রবীন্দ্রনাথের “স্বদেশী সমাজ” প্রবন্ধে বাংলার চিত্ত প্রবাহ পরিবর্তনে কী অবস্থা দাঁড়িয়েছে? তা সংক্ষেপে আলোচনা কর
রবীন্দ্রনাথের “স্বদেশী সমাজ” প্রবন্ধে বাংলার চিত্ত প্রবাহ পরিবর্তনে কী অবস্থা দাঁড়িয়েছে? তা সংক্ষেপে আলোচনা কর
উত্তর : কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর বিশাল অবদান রেখেছেন।
কাব্য, উপন্যাস, নাটক ও ছোট গল্পের ন্যায় প্রবন্ধ সাহিত্যেও অসাধারণ সুখ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ গ্রন্থে তাঁর চিন্তাশীল ও ভাবুক মনের পরিচয় পাওয়া যায়। সমকালীন রাজনীতি তাঁর চিন্তা শীল ও ভাবুক মনকে চিরদিনই কমবেশী উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর চিন্তা চেতনার সম্মিলন ঘটেছে তাঁর 'আত্মশক্তি' প্রবন্ধ গ্রন্থে ।
'আত্মশক্তি' প্রবন্ধ গ্রন্থের অন্যতম একটি প্রবন্ধ 'স্বদেশী সমাজ'। এ প্রবন্ধে লেখক আমাদের সমাজব্যবস্থার ঐতিহ্য ও দেশের সব ধরনের হিতকর্মের ক্ষেত্রে স্বদেশী সমাজের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। লেখক বলেছেন, পূর্বে আমাদের একটা সমাজব্যবস্থা ছিলো।
এ সমাজব্যবস্থা নিজেদের অভাব নিজেরা অতি সহজে পূরণ করতো। দেশে যুদ্ধবিগ্রহ, রাজ্যরক্ষা এবং বিচারকার্য রাজা করেছে, কিন্তু বিদ্যাদান থেকে জলদান সবকিছু সমাজ অতি চমৎকারভাবে পূরণ করেছে।
রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলেও দেবালয় ও অতিথিশালা স্থাপন, পুকুর, টোলে শাস্ত্র অধ্যাপনা কখনো বন্ধ হয় নি। কিন্তু ইংরেজরা এদেশে আসায় জলের অভাব দেখা দিয়েছে।
তবে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো এর কারণ, আজ আমাদের সেই আগের সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে আমাদের এ দশা। মানুষের চিত্তপ্রবাহ নদীর ফ - স্রোতের মতই বিরাজমান।
যে নদী গ্রামের পাশ দিয়ে চলছিলো সে যদি গ্রাম ছেড়ে অন্যদিক দিয়ে প্রবাহিত হয়, তবে গ্রামের জল-ফল-স্বাস্থ্য-বাণিজ্য সবই নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের চিত্তস্রোত চিরদিন গ্রাম বাংলাকে ঘিরেই চলছিলো, তাই পলি বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্য এত জীবন্ত ছিলো।
কিন্তু এখন আমাদের মা চিত্তপ্রবাহ গ্রাম ছেড়ে অন্য দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তার দেবালয় জীর্ণ প্রায়, সংস্কার করে দেবার কেউ নেই, তার জলাশয়গুলো দূষিত, পরিষ্কার করার কেউ নেই। এখন জলদান, স্বাস্থ্য দান, বিদ্যাদান সবকিছুই করে থাকে সরকার প্রধান।
লেখক বলেছেন-
“আজ আমাদের দেশে জল নাই বলিয়া যে আমরা আক্ষেপ করিতেছি, সেটা সামান্য কথা। সকলের চেয়ে গুরুত্বও শোকের বিষয় হইয়াছে, তাহার মূল কারণটা। আজ সমাজের মনটা সমাজের মধ্যে নাই । আমাদের সমস্ত মনোযোগ বাহিরের দিকে গিয়াছে।”
অবশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমকালীন সমাজ ব্যবস্থার কথা অতি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। পল্লি গ্রামগুলো যখন প্রচলিত সমাজব্যবস্থা অনুসারে পরিচালিত হতো তখন গ্রামগুলোতে সুখ শান্তি বিরাজ করতো। এখন মানুষের চিত্তপ্রবাহ ভিন্নখাতে প্রবাহিত হচ্ছে বলে সকল সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
.png)