কমলাকান্তের দপ্তর প্রবন্ধের সমাজ ভাবনা মূলক রচনাগুলোর বর্ণনা দাও
কমলাকান্তের দপ্তর' প্রবন্ধের সমাজভাবনামূলক রচনাগুলোর বর্ণনা দাও।
উত্তর : সমাজভাবনামূলক রচনাগুলোর মধ্যে 'মনুষ্যফল'-এ মনুষ্য সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানুষকে তাদের চরিত্রের সদৃশ ফলের সঙ্গে তুলনা করে কৌতুক করা হয়েছে যেমন কমলাকান্তের চোখে সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষেরা কাঁঠাল, সিভিল সার্ভিসের লোকেরা আম, নারীরা নারকেল, দেশীয় লেখককুল তেঁতুল এবং দেশি হাকিমেরা কুষ্মাণ্ড ।
এখানে ব্যঙ্গ অপেক্ষা কৌতুকের মাত্রাই বেশি। ‘বড় বাজার’- এ দেখা যাচ্ছে আধুনিক ধনতান্ত্রিক সভ্যতায় সমাজ ও জীবনের সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবসায়িক বৃদ্ধি। সাহিত্য শিল্প জ্ঞানচর্চা যশ খ্যাতি সবকিছু বাজারের ক্রয়বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত। বড় বাজারে পণ্যসামগ্রীর মধ্যে বিদ্যমান বর্ণনায় পাশ্চাত্য-প্রাচ্য সংস্কৃতির সংঘর্ষ এবং উভয় দেশীয় বিদ্যার প্রতি কটাক্ষ লক্ষ্য করবার মতো। এ রচনার শেষে লঘু সুরটির উত্তরণ ঘটেছে গুরুগম্ভীর পর্যায়ে।
এ শ্রেণির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য রচনাটির নাম 'বিড়াল'। এতে বিড়ালকে শোষিত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। বিড়ালের জবানিতে সাম্যবাদের মৌলিক কথাগুলো উচ্চারিত । ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানা দারিদ্র্য এবং শোষণের মূল কারণ বিড়ালের তর্কে এ কথাই প্রমাণিত হয়েছে। বিড়াল বলে খাবার না পেলে ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ চোর হয়।
তার যুক্তি “চোর দোষী বটে, কিন্তু কৃপণ ধনী তদপেক্ষা শতগুণে দোষী।” নেশাগ্রস্ত কমলাকান্তের ভাবনায় পৃথিবীর সম্পদে সকলের সমানাধিকার এ তত্ত্ব উদিত হয়েছে; বিড়াল চুরি করে দুধ খেয়েছে; কমলাকান্ত ভাবে, দুধ আমার বাপেরও নয়।
দুধ মঙ্গলবার, দুহিয়াছে প্রসন্ন। অতএব সে দুধে আমারও যে অধিকার বিড়ালেরও তাই; সুতরাং রাগ করিতে পারব না। কিন্তু ধনতন্ত্রের প্রতীক কমলাকান্ত তবুও বিড়ালের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয় সামাজিক ধনবৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি শোনায়। বিড়াল বলে, “আমি যদি খাইতে না পাইলাম, তবে সমাজের উন্নতি লইয়া কী করিব?”
‘আমার দুর্গোৎসব' এবং ‘একটি গীত' রচনা দুটিতে কমলাকান্তের স্বদেশভাবনা দুঃখবোধের প্রলেপে মূর্ত হয়ে উঠেছে। ‘আমার দুর্গোৎসব'-এ 'আনন্দমঠ' (১৮৮২) উপন্যাসের পূর্বভাবনার আভাস পাই। এখানে দেশাত্মবোধের সুরটি ঘন করুণরসে মথিত। দেশমাতাকে প্রতিমার রূপকে দেখার মাধ্যমে হিন্দু জাতীয়তাবোধের প্রকাশের প্রয়াস আছে। ‘আমার মন’,, ‘বাঙালির মনুষ্যত্ব’, ‘পলিটিকস, ‘কাকাতুয়া’ প্রবন্ধেও স্বদেশ ভাবনা এসেছে কোনো কোনো প্রসঙ্গে ।
