ফাতেমীয় শ্রেষ্ঠ খলিফা কে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর
![]() |
| ফাতেমীয় শ্রেষ্ঠ খলিফা কে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর |
ফাতেমীয় শ্রেষ্ঠ খলিফা কে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর
- অথবা, ফাতেমীয় বংশের শ্রেষ্ঠ খলিফা কে তোমার উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন কর।
উত্তর : ভূমিকা : ইসলামের ইতিহাস পঠন-পাঠনে যে সকল বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ সহকারে আলোচনা করা হয় তার মধ্যে ফাতেমীয় খলিফা আল মুইজের শাসনামল অন্যতম ইহা এমন একটি রাজনৈতিক প্রত্যয় যা বিশ্বজনীন এক ঘটনা।
রাজ্যবিস্তার, শাসনব্যবস্থার সুদৃঢ়করণ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতাসহ সর্বোপরি ফাতেমীয় শক্তি দৃঢ়করণে আল মুইজের ভূমিকা এবং আগমন আশিবাদস্বরূপ।
আর তাই ঐতিহাসিক লেনপুল বলেন, With the fourth califa, Almuiz, the fatimids endered upon a new phase." আল মুইজ ফাতেমীয় বংশের সাহসী, সুযোগ্য ও শ্রেষ্ঠ খলিফা ছিলেন।
→ আল মুইজের কৃতিত্ব : খলিফা আল মুইজের শ্রেষ্ঠ খলিফা হওয়ার কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠে যখন তার কার্যাবলি ও কৃতিত্ব আলোচনা করা হয়। নিম্নে তার কার্যাবলি ও কৃতিত্ব বর্ণনা করা হলো :
১. সেনাবাহিনী গঠন : আল হাসান জওহার বিন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে খলিফা আল মুইজ একটি সুদক্ষ ও সুশৃঙ্খলা সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং কতিপয় দুর্গ পুনঃসংস্কার করেন। শক্তি বৃদ্ধির জন্য তিনি নৌবহরে নতুন যুদ্ধ জাহাজ সংযোজিত করেন।
২. স্পেনের বিরুদ্ধে অভিযান : আন্দালুসী জাহাজ আল মুইজের একটি যুদ্ধবাহী জাহাজ দখল করে নেয়। এ অপমানে ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতিনিধি হাসান বিন আলীকে স্পেনের দিকে প্রেরণ করেন এবং তিনি আর্মেনীয় উপকূলে লুণ্ঠন করেন।
৩. বার্বার বিদ্রোহ দমন : সেনাপতি জওহর আল সিকিল্পিকে মরক্কোর বার্নারদের বিদ্রোহ দমনের জন্য প্রেরণ করা হয়। তিনি সেখানে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে বার্বারদের প্রতিহত করে নিরঙ্কুশভাবে বিজয় লাভ করেন।
৫. সিসিপি বিজয় : আল মুইজের ফাতেমীয় প্রতিনিধি দল বিভিন্ন অঞ্চলগুলোতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য অভিযান প্রেরণ করেন।
বাইজান্টাইন স্থল বাহিনী ফাতেমীয় বাহিনীর মুখোমুখি পড়ে শোচনীয়ভাবে পরাজয়বরণ করেন। পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৬২ খ্রিস্টাব্দের দিকে সমগ্র সিসিলি দ্বীপ মুসলমানদের শাসনাধীন চলে আসে।
৬. ত্রিপোলী ও বার্কায় অভিযান : ৯৭২ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর | মাসে কায়রোয়ান ত্যাগ করে মুইজ কায়রোয়, ত্রিপলী ও বার্কা অভিযান করেন।
৭. মিশর বিজয় : তৎকালীন সময়ে মিশরে ভয়ানক গোলযোগ দেখা দেয় এবং সেখানে অনিয়মিত বন্যার ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
তাই সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং মিশর জয়ের উদ্দেশ্যে আল মুইজ সেনাপতি জওহরের নেতৃত্বে এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন।
ইয়াকুব বিন কিক্সিসের সহায়তায় জওহর আল সিকিল্লি প্রথমে আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ ও দখল করেন। অতঃপর মিশরীয় বাহিনীকে পরাজিত | করে মিশর জয় করতে সক্ষম হয়।
৮. কারমাতিয়ানদের দমন : কারমাতিয়ানরা দামে দখল করলে তাদের সাথে জওহরের ব্যাপক সংঘর্ষ বাঁধে। কারমাতীয় নেতা দামেস্ক দখল করে বিজয় উৎসব পালন করেন এবং রামালায় উপনীত হয়।
পরবর্তীতে সে সরাসরি মিশর দখলের প্রস্তুতি নেয়। এ সংবাদ পেয়ে মুইজ তার সেনাপতি জওহরের শক্তি বৃদ্ধির জন্য তার নিকট সাহায্য প্রেরণ করলেন।
এ সাহায্য পেয়ে জওহর কারমাডীয় নেতা হাসানের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। এবং কায়রোর বহির্দেশে তাকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন।
৯. কারমাতিয়ানদের পুনরায় আক্রমণ : অওহরের হাতে পরাজয় সত্ত্বেও কারমাতিয়ানদের দাম্ভিকতা কমেনি। তারা পুনরায় মিশর আক্রমণে অগ্রসর হলে আল মুইজ তাদেরকে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে বিধ্বস্ত করেন।
১০. মুইজের মিশর যাত্রা : ৯৭৩ হিজরীতে মুইজ কায়রোতে প্রবেশ করেন এবং সেখান রমজান মাসে একটি সোনার তখতে বসে মিশর, সিরিয়া ও হিজাজের সমবেত প্রতিনিধিদের নিকট থেকে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন।
১১. প্রশাসনিক সংস্কার : খলিফা আল মুইজ শাসক হিসাবে প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেন যা ছিল নিরপেক্ষ, ন্যায়বিচারের প্রতীক ও সুদৃঢ়।
উল্লেখ্য যে তিনি জাতি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মিশরীয় ইহুদি, খ্রিস্টান, গ্রিক সকলকেই যোগ্যতা অনুসারে রাজকার্যে নিয়োজিত করতেন।
১২. ভূমি ও রাজস্ব সংস্কার : পূর্বে থেকে রাজ্যে খাজনা ইজারা দেওয়া হতো। মুইজ অবিলম্বে তহশিলদার ও ইজারাদারদের বিনষ্ট করে অবৈধ উপার্জন বন্ধ করে রাজস্ব বিভাগ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেয় এবং নতুন রাজস্ব আয় অনেকগুণ বেড়ে যায় ।
১৩. সেনাবাহিনীর সংস্কার : আল মুইজ সেনাবাহিনীরও সংস্কার সাধন করেন। তিনি সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আল মাহদীয়া, আলেকজান্দ্রিয়া ও সিরিয়ার বন্দরসমূহ উন্নত ঘাঁটিতে পরিণত।
উপসংহার : উপযুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি, ফাতেমীয় খলিফাদের মধ্যে আল মুইজ সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা ছিলেন।
তিনি একাধারে সুদক্ষ ও প্রজাবৎসল শাসক পণ্ডিত, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ও সুনিপুণ যোদ্ধা। বিভিন্ন দিক হতে বিচার করলে আল মুইজের রাজত্বকালকে মিশরীয় ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়।
তার প্রচেষ্টায় মিশরে ফাতেমীয় খিলাফতের শাসন কায়েম হয়। আর তাই ফাতেমীয় বংশের সেই খলিফা হিসেবে তার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
