সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির বর্ণনা দাও
![]() |
| সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির বর্ণনা দাও |
সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির বর্ণনা দাও
- অথবা, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি পর্যালোচনা কর।
উত্তর : ভূমিকা : ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অবিস্মরণীয়। তিনি তার পিতার মৃত্যুর পর দিল্লির মসনদে আরোহণ করেন। তিনি ন্যায়বিচারের পূজারী ছিলেন।
ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন, “তার উদার শিক্ষা, সহজাত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং প্রচুর সাধারণ জ্ঞান তাঁকে পিতার রাজনীতি সুলভ রাষ্ট্রপরিচালনার নীতিকে গতিশীল রাখার জন্য যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন করে তুলেছিল।
→ সম্রাট জাহাঙ্গীরের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি : নিম্নে প্রশ্নের অবিভাজ্য চাহিদা অনুযায়ী জাহাঙ্গীরের সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি আলোচনা করা হলো :
(ক) বিদ্রোহ দমন : সম্রাট জাহাঙ্গীরের সিংহাসন নিষ্কণ্টক ছিল না। রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি কঠোর হস্তে তা দমন করেন। তার সময় সংঘটিত বিদ্রোহসমূহ নিম্নরূপ :
১. খসরুর বিদ্রোহ : সম্রাট জাহাঙ্গীর সিংহাসনে আরোহণের পরই যুবরাজ খসরু বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মথুরার হোসেন বেগ, লাহোরের আব্দুর রহিম এবং শিখগুরু অর্জুন তাকে সমর্থন করেন।
তবে জলন্ধরের নিকট জাহাঙ্গীর তাকে পরাজিত করে বন্দি করেন এবং তার সমর্থকদের কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। অর্জন সিংহকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়।
২. শাহজাহানের বিদ্রোহ : সম্রাট জাহাঙ্গীর অসুস্থ হয়ে পড়লে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান স্বীয় জামাতা ও জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ পুত্র শাহরিয়ারকে ক্ষমতায় বসানোর পায়তারা শুরু করেন।
শাহজাহান নূরজাহানের এ ধরনের দুরভিসন্ধির কথা অবগত হয়ে ১৬২৩ সালে বিদ্রোহ করেন। কিন্তু ১৬২৩ থেকে ১৬২৫ সালের মধ্যে তিনি রাজকীয় বাহিনীর হাতে তিনবার পরাজয়বরণ করে যাযাবরের ন্যায় দিনাতিপাত করতে থাকেন।
অবশেষে ১৬২৫ সালে পিতার নিকট আত্মসমর্পণ করে তিনি তার স্বীয় কার্যাবলির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন । সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে ক্ষমা করে দেন।
৩. মহব্বত খানের বিদ্রোহ : শাহজাদা খুররমের বিদ্রোহ দমনে মহব্বত খান যথেষ্ট দক্ষতা ও রণনৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। মহব্বত খান ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে ভেবে নূরজাহান তাকে রাজধানী থেকে দূরবর্তী অঞ্চল বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন।
এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠেন এবং জাহাঙ্গীর ও নূরজাহানকে বন্দী করেন। নূরজাহান কৌশলে স্বামী ও নিজেকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। অবস্থা প্রতিকূল দেখে মহব্বত খা দাক্ষিণাত্যে পলায়ন করেন।
(খ) নূরজাহানের সাথে বিবাহ সম্রাজ্ঞী : নূরজাহানের আসল নাম ছিল মেহের-উন-নিসা। তার পিতা ছিলেন ইরানের মির্জা গিয়াস বেগ। পিতা মির্জা গিয়াস বেগ ১৭ বছর বয়সে তাকে পারসিক যুবক আলীকুলী বেগের সাথে বিয়ে দেন।
কিন্তু আলীকুলী বেগ সম্রাট জাহাঙ্গীরের বৈমাত্রেয় ভাই কুতুবউদ্দিনের সাথে সংঘর্ষে নিহত হলে সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬১১ সালে ভূবন মোহিনী নূরজাহানকে বিয়ে করেন।
(গ) রাজ্যজয় : সিংহাসনে আরোহণ করে সম্রাট জাহাঙ্গীর পিতার ন্যায় সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। এতে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্যও অর্জন করেন। নিম্নে সাম্রাজ্য বিস্তারে সাফল্যসমূহ আলোচনা করা হলো।
১. মেবার অধিকার : স্বাধীনতাকামী মেবারের রানা অমর সিংহকে দমন করার জন্য জাহাঙ্গীর উপর্যুপরি কয়েকটি ব্যর্থ অভিযান পরিচালনা করেন।
অবশেষে ১৬১৫ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর শাহজাদা খুররমকে এক বিরাট বাহিনীসহ প্রেরণ করেন। খুররম অমর সিংহকে পরাজিত করে সম্রাটের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন।
২. দাক্ষিণাত্য বিজয় : ভারতবর্ষের প্রত্যেক শক্তিমান সম্রাটের দৃষ্টি ছিল দাক্ষিণাত্যের প্রতি। সম্রাট জাহাঙ্গীর সিংহাসন আরোহণ করে দাক্ষিণাত্যে অভিযান পরিচালনা করেন।
কিন্তু মালিক অথরের প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে দাক্ষিণাত্য অভিযান ব্যর্থ হয়। শেষে ১৬১৭ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর যুবরাজ খুররমকে আহমেদনগর অভিযানে প্রেরণ করেন।
যুবরাজ পুররম সফলতা লাভ করে আহমেদ নগর দুর্গ ও বালাঘাট অধিকার করেন। কিন্তু এ অভিযানের ফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
৩. নগরকোট বিজয় : উত্তর পাঞ্জাবের শতদ্রু বা সতলুজ নদীর মোহনায় অবস্থিত দুর্ভেদ্য নগরকোর্ট বা কাংড়া দুর্গ বিস্তায় জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা।
১৬২০ সাল পর্যন্ত দুর্গটি মুঘল আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা মুর্তজা খান এ দুর্গ জয় করতে ব্যর্থ হন।
অবশেষে যুক্তরাজ খুররম এক বিশাল বাহিনী নিয়ে দুর্ভেদ্য কাংড়া দুর্গ দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে অবরোধ করে। রাখেন এবং ১৬২০ সালে তা জয় করতে সক্ষম হন।
(ঘ) বৈদেশিক নীতি : সম্রাট জাহাঙ্গীরের বৈদেশিক নীতি নিম্নরূপ :
১. পর্তুগিজদের সাথে সম্পর্ক : সম্রাট জাহাঙ্গীর সিংহাসনে আরোহণ পর্তুগিজদের সাথে মিত্রতা স্থাপনে সচেষ্ট হন। তিনি তাদের আগ্রা ও লাহোরে গির্জা স্থাপন করে ধর্মপালনে অনুমতি প্রদান করেন।
গির্জা নির্মাণের জন্য এবং খ্রিষ্টান মিশনারীদের ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি প্রচুর অর্থ দান করেন। অনেকে মনে করেন যে, এর পিছনে সম্রাটের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। অবশ্য পরবর্তীতে এ সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
২. ইংরেজদের সাথে সম্পর্ক : সম্রাট জাহাঙ্গীর রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য ইংরেজদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
১৬০৮ সালে ক্যাপ্টেন হকিন্স ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের অনুরোধপত্রসহ সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে আসলে তিনি তাকে সাদরে বরণ করেন। এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার হয়।
৩. পারস্যের সাথে সম্পর্ক : শাহ আব্বাস ছিলেন পারস্যের সাফাভি বংশীয় সম্রাট। তিনি পূর্বসূরীদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত কান্দাহারের অধিকার নিয়ে মুঘল ও পারস্যের সম্রাটদের মধ্যে সবসময়ই দর কষাকষি চলত।
শাহ আব্বাস শক্তিশালী বলে কান্দাহার পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তা অধিকার করতে সক্ষম হন। তিনি ১৬১২ থেকে ১৬২০ সালের মধ্যে চারবার প্রচুর উপহার সামগ্রীসহ সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিকট দূত প্রেরণ করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকাল এক যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি একজন সব্যসাচী লোক ছিলেন।
রাজ্যবিস্তার, বিদ্রোহ দমন, শাসনকার্য পরিচালনা এবং রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাই বলা যায়, ভারতবর্ষে সম্রাট জাহাঙ্গীর এক অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব ।
