অমিত্রাক্ষর ছন্দ কাকে বলে উদাহরণ দাও
অমিত্রাক্ষর ছন্দ কাকে বলে উদাহরণ দাও
‘উত্তর : 'অমিত্রাক্ষর' শব্দটির অর্থ অক্ষরের মিলের অভাব অর্থাৎ চরণের শেষে মিল না থাকা।
ইংরেজি কবি মিল্টনের Blank Varse এর অনুসরণে বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর অসামান্য প্রতিভা বলে পয়ারে বেড়ি ভেঙে দিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রবর্তন করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দের।
Blank [Varse ছন্দের গঠন প্রণালির মূল সূত্রটি ধরে অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তিত হলেও মধুসূদনের এ সৃষ্টিকে ঠিক বিদেশি আমদানি বলা চলে না। কারণ এর মূলে রয়েছে বাংলা পয়ারেরই ধ্বনি প্রবাহ এবং নির্দিষ্ট মাত্রা সংখ্যা। কেবল নেই অন্ত্যানুপ্রাস অর্থাৎ চরণান্তে মিল।
সুতরাং যে প্রবহমান পয়ারে অন্ত্যমিল নেই তাকে সহজ কথায় বলে অমিত্রাক্ষর ছন্দ। বস্তুত মিল না থাকাটাই বড় কথা নয়, যতির স্বাধীনতা অর্থাৎ ছন্দের প্রবহমানতাই অমিত্রাক্ষরের বৈশিষ্ট্য ।
অমিত্রাক্ষর ছন্দ সম্পর্কে ড. সুকুমার সেন মন্তব্য করেন, “পয়ারের দুই চরণের নিগড় ভাঙ্গিয়া মধুসুদন ছন্দের প্রসার বাড়াইয়া ভাব প্রকাশের অবকাশ দিলেন-ইহা অমিত্রাক্ষর ছন্দের আসল কথা।"
উদাহরণ :
সম্মুখ সমরে পড়ি/বীর চূড়ামণি বীরবাহু, চলি যবে / গেলা যমপুরে অকালে, কহ, হে দেবি,/অমৃতভাষিণী
কোন বীরবরে বরি/সেনাপতি পদে, পাঠাইলা রণে পুনঃ/রক্ষঃ কুলনিধি রাঘবারি?
এখানে উল্লেখ্য যে, অমিত্রাক্ষর ছন্দ 'মেঘনাদবধ কাব্যে'র ছন্দ রূপে সুপরিচিত হলেও এ ছন্দ মাইকেল মধুসূদন সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন 'তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে' ।
অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈশিষ্ট্যসমূহ :
ক. অমিত্রাক্ষর ছন্দ পয়ারভিত্তিক হওয়ায় এর প্রতিটি পক্তির মাত্রা সংখ্যা চৌদ্দ এবং প্রতি পঙ্ক্তিতে দুটি করে পর্ব থাকে। পর্বের মাত্রাবন্যাস ৮+৬ = ১৪।
খ. যতির স্বাধীনতা অর্থাৎ প্রবহমানতা এ ছন্দে উপস্থিত। প্রত্যেক পঙ্ক্তির মধ্যে ভাবকে শেষ না করে প্রয়োজনবোধে পরবর্তী চরণগুলোতে বিস্তৃতি সাধন করা হয়। যেমন- ধবল নামেতে গিরি/হিমাদ্রির শিরে অভ্রভেদী দেব-আত্মা,/ভীষণ দর্শন; সতত ধবলাকৃতি,
গ. অমিত্রাক্ষর ছন্দে ছেদ ও যতির ব্যবহার একই সঙ্গে সর্বত্র দেখা যায় না। এখানে যতি পড়ে পর্বানুসারে আর ছেদ পড়ে অর্থানুসারে ।
ঘ. অমিত্রাক্ষর ছন্দে অন্ত্যানুপ্রাস বা পক্তির শেষে মিল নেই; ফলে এতে কবির পক্ষে স্বাধীন শব্দ ব্যবহার সহজেই সম্ভব।
ঙ. প্রচুর তৎসম ও সমাসবদ্ধ শব্দ ব্যবহার করায় এ ছন্দে গুরুগম্ভীর ধ্বনি ফুটে ওঠে। যেমন-
কি বলিয়া সম্বোধিবে, হে সুধাংশু নিধি তোমারে অভাগী তারা/গুরু পত্নী আমি তোমারে,
৮+৬
৮+৬
চ. অমিত্রাক্ষর ছন্দে বিভিন্ন প্রকার ক্রিয়াপদের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
ছ. বহু যতি ব্যবহারের ফলে এ ছন্দে প্রচুর শ্বাসাঘাত বা ঝোঁক পড়ে, ফলে একটি তরঙ্গায়িত গতি সর্বত্রই বিদ্যমান।
জ. প্রবহমানতা ও গুরুগম্ভীর শব্দ ব্যবহারের কারণে মহাকাব্যের মতো দীর্ঘ কাব্য রচনায় এ ছন্দ সর্বাপেক্ষা উপযোগী।
বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ ছন্দের মাধ্যমে কবি অন্ত্যমিলের বাঁধন ছিঁড়ে স্বাধীন ভাব সঞ্চারের প্রেরণা লাভ করে।
প্রায় হাজার বছরের বদ্ধতা থেকে মুক্ত করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দের মাধ্যমে অক্ষরবৃত্তের যে নতুন সম্ভাবনাময় দিগন্তের ইঙ্গিত দিলেন পরবর্তীকালে তা গিরিশচন্দ্র ঘোষের হাতে গৈরিশ ছন্দ, রবীন্দ্রনাথ - ঠাকুরের হাতে প্রবহমান পয়ার, মুক্তক ছন্দ, গদ্য ছন্দ প্রভৃতিতে ভিন্নতার রূপ সংযোজিত হয়েছে।
.png)