স্বদেশী সমাজ বলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী বুঝাতে চেয়েছেন?
স্বদেশী সমাজ বলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী বুঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্য, সভা, সংবর্ধনা, আস্ত জাতিক মঞ্চ, বিভিন্ন স্থানে ইতিহাস, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি বিভিন্ন এ বিষয়ে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন।
সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর মা এ চিন্তা-চেতনার সম্মিলন ঘটেছে “আত্মশক্তি” প্রবন্ধ গ্রন্থে। আর মা এ গ্রন্থের অন্যতম একটি প্রবন্ধ ‘স্বদেশী সমাজ'। স্বদেশী সমাজ ব প্রবন্ধে লেখক আমাদের সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহ্য ও দেশের সব ধরনের হিতকর্মের ক্ষেত্রে স্বদেশী সমাজের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধের শুরুতে প্রাবন্ধিক স্বদেশী সমাজের বর্ণনা দিয়েছেন। ইংরেজ জাতি আমাদের সমাজব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ-প্রতিষ্ঠার পূর্বেকার সমাজকে প্রাবন্ধিক স্বদেশী সমাজ বলেছেন। স্বদেশী সমাজ অত্যন্ত সহজ নিয়মে আপনার সমস্ত অভাব আপনিই পূরণ করে নিয়েছে।
বিদ্যাদান হতে জলদান সমস্ত যে সমাজে সংহজভাবে সম্পন্ন হয়েছে তাই স্বদেশী সমাজ বলে পরিচিত। লেখক এ-বিষয়ে উদাহরণ টেনেছেন এভাবে- যেখানে আম কাঁঠালের দেবায়ন উঠেছে, টোলে শাস্ত্র অধ্যয়ন চলেছে, চণ্ডীমণ্ডপে রামায়ণ পাঠ হয়েছে, কীর্তনের সুরে পল্লির প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়েছে- সেটাই স্বদেশী সমাজ।
যে সমাজে সমস্ত লোকহিতকর মঙ্গলকর্ম ও আনন্দ উৎসব অব্যাহতভাবে সমস্ত ধবি-দরিদ্রকে ধন্য করে এসেছে- সেই সমাজই স্বদেশী সমাজ। ধর্ম বলতে যা বোঝা যায় তা যে সমাজে সর্বত্র সঞ্চারিত ছিল- সেটাই স্বদেশী সমাজ।
যে সমাজে দেবালয় জীর্ণ ছিল না, যেখানে উৎসবের আনন্দ ধ্বনি ধ্বনিত হয়েছে, যে সমাজে সব কিছুর কর্তা সরকার ছিল না, যে সমাজ সমস্ত কল্যাণকর্মের ভার নিজে নিয়েছে, গুরুস্থানীয়রা যেখানে বিনা বেতনে ধর্ম শিক্ষা দিয়ে এসেছে, যেখানে বিদ্যাশিক্ষা ধর্ম শিক্ষা কখনো ব্যাঘাতপ্রাপ্ত হয়নি- যে সমাজে প্রজাসাধারণ সামাজিক কর্তব্য দ্বারা আবদ্ধ -ছিল, সমাজের প্রত্যেকেই আশ্চর্যরূপে সামাজিক কাজ ভাগ করে নিয়েছে সেটাই স্বদেশী সমাজ।
যেখানে প্রত্যেকেই স্বার্থ সংযম ও আত্মত্যাগ চর্চায় লিপ্ত ছিল- প্রত্যেকেই স্ব স্ব ধর্ম পালন করেছে সেটাই স্বদেশী সমাজ। যে সমাজে নিঃস্বকে ভিক্ষা দান হতে সাধারণকে ধর্ম শিক্ষা দান করেছে, যে সমাজে স্টেট নয় বরং ধর্ম ব্যবস্থাকে বাঁচানোর দায় ছিল সবার সেটাই স্বদেশী সমাজ।
যেখানে জাতির, নানা রাজার অধীনতা সত্ত্বেও আমাদের মর্মস্থানে নিজের অন্তরের মধ্যে সযত্নে রক্ষা করে এসেছি সেটাই আমাদের স্বদেশী সমাজ। যেখানে ক্ষুদ্র দলাদলি, পরনিন্দা পরিহার করে মাতৃভূমির প্রয়োজনে, চিত্তকে উদার করে, আত্মঅভিমানকে পরিহার করে দেশমাতৃ গৃহকোণে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে সবাই তৎপর- সেই সমাজই স্বদেশী সমাজ।
আসলে প্রাবন্ধিক স্বদেশী সমাজ বলতে দেশ-জাতি-সমাজ মানুষের জন্য যা কিছু কল্যাণকর তাকেই স্বদেশী সমাজের সাথে তুলনা করেছেন।
.png)