মুইন-উস-সুলতানের সাথে কাওকাবের বিবাহের ঘটনা বর্ণনা কর
মুইন-উস-সুলতানের সাথে কাওকাবের বিবাহের ঘটনা বর্ণনা কর।
![]() |
| মুইন-উস-সুলতানের সাথে কাওকাবের বিবাহের ঘটনা বর্ণনা কর। |
উত্তর : এ সংসারকে যখন ওমর খৈয়াম দাবাখেলার ছকের সঙ্গে তুলনা করেছেন তখন নসরউল্লা এবং মুইন-উস- সুলতানের মতো দুই খুঁটিকে ঘায়েল করা আমানউল্লার মতো নগণ্য ছেলের পক্ষে অসম্ভব নাও হতে পারে।
তাঁর পক্ষেই বা রাজা হওয়া অসম্ভব হবে কেন? এমন সময় কাবুলের সেরা খানদানী বংশের মুহম্মদ তর্জী সিরিয়া নির্বাসন থেকে দেশে ফিরলেন। সঙ্গে পরীর মতো তিন কন্যা, কাওকাব, সুরাইয়া আর বিবি খুর্দ । এরা দেশবিদেশ দেখেছেন, লেখাপড়া জানেন, রূজ-পাউডার ব্যবহারে ওয়াকিবহাল।
এদের উদয়ে কাবুল কুমারীদের চেহারার অত্যন্ত ম্লান, বেজৌলুস, ‘অমার্জিত' বা আনকালচারড' মনে হতে লাগল । বিরাট ভোজের বন্দোবস্ত করলেন।
অন্তরঙ্গ আত্মীয়স্বজনকে পই পই করে বুঝিয়ে দিলেন, যে করেই হোক মুইন-উস- আমানউল্লার মা-যদিও আসলে দ্বিতীয়া মহিষী, কিন্তু মুইন-উস-সুলতানের মাতার মৃত্যুতে প্রধান মহিষী হয়েছেন এক সুলতানকে তজীর বড় মেয়ে কাওকাবের দিকে আকৃষ্ট করাতেই হবে। বিপুল রাজপ্রাসাদের আনচেকানাচে দু'একটা কামরা বিশেষ করে খালি রাখা হলো। সেখানে কেউ যেন হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত না হয় ।
খানাপিনা চলল, গানবাজনায় রাজবাড়ি সরগরম। রানি-মা নিজে মুইন-উস-সুলতানকে কাওকাবের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন আর কাওকাবকে ফিস ফিস করে কানে কানে বললেন, 'ইনিই যুবরাজ, আফগানিস্তানের তখৎ একদিন এরই হবে।
কাওকাব বুদ্ধিমতী মেয়ে, ক'সের গমে ক'সের ময়দা হয় জানতেন। প্ল্যানটা ঠিক উতরে গেল। বিশাল রাজপ্রাসাদে ঘুরতে ঘুরতে মুইন-উস-সুলতানে কাওকাবের সঙ্গে পুরীর এক নিভৃত কক্ষে খোশগল্পে মশগুল হলেন।
রানি-মা জানতেন, শিকার জালে পড়েছে। প্ল্যানমাফিকই রানি-মা হঠাৎ যেন বেখেয়ালে সেই কামরায় ঢুকে পড়লেন। তরুণতরুণী একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়ালেন। রানি মা সোহাগ মেখে অমিয় ছেনে সতীনপোকে বললেন, 'বাচ্চা তোমার মা নেই, আমিই তোমার মা।
তোমার সুখদুঃখের কথা আমাকে বলবে না তো কাকে বলবে? তোমার বিয়ের ভার তো আমার কাঁধেই। কাওকাবকে যদি তোমার পছন্দ হয়ে থাকে তবে এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? তর্জীর মেয়ের কাছে দাঁড়াতে পারে এমন মেয়ে তো কাবুলে আর নেই।
তোমার দিল কি বলে?' মুইন তখন ফাটা বাঁশের মাঝখানে। দিল যা বলে বলুক। মুখে কি বলেছিলেন সে সম্বন্ধে কাবুল চারণরা পঞ্চমুখ। কেউ বলেন, নীরবতা দিয়ে সম্মতি দেখিয়েছিলেন; কেউ বলেন, মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ জানতেন, নসীরউল্লার মেয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে; কেউ বলেন, মিনমিন করে সম্মতি জানিয়েছিলেন, কারণ ঠিক তার এক লহমা আগে ভালোমন্দ না ভেবে কাওকাবকে প্রেম নিবেদন করে বসেছিলেন।
তিনি রামগঙ্গা ভালো করে কিছু প্রকাশ করার আগেই রানি-মা কামরা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। মোদ্দা কথা এ, সে অবস্থায় আমির হোক, ফকীর হোক, ঘুঘু হোক, কবুতর হোক, আর পাঁচজন গুরুজনদের সামনে পড়লে যা করে থাকে বা বলে থাকে মুইন-উস-সুলতান তাই করেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসট-বুক কি বলে না বলে সেটা অবান্তর, জীবনে কাজে লাগে বাজারের গাইড বুক। রানি-মা পর্দার আড়ালে থাকা সত্ত্বেও তামাম আফগানিস্তান তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পেত তখন মজলিশের হর্ষোল্লাস যে তাঁর গলার নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল তাতে আর কি সন্দেহ? রানি-মা বললেন, 'আজ বড় আনন্দের দিন।
ফজরের নামাজ পর্যন্ত আজকের উৎসব চলবে। আজ রাত্রেই আমি কন্যাপক্ষকে প্রস্তাব পাঠাচ্ছি। মজলিশের ঝাড়বাতি দ্বিগুণ আভায় জ্বলে উঠল। চতুর্দিকে আনন্দোচ্ছ্বাস, হর্ষধ্বনি। দাসদাসী ছুটলো বিয়ের তত্ত্বের তত্ত্বতাবাস করতে।
সব কিছু সেই দুপুর রাতে রাজবাড়িতেই পাওয়া গেল। তজী হাতে স্বর্গ পেলেন। কাওকাব হৃদয়ে স্বর্গ পেয়েছেন। বিপুল সমারোহের সাথে কাওকাব আর মুইন-উস-সুলতানের বিয়ে অনুষ্ঠিত হলো।
