ছন্দ কাকে বলে? ছন্দ কত প্রকার ও কী কী ?
ছন্দ কাকে বলে? ছন্দ কত প্রকার ও কী কী ?
উত্তর : ছন্দ হচ্ছে ভাষাগত প্রবহমান ধ্বনি সৌন্দর্য এবং সমস্ত সুকুমার শিল্পের বিশিষ্ট লক্ষণ। মনুষ্য জগতে নটীর পদক্ষেপে ও অঙ্গ সঞ্চালনে, চিত্র শিল্পীর তুলির আঁচড়ে, যন্ত্রীর বাদনক্রিয়ায় ছন্দ থাকে।
প্রকৃতি-জগতেও ছন্দের প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায় নদীর ঢেউয়ে, মৃদুমন্দ হাওয়ায়, আন্দোলিত গাছের পাতায়, পাখির গুঞ্জনে তার নিদর্শন আছে। তবে ছন্দ কোথাও দৃষ্টিগ্রাহ্য গতি সৌন্দর্য আবার কোথাও শ্রুতিগ্রাহ্য ধ্বনি সৌন্দর্য। কাব্যশিল্পে ছন্দ বলতে বোঝায় শ্রুতিগ্রাহ্য ধ্বনি সৌন্দর্যকে।
ছন্দ এমন একপ্রকার রীতি যা পরস্পর বিন্যস্ত বাক্য বা চরণগুচ্ছের মধ্যে ধ্বনিপ্রবাহ, সুসামঞ্জস্য সঙ্গিতমাধুর্য এবং তরঙ্গ- ঝংকার সৃষ্টি করে। স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, অক্ষর, ছেদ, যতি, পর্ব, মাত্রা, শ্বাসাঘাত, পদ, চরণ, স্তবক, লয় প্রভৃতির সমন্বয়ে বাংলা ছন্দের সৃষ্টি হয়।
প্রখ্যাত ছান্দসিক প্রবোধচন্দ্র সেন এর মতে- “শিল্পিত বাক্যরীতির নামই ছন্দ।"
তারাপদ ভট্টাচার্য ছন্দকে সাধারণ অর্থে- 'গতি সৌন্দর্যকে ' এবং ব্যবহারিক অর্থে- ভাষার অন্তর্গত প্রবহমাণ ধ্বনিসৌন্দর্যকে” বুঝিয়েছেন ।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর মতে- “বাক্যস্থিত পদগুলোকে যেভাবে সাজাইলে বাক্যটি শ্রুতিমধুর হয় ও তাহার মধ্যে ভাবগত ও ধ্বনিগত সুষমা উপলব্ধি হয়, পদ সাজাইবার সেই পদ্ধতিকে ছন্দ বলে।”
ফরাসি কবি লুই আর গঁ এর মতে, “কবিতার ইতিহাস তার টেকনিকের ইতিহাস। কবিতার টেকনিকের প্রধানতম অঙ্গ হল তার ছন্দ।”
সুতরাং কাব্যের বা কবিতায় রসঘন ও শ্রুতিমধুর, বাক্যে সুশৃঙ্খল বাক্যে ধ্বনি বিন্যাসের ফলে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় তাকে ছন্দ (Metre) বলে ।
বাংলা ছন্দ তিন প্রকার। যথা :
১. স্বরবৃত্ত,
২. মাত্রাবৃত্ত,
৩. অক্ষরবৃত্ত।
১. স্বরবৃত্ত : রবীন্দ্রনাথ স্বরবৃত্ত ছন্দকেই বলতেন 'বাংলা প্রাকৃত' বা 'লোকছন্দ। সুধীন্দ্রনাথ বলতেন 'স্বরান্তিক'।
সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায় যে ছন্দে যুগ্মধ্বনি বা বদ্ধাক্ষর সংকুচিত হয়ে মুক্তাক্ষরের ন্যায় একমাত্রার মর্যাদা পায় ও পর্বের প্রথমে প্রবল শ্বাসাঘাত বা স্বরাঘাত পড়ে এবং যার মূল পর্ব প্রধানত চার মাত্রার এবং যার লয় হয় দ্রুত তাকে স্বরবৃত্ত ছন্দ বলে।
তবে এ ছন্দকে বলবৃত্ত, দলমাত্রিক, প্রস্বর প্রধান স্বরমাত্রিক, বল প্রধান বা শ্বাসাঘাত প্রধান বা ছড়ার ছন্দ বা ধামালির ছন্দ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয় ।
২. মাত্রাবৃত্ত : কলামাত্রিক, ধ্বনি প্রধান, ধ্বনিমাত্রিক, বিস্তার প্রধান। রবীন্দ্রনাথ একে অভিহিত করেছেন সাধু শ্রেণির ছন্দ বা 'ব্রজবুলি ভাঙা' ছন্দ বলে।
সত্যেন্দ্রনাথের অভিধায় 'হৃদ্যা'। সুধীন্দ্রনাথের সংজ্ঞায়, 'মাত্রিক'; কালিদাস রায় 'স্বরমাত্রিক'; প্রবোধচন্দ্র সেন 'কলাবৃত্ত'। মাত্রাবৃত্ত নামটাও প্রবোধচন্দ্র সেনেরই দেওয়া। সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায়-যে ছন্দ যুগ্মধ্বনি টেনে টেনে বিশ্লিষ্ট ভঙ্গিতে উচ্চারিত হয়।
এবং যার মূল পর্ব চার, পাঁচ, ছয় বা সাত মাত্রার হয়, যার লয় মধ্য লয় তাকে মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বলে। একে ধ্বনি প্রধান বা বিস্তার প্রধান ছন্দও বলা হয়ে থাকে।
৩. অক্ষরবৃত্ত : তান প্রধান, অক্ষরমাত্রিক, মিশ্র প্রাকৃতিক, পয়ার, সংকোচ প্রধান, যৌগিক, মিশ্রকলা মাত্রিক ও মিশ্র কলাবৃত্ত। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,'সাধুছন্দ', 'সংস্কৃত-বাংলার ছন্দ' বা 'পয়ার জাতীয় ছন্দ'। সত্যেন্দ্রনাথ বলতেন 'আদ্যা' মোহিতলাল 'পদভূমক'।
এ ছন্দের প্রবোধচন্দ্র সেনের দেওয়া নাম 'অক্ষরবৃত্ত'। সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায়- যে কাব্য-ছন্দে মূল পর্ব আট বা দশ মাত্রার হয় এবং শব্দধ্বনির অতিরিক্ত একটা তান বা ধীর লয় থাকে তাকে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বলে।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ পয়ার, মহাপয়ার, প্রবহমান পয়ার ও মহাপয়ার, ত্রিপদী, চৌপদী, দিগক্ষরা, একাবলি, সনেট, অমিত্রাক্ষর ছন্দ বিভিন্ন রূপভেদে পৃথক ।
.png)