সর্বজয়ার বুকে ধড়াস করিয়া যেনো ঢেঁকির পাড় পড়িল।”- কেন?

 

সর্বজয়ার বুকে ধড়াস করিয়া যেনো ঢেঁকির পাড় পড়িল।”- কেন?

উত্তর : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "পথের পাঁচালী"র 'বল্লালী বালাই' অংশের চতুর্থ পরিচ্ছেদ থেকে গৃহীত হয়েছে। অনেক দিন পরে শ্বশুর বাড়িতে এসে হরিহর সর্বজয়াকে নিজগ্রাম নিশ্চিন্দিপুর নিয়ে যাওয়ার কথা বললে- সর্বজয়ার যে অনুভূতি হয় তা এখানে ব্যক্ত হয়েছে।

হরিহর এবং সর্বজয়ার বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সে। তারপর প্রায় দশবছর তাদের আগে দেখা হয়নি। পশ্চিম থেকে আসার পরে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের সকলের পরামর্শে হরিহর শ্বশুরবাড়িতে সর্বজয়াকে আনতে যায়। দুপুরের পর শ্বশুরবাড়ির ঘাটে নৌকা পৌঁছায়। 

বিয়ের পর একবার মাত্র সে এখানে এসেছিল- পথঘাট আর তার মনে নেই; লোককে জিজ্ঞাসা করে সে শ্বশুরবাড়ির সম্মুখে উপস্থিত হলো। 

তার ডাকাডাকিতে একটি গৌরাঙ্গী ছিপছিপে চেহারার তরুণ- কে ডাকছে দেখার জন্য বাইরে আসে- হরিহরের চোখে চোখ পড়াতে সে আবার অন্দরমহলে চলে যায়। হরিহরি ভাবলো- তার বউ নয়তো? রাত্রিবেলা। সর্বজয়া একখানা লালপাড় মটকা শাড়ি পরে ঘরে ঢোকে। 

দশ বছর সেই বালিকাবধূর সেই আগের অবস্থার সাথে বর্তমান অবস্থার কোনোকিছুই হরিহর মেলাতে পারেনা। ধীরে ধীরে তারা জড়তা ভেঙে বিভিন্ন কথায় মশগুল হয়ে পড়ে। স্ত্রীর কথাবার্তা। অজ পাড়াগাঁয়ের টান ও ভঙ্গিটুকু হরিহরের নতুন ও ভারি মিষ্ট বলে মনে হলো। 

পরে সে লক্ষ করে দেখে স্ত্রীর হাতে কেবল গাছকয়েক কড় ও কাঁচের চুড়ি ছাড়া কোনো গহনা নেই। গরিব ঘরের মেয়ে, দেয়ার কেউ নেই- এতদিন খবর না নেওয়াকে হরিহরের কাছে খুব অন্যায় বলে মনে হয়। সর্বজয়াও বারবার চেয়ে চেয়ে স্বামীকে দেখছিল। 

বাপমায়ের কথাবার্তায় সর্বজয়া বুঝেছে জামাই পশ্চিম থেকে এসেছে- সাথে বেশ টাকা-পয়সাও এনেছে। সকলেই বলতো তার স্বামী সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছে সে আর ফিরবে না। এটা ভেবে সর্বজয়া কত রাত্রি দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছে-পূজাপার্বণে ঠিকমতো মনোনিবেশ করতে পারেনি। 

সকলেই সর্বজয়াকে সহানুভূতি দেখাতো তাতে সর্বজয়ার কষ্ট আরো বেড়ে যেতো। মাঝেমধ্যে সর্বজয়া ভাবতো যদি সত্যিই সে ফিরে না আসে- বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। এতদিন পর তার সে দুরাশার শেষ হলো। 

নানা কেজো-অকেজো কথায় রাত বাড়তে থাকে। কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার তার মনের মধ্যে উকি দিতে থাকে- তার স্বামী হরিহর তাকে এবার সাথে নিয়ে যাবে তো? নাকি আবার দেখে কাশি- গয়ায় চলে যাবে। 

মনের কথা সে মুখ ফুটে হরিহরের কাছে জিজ্ঞাসা করতে পারেনা- শেষ পর্যন্ত মন বিদ্রোহ করে না সে আর এ কথা জানতে চাইবে না। হরিহর সমস্যার সমাধান নিজেই। করলো- 'কাল চল তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাই নিশ্চিন্দিপুরে?' একথা শোনার পরই সর্বজয়ার বুকে যেন ধড়াস করে ঢেঁকির পাড় পড়ে।

আসলে সর্বজয়া এতক্ষণে মনের মধ্যে যে প্রশ্নের সাথে যুদ্ধ করছিল- সেই প্রশ্নের আকস্মিক সমাধান হওয়ায় সে আশ্চর্য হয়ে যায় আর সর্বজয়ার এই অনুভূতিকে লেখকে ঢেঁকির পাড় দেওয়া শব্দের সাথে তুলনা করে- তার মনের অবস্থা বোঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন।


Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ