নারীর রূপ বিষয়ে লেখকের উল্লেখযোগ্য মতামত সংক্ষেপে তুলে ধর
নারীর রূপ বিষয়ে লেখকের উল্লেখযোগ্য মতামত সংক্ষেপে তুলে ধর।
![]() |
| নারীর রূপ বিষয়ে লেখকের উল্লেখযোগ্য মতামত সংক্ষেপে তুলে ধর। |
নারীদেহের সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করেছেন স্বকীয় মনন ও চেতনাতাড়িত হয়ে। বঙ্কিমচন্দ্রের "কমলাকান্তের দপ্তর মাছের উত্তর : রবীন্দ্রনাথ নারী ভাবনা ও নারী সৌন্দর্যকে বিশিষ্ট মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। বঙ্কিম 'স্ত্রীলোকের রূপ' প্রবন্ধে নারী সৌন্দর্যের বিশিষ্ট বর্ণনা রয়েছে।
লেখক বলেন, যার সুন্দর কেশপাশ আছে, সে আর পরচুলা ব্যবহার করে না। যার উজ্জ্বল ভাল পাত আছে, তার কৃত্রিম দাঁতের প্রয়োজন হয় না। যার বর্ণে লোকের মন হরণ করে, তার আর রং মেখে লাবণ্য বৃদ্ধি করতে হয় না। যার নয়ন আছে, তার আর কাচের চোখের আশ্রয় নিতে হয় না। যার চরণ আছে, তাকে আর কাষ্ঠপদ অবলম্বন করতে হয় না। এরূপ যার যে বস্তু আছে, সে তার জন্য লালায়িত হয় না।
স্ত্রীজাতি অপেক্ষা যে পুরুষজাতির সৌন্দর্য অধিক, প্রকৃতির সৃষ্টি পদ্ধতি সমালোচনা করে দেখলে আরো স্পষ্ট হবে। যে বিস্তীর্ণ চন্দ্ৰকলাপ দেখে জলদমুকুট ইন্দ্রধনু হার মানে, সে চন্দ্রকলাপ ময়ূরের আছে; ময়ূরীর নেই। যে কেশরে সিংহের এত শোভা তা সিংহীর নেই।
রূপান্ধ স্ত্রীলোকের যৌবন কতক্ষণ থাকে? জোয়ারের জলের মতো আসতে আসতেই যায়। কুড়ি হতেই তারা বুড়ি হয়। অ পুরুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও বুদ্ধির নিকটে তাকে পরাজয় স্বীকার করতে হবে। সৌন্দর্যের বাহার যৌবনকালে। কিন্তু দিনের মধ্যেই তাদের অঙ্গ শিথিল হয়ে পড়ে। বয়স এসে শীঘ্রই তাদের গলার লাবণ্য মালা ছিড়ে নেয়। চল্লিশ পঁয়তাল্লিশে পুরুষের যে সৌন্দর্য থাকে, বিশ পঁচিশের ঊর্ধ্বে নারীদের তা থাকে না। নারীদেহের সৌন্দর্যকে লেখক বিদ্যুৎ চমকের মতো বা রংধনুর মতো বলে বর্ণনা করেছেন।
লেখক বলেছেন আমার জীবনে ঘোর দুঃখ এই যে, অন্ন ব্যঞ্জন পাতে দিতে দিতেই ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তেমনি স্ত্রীলোকের সৌন্দর্যরূপ বুকড়ি চালের ভাত, প্রণয় কলাপাতে ঢালতে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। শেষে বেশ ভূষারূপ তেঁতুল মেখে, একটু আদর লবণের ছিটা দিয়ে কোনরূপে খেতে হয় ।
এরূপ ক্ষণস্থায়ী বলেই কী তোমাদের রূপের এত আদর? ভালো করে দেখতে না দেখতে ভালো করে পুরুষেরা পিপাসিত চাতকের ন্যায় উন্মত্ত। অপরিজ্ঞাত হারাধন বলেই কী তোমরা তার প্রকৃত মূল্য নির্ণয়ে আশক্ত? কেবল ক্ষণস্থায়ী পদার্থ বলে নয়, অপর কারণেও স্ত্রীলোকের সৌন্দর্য মনোহর মূর্তি ধারণ করে। যেসব গ্রন্থকারদের মত ভূমণ্ডলে গ্রাহ্য হয়েছে তাঁরা সকলেই পুরুষ, এ কারণে আমার বিবেচনায় অনুরাগনেত্রে কামিনীকুলের রূপ বর্ণনা করেছেন। কথাই আছে, 'যার যাতে মজে মন, কিবা হাড়ি কিবা ডোম'। যে রমণিগণ প্রণয়ের পদার্থ, তাই পুরুষেরা নারীদের প্রণয়ের দৃষ্টি নিয়ে দেখে ।
“পাশ্চাত্য কবিরা তোমাকে অন্ধ বলেছেন। কথাটা মিথ্যা নয়। তোমার প্রভাবে লোকে প্রিয় বস্তুর দোষ দেখতে পায় না। তোমার অঞ্জনে যার নেত্র রঞ্জিত হয়েছে, সে বিশ্ববিমোহিনী পদার্থ পরস্পরায় পরিবৃত থাকে। বিকট মূৰ্ত্তিকে সে মনোহর দেখে। কর্কশ স্বরকে সে মধুময় ভাবে। প্রেতিনীর অঙ্গ ভঙ্গিকে মৃদুমন্দ মলয় মারুতে দোদুল্যমনা ললিতবঙ্গলতার লাবণ্যলীলা অপেক্ষাও সুখকরী জ্ঞান করে।”
এজন্যই চীনদেশে খাদা নাকের আদর। এজন্যই বিলাতি বিবিদের রাঙা চুল ও বিড়াল চোখের আদর। এজন্যই কাফ্রিদেশে স্থল ওষ্ঠাধরের আদর। এজন্যই বাঙ্গালাদেশে উল্কি চিত্রিত মিশি কলঙ্কিত চাঁদবদনের আদর। এজন্যই মানবসমাজে স্ত্রীরূপের আদর। আলোচ্য প্রবন্ধে লেখকের মতামতগুলো পাঠক সমাজকে আলোড়িত করে ।
