ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর
![]() |
| ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর |
ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর
- অথবা, উত্তর আফ্রিকা ও মিশরে ফাতেমীয় শাসন সুদৃঢ়করণে আল-মুইজের কৃতিত্ব নিরূপণ কর ।
- অথবা, খলিফা আল মুইজের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর ।
- অথবা, খলিফা আল মুইজের অবদানসমূহ তুলে ধর।
উত্তর : ভূমিকা : ইসলামের ইতিহাস পঠন-পাঠনে যে সকল খলিফার নাম বিশেষ গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হয় তার মধ্যে ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজ অন্যতম।
ফাতেমীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা ওবায়দুল্লাহ আল মাহদী হলেও, রাজ্যবিস্তার, শাসনব্যবস্থার সুদৃঢ়করণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতাসহ সর্বোপরি ফাতেমীয় শক্তি দৃঢ়করণে আল মুইজের ভূমিকা ও আগমন আশির্বাদস্বরূপ।
আর তাই অনেক ঐতিহাসিক আল মুইজকে ফাতেমীয় বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা বলেছেন। ফাতেমীয় খিলাফতে তিনি যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উদার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, সে জন্য তাকে পাশ্চাত্যের মামুনও বলা হয়। উত্তর আফ্রিকা ও মিশরের ফাতেমীয় শাসন সুদৃঢ়করণে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য ।
→ আল মুইজের পরিচয় ও সিংহাসন আরোহণ : খলিফা আল মুইজ ছিলেন ফাতেমীয় খিলাফতের চতুর্থ খলিফা। তিনি ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর মাহদীয়া নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর মিশরের কায়রো নগরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
তার পিত ছিলেন ফাতেমীয় খরিফা আল মনসুর। খলিফা আল মুইজ ১৫৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মার্চ পিতার মৃত্যুর পর 'আবু তামিম মা'আদ আল মুইজ লি-বীন-ইল্লাহ” উপাধি নিয়ে ফাতেমীয় সিংহাসনে বসেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শাসন ক্ষমতায় থেকে কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
→ আল মুইজের কার্যাবলি : তিনি ছিলেন মিশরের সর্বশ্রেষ্ঠ ফাতেমীয় খলিফা। তার কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১. কায়রো নগরী প্রতিষ্ঠা : খলিফা আল মুইজের সেনাপতি জওহর আল সিকিল্লি হেলিওপোজিলের রাস্তার ধারে বালুকাময় প্রান্তরে ১২০০ গজ দীর্ঘ একটি বর্গক্ষেত্রে নতুন | নগরীর ভিত্তি স্থাপন করা। এটাই ছিল কায়রো নগরী।
২. আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় : আল মুইজ এর প্রাসাদের দক্ষিণে হযরত ফাতেমা (রা.) এর স্মৃতির স্মরণে যে মসজিদ নির্মাণ | করা হয়েছিল তার বর্তমান নাম হলো আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।
৩. মিশরে খাদ্য সরবরাহ : তৎকালীন সময়ে প্রধান সেনাপতি | জওহর ছিলেন বিরাট বিজ্ঞ ও প্রজাবান্ধব শাসক। তখন মিশরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং এ সময় মিশরের এ দুরাবস্থার কথা জানিয়ে খাদ্যশস্যের জন্য ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। এ সময় আল মুইজ জাহাজ ভর্তি খাদ্য মিশরে প্রেরণ করেন এবং তা সুষ্ঠুভাবে বিতরণের ব্যবস্থা করেন।
৪. শাসনব্যবস্থার সংস্কার : জওহর আল সিকিল্লি ছিলেন | খলিফার প্রধান সেনাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক। তিনি শাসনব্যবস্থার সংস্কার করে এটিকে ৬টি বিভাগে বিভক্ত করেন। নিয়ে আল মুইজের শাসনব্যবস্থার সংস্কার আলোচনা করা হলো :
(ক) সাহি কালামুল জামিন : সরকারি কাগজপত্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র খলিফার কাছে পেশ করা এ বিভাগের কাজ ছিল।
(খ) সাহিবু কালামুল দাফিক : সৈন্য বিভাগের কার্যাবলি, বৈদেশিক বিষয়াদি এবং বিচার বিভাগীয় কার্যাবলি এ বিভাগের অন্যতম কাজ।
(গ) দায়ী-আল-দায়ত : মসজিদ ও মাদ্রাসার মাধ্যমে ফাতেমীয় মতবাদ প্রচারণা এ বিভাগের কাজ ছিল। বাজার পরিদর্শনও এ বিভাগের কাজ ছিল।
(খ) জায়েব সাহেব আল বার : এ বিভাগের বিভিন্ন কার্যাবলীর মধ্যে প্রধান কার্যাবলি ছিল রাজকীয় মেহমানদের দেখাশুনা করা।
(ঙ) আফসার খারাজ : এ বিভাগের অন্যতম কাজ ছিল খারাজ আদায় করা।
(চ) কারারুল হুজরা : সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাহতা সুষ্ঠুভাবে দেওয়ার জন্য কারারুল হুজরা বিভাগ খোলা হয়। বেতন প্রদান করা ছিল এ বিভাগের প্রধান দায়িত্ব।
৫. পুলিশ বাহিনী গঠন : খলিফা আল মুইজের সময়ে জনগণের জানমালের হেফাজত এবং ব্যবসায় বাণিজ্য নিরাপত্তা ও পরিব্রাজকদের শঙ্কাহীনচিত্তে দূর সফরে যাওয়ার জন্য পুলিশ বাহিনীর তৎপরতা ছিল প্রশংসনীয়।
৬. বিচার বিভাগ সংস্কার : ফাতেমীয় দাঈ বা প্রচারক দলই আইন ও বিচার দেখাশুনা করতো। বিচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন কাজী নোমান। নোমানের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ছিল 'মাজালিস' নামে ৮০০ বক্তৃতা ৮ খণ্ডে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা।
এছাড়া পুলিশ ও বিচার বিভাগের সমন্বয়সাধান জনগণের নৈতিক চরিত্রের নিয়ন্ত্রণ, পবিত্রতা, রাজারে ওজন ও পরিমাপ দেখা ইত্যাদি দেখার দায়িত্বে ছিল "মুহতাসিবের” ওপর।
এছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শ্রবণ ও বিচারের জন্য "Court of the Mozalim" নামে আদালত ছিল। খলিফা স্বয়ং এ আদালতে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
৭. সেনাবাহিনীর সংস্কার : খলিফা আল মুইজ সেনাবাহিনীর সংস্কারসহ এদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তার শাসন আমলে বিভিন্ন বন্দরসমূহ উন্নত ঘাঁটিতে পরিণত হয় ।
৮. রাজস্ব সংস্কার : আল মুইজের নির্দেশে ইবনে কিল্লিস রাজস্ব বিভাগের সংস্কার সাধন করে এবং তখন প্রচলিত প্রাচীন প্রথাকে বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করেন।
৯. রাজ্যবিজয় : বিশাল ফাতেমীয় সাম্রাজ্য গঠন করতে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলা দমন করে মুইজ ৯৫৫ সালে মরক্কো, ১৯৬৬ সালে সিসিলি, ৯৬৯ সালে মিশর বিজয় করেন।
১০. জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক : খলিফা আল মুইজ জ্ঞান- বিজ্ঞানের একজন উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি নিজে একজন পণ্ডিত ছিলেন এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মনীষীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক আমির আলী বলেন, “তিনি নিঃসন্দেহে মুসলিম পাশ্চাত্যের মামুন ছিলেন এবং তার শাসনকালে উত্তর আফ্রিকা সভ্যতা ও সমৃদ্ধির উচ্চাসনে আরোহণ করে।
তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জ্ঞানী ও গুণীদের সমাদর করতেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইয়াকুব-বিন-কিল্লিস।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বিচার ও পর্যবেক্ষণ করে আল মুইজকে ফাতেমীয় খিলাফতের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে অভিহিত করা যায়।
কেননা, তার সময়ে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর মোকাবিলার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্য বিজয় হয় । এমনকি প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
তিনি নতজানু পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তে বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। আর তাই ইতিহাসে ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
