ছন্দের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর


ছন্দের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর

উত্তর : ছন্দ হচ্ছে ভাষাগত প্রবহমান ধ্বনি সৌন্দর্য এবং সমস্ত সুকুমার শিল্পের বিশিষ্ট লক্ষণ। মনুষ্য জগতে নটীর পদক্ষেপে ও অঙ্গ সঞ্চালনে, চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়ে, যন্ত্রীর বাদনক্রিয়ায় ছন্দ থাকে। 

প্রকৃতি-জগতেও ছন্দের প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় নদীর ঢেউয়ে, মৃদুমন্দ হাওয়ায়, আন্দোলিত গাছের পাতায়, পাখির গুঞ্জনে তার নিদর্শন আছে। 

তবে ছন্দ কোথাও দৃষ্টিগ্রাহ্য গতি সৌন্দর্য আবার কোথাও শ্রুতিগ্রাহ্য ধ্বনি সৌন্দর্য। কাব্যশিল্পে ছন্দ বলতে বোঝায় শ্রুতিগ্রাহ্য ধ্বনি সৌন্দর্যকে।

কাব্যের বা কবিতায় রসঘন ও শ্রুতিমধুর বাক্যে সুশৃঙ্খল বাক্যে ধ্বনি বিন্যাসের ফলে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় তাকে ছন্দ (Metre) বলে ।

ছন্দের প্রয়োজনীয়তা : ছন্দ কাব্য-সাহিত্যের ভাষাকে সচল করে, গতি দেয়, প্রাণচঞ্চল করে তোলে। যে আবেগে সাহিত্যকর্মের জন্ম, সেই আবেগ ভাষা ও ছন্দের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে তাকে স্পন্দিত ও রসঘন করে।

ছন্দের স্পর্শে গদ্য-পদ্য সৌন্দর্য ও মাধুর্যের আকর হয়ে ওঠে। ফলে তা শ্রোতার কাছে আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী হয়।

• ছন্দ কবিতাতে বাচ্যার্থের অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে সাহায্য করে। উৎকৃষ্ট কবিতার চরম লক্ষ্য বচনসীমা হতে বচনাতীতে উত্তরণ, অর্থের সীমালোক হতে ব্যঞ্জনার মুক্তিলোকে তার ঊর্ধ্বায়ন সেই ব্যঞ্জনার গভীরে কবিতার অনুপ্রবেশের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ছন্দ । 

তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- “মানবের জীর্ণ বাক্যে মোর ছন্দ দিবে নব সুর অর্থের বন্ধন হতে নিয়ে তারে যাবে কিছু দূর ভাবের স্বাধীন লোকে।"

• ছন্দ কবিতার ভূষণ। ছন্দ সমস্ত কবিতার সঙ্গে মিশে তার সৌন্দর্য বর্ধন করে।

• ছন্দ গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতি থেকে কবিতাকে এক পৃথক মহিমাও বিভূতি দান করে। ফলে ছন্দের ঝংকৃত ও স্পন্দিত সুরে কবিতা হয়ে ওঠে স্মরণীয় বাণী।

আব্দুল মান্নান সৈয়দ এর মতে- “চৈতন্যহীন শরীর বা শরীরহীন চৈতন্যের মতো ছন্দহীন কবিতা ও কবিতাহীন ছন্দ সোনার পাথর বাটি।” তাই বলা যায়। ছন্দই কবিতার প্রাণ ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'ছন্দ' গ্রন্থে বলেছেন- “কবিতার ছন্দের বিশেষত্ব হচ্ছে তার গতিশীলতা। সে শেষ হয়েও শেষ হয় না। 

গদ্যে যখন বলি 'কদিন শ্রাবণের রাত্রে বৃষ্টি পড়েছিল।' তখন এই বলার মধ্যে খবরটা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু কবি যখন বললেন-

'রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন রিমিঝিমি শবদে বরিষে ।'

তখন কথা থেমে গেলেও বলা থামে না। এ বৃষ্টি যেন নিত্যকালের বৃষ্টি, পঞ্জিকা-আশ্রিত কোনো দিনক্ষণের মধ্যে বন্ধ হয়ে এ বৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে যায়নি।”

কবিতার মধ্যে ছন্দের সুষ্ঠু ও কৌশলপূর্ণ ব্যবহারে সার্থক চিত্র ফুটে ওঠে। তাই প্রকৃতি ও জীবনের সান্নিধ্যে সৃষ্ট বিচিত্রভাব ছবির মতো প্রত্যক্ষ এবং গানের মতো মধুর করে ছন্দবদ্ধ কাব্যে প্রকাশ পায় । 

কবিতার সঙ্গে ছন্দের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছন্দের সুস্পষ্ট ব্যবহারে কবিতা হয়ে ওঠে রসঘন ও শ্রুতিমধুর। ছন্দের বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই বোধ হয় পৃথিবীর সব সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতাতে ছন্দযুক্ত শব্দ-পদ ব্যবহার করে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলা হয়। 

ছন্দযুক্ত সাহিত্যই কানের মাধ্যমে হৃদয়ে প্রবেশ করে ব্যঞ্জনার সাহায্যে পাঠক ও শ্রোতাকে বিমুগ্ধ করে।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ