লঘু নিবন্ধন হিসেবে ‘কমলাকান্ত' গ্রন্থের সার্থকতা নিরূপণ কর

লঘু নিবন্ধন হিসেবে ‘কমলাকান্ত' গ্রন্থের সার্থকতা নিরূপণ কর

লঘু নিবন্ধন হিসেবে ‘কমলাকান্ত' গ্রন্থের সার্থকতা নিরূপণ কর
লঘু নিবন্ধন হিসেবে ‘কমলাকান্ত' গ্রন্থের সার্থকতা নিরূপণ কর

উত্তর : চট্টোপাধ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র 'বঙ্গদর্শন' (১৮৭২) পত্রিকার মাধ্যমে পাঠক হৃদয়ে উপন্যাসের একটা রুচিকর ক্ষুধা জাগিয়েছিলেন। কিন্তু উপন্যাস এবং গুরুগম্ভীর রচনা দিয়ে পাঠককে নিরন্তর তৃপ্ত রাখা দুরূহ। তাই পাঠকপ্রিয়তার বিষয়টিকে মাথায় রেখেই বঙ্কিমচন্দ্র ঝুঁকেছিলেন লঘু রচনার দিকে। 

পাঠক সন্তুষ্টির জন্যই তিনি লঘু ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় রচনা করেন 'কমলাকান্তের দপ্তর'। 'লোকরহস্য' দিয়ে তাঁর এ শ্রেণির রচনার যাত্রা শুরু। এখানে মানুষ, সমাজ, পরিবার, রাজনীত, অর্থনীতি, ধর্মাচার ইত্যাদির অসংগতি এবং অন্তঃসারশূন্যতাকে ব্যঙ্গবিদ্রুপে বিদ্ধ করা হয়েছে। 

বিশেষকরে ‘কমলাকান্ত' গ্রন্থে গভীর কোনো তত্ত্বভাবনায় পাঠককে উজ্জীবিত করার প্রয়াস অনুপস্থিত। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাশ ‘কমলাকান্ত' গ্রন্থে বলেন :

“অর্দ্ধোন্মাদ নেশাখোর কমলাকান্তের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া তখন তাঁহার উপায় ছিল না; সোজাসুজি সজ্ঞানে যে সকল কথা বলিতে তিনি সংকোচবোধ করিতেন, কমলাকান্তের মুখ দিয়া সেই সকল কথা তিনি অসংকোচে বলিতে পারিতেন, এবং এই রহস্যময় পাগলকে কেন্দ্র করিয়া মাসের পর মাস পাঠক ভুলাইতে তাঁহাকে বেগ পাইতে হইত না।”

আর এই পাঠক ভুলানোর কাজটি বঙ্কিম করেছিলেন লঘু ভাষার মাধ্যমে। বিষয়ের বৈচিত্র্য, পরিকল্পনার অভিনবত্ব, জীবনভাবনার গভীরত্ব, সর্বোপরি প্রকাশভঙ্গির নতুনত্বে বঙ্কিমচন্দ্রের 'কমলাকান্ত' বাংলা সাহিত্যের অনন্য কীর্তি হিসেবে মর্যাদার যোগ্য। 

কত লঘু চালে কত গুরুতর বিষয় উপস্থাপন করা যেতে পারে 'কমলাকান্ত' তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উচ্চহাস্যের অন্তরালে নীরব বেদনার অশ্রুপাত ঘটে যায়,ব্যঙ্গবিদ্রুপের বাণ ছুড়ে বঙ্কিম নিজেই বেদনাবিদ্ধ হন। 

‘কমলাকান্ত কোন শ্রেণির রচনা তা নিয়ে সমালোচকগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। প্রবন্ধ, রম্য রচনা, রস রচনা, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ ইত্যাদি-একেক জনের এক এক রকম মন্তব্য। আবার অনেকে বলেছেন, ব্যক্তি কমলাকান্তের মতোই 'কমলাকান্ত' ছন্নছড়া ও শ্রেণিহারা। 

তবে 'কমলাকান্ত' যে একটি লঘু ভাষার নিবন্ধ এ বিষয়ে অধিকাংশ সমালোচকই একমত পোষণ করেছেন। 'মনুষ্য ফল' নিবন্ধে তিনি বলেন,

আফিমের একটু বেশী মাত্রা চড়াইলে, আমার বোধ হয়, মনুষ্যসকল ফলবিশেষ-মায়াবৃন্তে সংসার-বৃক্ষে ঝুলিয়া রহিয়াছে, পাকিলেই পড়িয়া যাইবে।

এ দেশের সিবিল সাব্বিসের সাহেবদিগকে আমি মনুষ্যজাতি মধ্যে আম্রফল মনে করি।

আমি বলি, রমণী মণ্ডলী এ সংসারের নারকেল ।

এখানে বঙ্কিমচন্দ্র চমৎকারভাবে ফলের সাথে মানব বৈশিষ্ট্যের তুলনা করেছেন। ফলের সাথে মানুষের সাদৃশ্য সন্ধান করার ক্ষমতা বঙ্কিমের মতো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লেখকেরই রয়েছে।

‘পতঙ্গ' নিবন্ধে বলেন, শুন, যদি জ্বলন্ত রূপে শরীর না ঢালিলাম, তবে এ শরীর কেন?

→ দেখ, পুড়িয়া মরিতে আমাদের রাইট আছে-আমাদের চিরকালের হক।

উপর্যুক্ত বাক্যগুলোতে কত গভীর কথাকে অতি হালকাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোতে একদিকে যেমন সমাজের অসংগতির চিত্র ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে তীক্ষ্ণ ভাষায় তাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। আর এ ব্যঙ্গের জন্য প্রয়োজন স্বাভাবিক বোধের বিলুপ্তি। 

তাই লেখক আফিমখোর কমলাকান্তকে দিয়ে এই ব্যঙ্গের কাজটি করেছেন। কমলাকান্তের ভাবনা, জীবন দর্শন, মনুষ্যপ্রীতি ও সৌন্দর্যপ্রেম, তার বেদনাবোধ সবই তার নিজস্ব। কমলাকান্তের সব চেতনাবোধের উৎস ও ভিত্তি বাংলাদেশের চিরকালীন সমাজ ও পরিবেশ। 

'কমলাকান্তের' ভাষা ব্যবহার ও শব্দ ব্যবহারেও বঙ্কিম অতি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ভারী শব্দ দিয়ে বর্ণিত বিষয়কে হালকাভাবে তুলে ধরা যায় না। তাই তিনি বেছে নিয়েছেন সহজসরল শব্দ। তাই ‘কমলাকান্ত’ হয়ে উঠেছে সার্থক লঘু নিবন্ধ ।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ