সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় ইউরোপীয় বণিকদের কর্মতৎপরতা বিশ্লেষণ কর
![]() |
| সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় ইউরোপীয় বণিকদের কর্মতৎপরতা বিশ্লেষণ কর |
সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় ইউরোপীয় বণিকদের কর্মতৎপরতা বিশ্লেষণ কর
উত্তর : ভূমিকা : প্রাচীনকালে ভারতবর্ষ ছিল ধনসম্পদে পরিপূর্ণ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ছিল এই ভারতবর্ষ। এখানকার সৌন্দর্য এবং অর্থসম্পদের প্রাচুর্য স্বাভাবিকভাবে সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
ইউরোপীয়রা পৃথিবীকে আবিষ্কারের নেশায় এবং নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটতে থাকে। বহু আগে আরব-তুর্কি-আফগানরা ভারতে এসেছে। সম্পদের খোঁজ পেয়ে সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয় বিভিন্ন জাতি ভারতে আসা শুরু করে।
প্রথম দিকে তারা শুধুমাত্র ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দিলেও পরবর্তীতে তারা এখানকার রাজনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে এবং এক সময়ে তারা ভারতবর্ষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
→ ইউরোপীয়দের তৎপরতা : নিয়ে সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় ইউরোপীয় বণিকদের কর্মতৎপরতাসমূহ আলোচনা করা হলো :
১. অজানাকে জানার আগ্রহ : ইউরোপে রেনেসাঁর সূত্রপাত তারা আবিষ্কারের নেশায় সমগ্র পৃথিবীতে ছুটতে শুরু করে। তাছাড়া ভারতবর্ষে আসার চেষ্টা করতে থাকে।
এরই ফলশ্রুতিতে পর্তুগিজ নাবিক কলম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করেন। তাদের এই অজানাকে জানার আগ্রহই একদিন ভারতবর্ষে নিয়ে আসে।
২. নতুন জলপথ আবিষ্কার : অতি প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষ ছিল সম্পদে পরিপূর্ণ। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আরবীয় বণিকরা জলপথে ও স্থলপথে ভারতবর্ষে আসতো।
আর ব্যবসায় একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠায় একসময় আরবীয়রা ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিলে ইউরোপীয়রা বেকায়দায় পড়ে এবং বিকল্প পথে ভারতে আসার প্রচেষ্টা চালায়। ১৪৯৮ সালে তারা কালিকট বন্দরে আসতে সক্ষম হয়।
৩. পর্তুগিজদের আগমন : ১৪৯৮ সালে ভাস্কো-ডা-গামা কর্তৃক উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে সমুদ্র পথে ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার হলে প্রথমে পর্তুগিজরা ভারতে আসে।
পরে পড্রো আল-ভারেজ আরবীয় বণিকদের পরাজিত করে এদেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর তারা ব্যাপকভাবে ভারতে আসতে শুরু করে।
৪. ভারতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা : পর্তুগিজরা ছিল খুবই উচ্চবিলাসী। তারা ভারতে প্রথমে কোচিল ও কাননের বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। পরে ফ্রান্সিসকো আলমিডা ভারতের পর্তুগিজ প্রতিনিধি হন।
এরপর আল ফানসো আল বুকার্ন ভারতে পর্তুগিজদের ক্ষমতা সুদৃঢ় করেন। তিনি কোচিল ও কানান ছাড়াও বিজাপুর সুলতানের নিকট হতে গোয়া দখল করে প্রাচ্যে পর্তুগিজ ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
৫. পর্তুগিজদের অত্যাচার : পর্তুগিজরা হিংস্র প্রকৃতির ছিল। তারা ভারত মহাসাগরে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে। তারা ব্যবসার পাশাপাশি চুরি, ডাকাতি, জলদস্যুর মাধ্যমে ভারতীয় ও অন্যান্যদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। এটাই ছিল ভারতে পর্তুগিজদের অন্যতম ভুল।
৬. পর্তুগিজদের পতন : ধীরে ধীরে পর্তুগিজরা ভারতে এককভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠে। তারা দিউ, দমন, সলসেট, বেসিন, চৌল, মুম্বাই, সিংহল, হুগলি এবং বাংলা প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে প্রায় একশ বছর বণিজ্য করেন।
কিন্তু ধীরে ধীরে তারা এখানে সাধারণ জনগণের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত হয়। যা তাদের পতন ডেকে আনে।
৭. ধর্মীয় হস্তক্ষেপ নিন দিন : পর্তুগিজরা প্রভাবশালী হয়ে উঠলে তারা অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তারা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত কর বসাতো।
এছাড়া স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম বালক-বালিকাদের ধরে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে নিক্ষিত করতো। যা এদেশের মানুষের ভিতর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফলে দেশীয় বণিকরা তাদের হুগলি থেকে বিতাড়িত করেন।
৮. কর্মচারীদের দুর্নীতি : পর্তুগিজ ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা ছিল খুবই দুর্নীতিপ্রকা। তারা এদেশে তাদের অত্যাচার ও দুর্নীতির মাত্রা ব্যাপকভাবে বাড়ালে স্থানীয় জনগণের রোষানলে পড়ে। তাছাড়া পর্তুগিজ-স্পেন একত্র হলে ধীরে ধীরে পর্তুগিজদের পতন ঘটে।
৯. ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজদের আগমন : ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে পর্তুগিজদের অনুকরণে অন্যান্য ইউরোপীয় বণিক তথা ওলন্দাজ, ফরাসি এবং ইংরেজরা ভারতে আগমন করেন।
পর্তুগিজরা এদের সাথে ব্যবসার প্রতিযোগিতায় পড়ে। ফলে দমন ও দিউ ছাড়া সমস্ত বন্দরই তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। একপর্যায়ে তারা ভারত ত্যাগে বাধ্য হয়।
১০. ওলন্দাজদের আগমন : পর্তুগিজদের পরই হল্যান্ডের অধিবাসীরা অর্থাৎ ওলন্দাজরা ভারতে আসা শুরু করে। ফলে পর্তুগিজদের সাথে এরা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।
১৬০৫ সালে এরা কাশিমবাজার, বিহার, উড়িষ্যা, সুরিকট প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। তবে শেষের দিকে স্পেনীয়দের সাথে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে তাদের পতন ঘটে।
১১. দিনেমারদের আগমন : ওলন্দাজদের পতনের পর ডেনমার্কের আধিবাসী তথা ডেনিমা বা দিনেমাররা ভারতে আগমন করেন। তারা ১৬১৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে।
১৬২০ সালে তারা দক্ষিণ ভারতের ভাঙ্গোরে এবং ১৬৭৬ সালে শ্রীরামপুরে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। কিন্তু ব্যবসার সুবিধা করতে না পেরে ইংরেজদের নিকট কুঠি বিক্রি করে চলে যায়।
১২. ইংরেজদের আগমন : ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রায় শেষের দিকে ইংরেজরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারতে আসে। একে একে তারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য ইউরোপীয়দের এদেশ থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়।
তাছাড়া ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে ব্রিটিশ রানির সুপারিশ এবং মুঘল শাসকদের সহায়তায় তারা অবাধে বাণিজ্য শুরু করেন।
ধীরে ধীরে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেন। অবশেষে ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে জয়ের মধ্য দিয়ে তারা ভারতবর্ষে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ইউরোপীয়রা মূলত ভারতবর্ষে এসেছিল বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। তারা এখানে এসে এদেশের ধন-সম্পদ দেখে অভিভূত হয়ে পড়ে।
ফলে উচ্চাভিলাসী চিন্তা নিয়ে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে। ফলে তারা একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
সর্বশেষে ইংরেজরা ভারতবর্ষে টিকে থাকে। তারা অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিকে পরাজিত এবং ভারতবর্ষ হতে বিতাড়িত করে। তারা এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠে যে নবাবের সিদ্ধান্তেও কর্ণপাত করতো না।
ফলে তারা কৌশলে এদেশ হতে মুঘল শাসনের অর্থাৎ নবাবী মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে এদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তগত করে। এভাবে এদেশকে ভারা পদানত করতে সক্ষম হয়। শুরু হয় উপমহাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্যের দিন।
