ ভারতচন্দ্র
এখানে ব্যতিরেক অলংকার সৃষ্টি হয়েছে কবি-বর্ণনার অপূর্ব কৌশলে। নায়িকা বিদ্যার 'চলন' 'মরাল বারণের (হস্তী) চলন অপেক্ষা অনেক সুন্দর- এটাই কবির আসল বক্তব্য।
কিন্তু কবি নায়িকা বিদ্যার ‘চলন’কে সরাসরি সুন্দর বলেননি-তাঁর মতে বিদ্যার চলন যে দেখেনি, সে-ই কেবল মরাল বারণের চলন ভালো বলতে পারে, (সুন্দরী নায়িকার অনুপম গতিভঙ্গি দেখে তার পক্ষে হংস বা হস্তীর গতির প্রশংসা অবান্তর)। অতএব ব্যঞ্জনায় আভাসিত এ ধরনের ব্যতিরেক অলংকারকে গূঢ় ব্যতিরেক বলা হয়।
