হাউস অব কমন্সের প্রশ্নোত্তর পর্বের চিত্র তুলে ধর
হাউস অব কমন্সের প্রশ্নোত্তর পর্বের চিত্র তুলে ধর।
![]() |
| হাউস অব কমন্সের প্রশ্নোত্তর পর্বের চিত্র তুলে ধর। |
উত্তর : একদিন হাউস অব কমন্সে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল। রবীন্দ্রনাথ সেই হাউস অব কমন্সের প্রশ্নোত্তর পর্ব চলাকালে উপস্থিত ছিলেন। এখানে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। একদিন বৃহস্পতিবারের হাউস অব কমন্সে ভারতবর্ষ নিয়ে খুব বাদানুবাদ চলেছিল। সেদিন ব্রাইট সিভিল সম্বন্ধে গ্ল্যাডস্টোন তুলজাতের শুল্ক ও আফগান যুদ্ধ সম্বন্ধে ভারতবর্ষীয়দের দরখাস্ত দাখিল করেন। চারটার সময় হাউস খোলে।
“আমরা কয়েকজন বাঙালি চারটে না বাজতেই হাউসে গিয়ে উপস্থিত হলেম। তখন হাউস খোলে নি, দর্শনার্থীরা হাউসের বাইরে একটা প্রকাণ্ড ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের চারদিকে বার্ক, ফক্স, চ্যাটাম, ওঅলপোল প্রভৃতি রাজনীতিবিশারদ মহাপুরুষদের প্রস্তরমূর্তি।"
প্রতি দরজার কাজে পাহারাওয়ালা পাকা চুলো পরচুলা পরা। গাউন ঝোলানো পার্লামেন্ট কর্মচারীরা হাতে দুই-একটা খাতাপত্র নিয়ে আনাগোনা করে। তাঁদের কাছে স্পীকার্স গ্যালারির টিকিট ছিল। হাউস অফ কমন্সে পাঁচ শ্রেণির গ্যালারি আছে স্ট্রেঞ্জার্স গ্যালারি, স্পীকার্স গ্যালারি, ডিপ্লম্যাটিক গ্যালারি, রিপোর্টাস গ্যালারি, লেডিজ গ্যালারি।
হাউসের যে কোনো মেম্বারের কাছ থেকে বৈদেশিক গ্যালারির টিকিট পাওয়া যায়, আর বক্তার অনুগ্রহ হলে তবে বক্তার গ্যালারির টিকিট পাওয়া যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ বলেন, “ডিপ্লম্যাটিক গ্যালারিটা কী পদার্থ তা ভালো করে বলতে পারি নে, আমরা যতবার হাউসে গিয়েছি দুই-একজন ছাড়া সেখানে লোক দেখতে পাই নি।" স্ট্রেঞ্জার্স গ্যালারি থেকে বড় ভালো দেখাশুনা যায় না, তার সামনে স্পীকার্স গ্যালারি, তার সামনে ডিপ্লম্যাটিক গ্যালারি।
পরচুলাধারী স্পীকার মহাশয় গরুড় পাখির মতো তার সিংহাসনে উঠে বসেন। হাউসের সভ্যরা সব আসন গ্রহণ করেন। হাউসের প্রথম কাজ প্রশ্নোত্তর করা। হাউসের পূর্ব অধিবেশনে এক-একজন মেম্বার বলে রাখেন যে, “আগামী বারে আমি অমুক অমুক বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব, তার উত্তর দিতে হবে।" সেদিন ও'ডোনেল নামে একজন আইরিশ মেম্বার জিজ্ঞাসা করলেন যে, “একা এবং আরো দুই-একটি খবরের কাগজে জুলুদের প্রতি ইংরেজ সৈন্যদের অত্যাচারের যে বিবরণ বেরিয়েছে, সে বিষয়ে গভর্নমেন্ট কি কোন সংবাদ পেয়েছেন।
আর সেসব অত্যাচার কি খ্রিস্টানদের অনুচিত নয়?” সাথে সাথেই অন্য দিক থেকে স্যার মাইকেল হিকসবিচ উঠে ও'ডোনেলকে কড়া কড়া দুই-এক কথা শুনিয়ে দিলেন, অমনি একে একে যত আইরিশ মেম্বার ছিলেন, সকলে উঠে তার কড়া কড়া উত্তর দিতে দিলেন। অনেকক্ষণ ঝগড়াঝাঁটি করে দুই পক্ষ শান্ত হয়ে বসে। উত্তর-প্রত্যুত্তরের ব্যাপার সমাপ্ত হলে পরে যখন বক্তৃতা করবার সময় হয়, তখন হাউস থেকে অধিকাংশ মেম্বার উঠে চলে যান।
দুই-একটা বক্তৃতার পর ব্রাইট উঠে সিভিল সার্ভিসের রাশি রাশি দরখাস্ত হাউসে দাখিল করেন। বৃদ্ধ ব্রাইটকে দেখলে অত্যন্ত ভক্তি হয়, তার মুখে ঔদার্য ও দয়া যেন মাখানো। হাউসে অতি অল্প মেম্বারই অবশিষ্ট থাকেন, যাঁরা থাকেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিদ্রার আয়োজন করেন। এক সময় গ্ল্যাডস্টোন উঠলেন বক্তৃতা দিতে। গ্ল্যাডস্টোন উঠামাত্র সমস্ত ঘর একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
গ্ল্যাডস্টোনের স্বর শুনতে পেয়ে আস্তে আস্তে বাইরে থেকে দলে দলে মেম্বার আসতে শুরু করে। দুই দিকের বেঞ্চি ভর্তি হয়ে যায়। তখন পূর্ণ উৎসবের মতো গ্ল্যাডস্টোনের বক্তৃতা উৎসারিত হতে থাকে। কিছুমাত্র চিৎকার, তর্জনগর্জন নেই, অথচ তাঁর প্রতিকথা, ঘরের যেখানে যে কোন লোক বসেছিল, সকলেই একেবারে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।
গ্ল্যাডস্টোনের কী একরকম দৃঢ়স্বরে বলবার ধরন আছে, তাঁর প্রতি কথা মনের ভিতর গিয়ে যেন জোর করে বিশ্বাস জন্মিয়ে দেয়। একটা কথায় জোর দেবার সময় তিনি মুষ্টিবদ্ধ করে একেবারে নুয়ে নুয়ে পড়েন, যেন প্রত্যেক কথা তিনি একেবারে নিংড়ে নিংড়ে বের করছেন। আর সেরকম প্রতি জোর দেয়া কথা দরজা ভেঙেচুরে যেন মনের ভিতর প্রবেশ করে।
গ্ল্যাডস্টোন অনর্গল বলেন বটে কিন্তু তার প্রতি কথা ওজন করা, তার কোন অংশ অসম্পূর্ণ নয়; তিনি বক্তৃতার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্বরে জোর দিয়ে বলেন না, কেননা সে রকম বলপূর্বক বললে স্বভাবতই শ্রোতাদের মন তার বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে দাঁড়ায়। তিনি যে কথায় জোর দেয়া আবশ্যক মনে করেন, সে কথাতেই জোর দেন, তিনি খুব তেজের সঙ্গে বলেন বটে কিন্তু চিৎকার করে বলেন না, মনে হয় যা বলছেন, তাতে তাঁর নিজের খুব আন্তরিক বিশ্বাস। সুতরাং হাউস অব কমন্সের চিত্র সত্যিই জীবন্ত আর উপভোগ্য।
