খুজে না পেলে সার্চ করো

সুফি পথ পরিক্রমা বর্ণনা কর

সুফি পথ পরিক্রমা বর্ণনা কর
সুফি পথ পরিক্রমা বর্ণনা কর 

সুফি পথ পরিক্রমা বর্ণনা কর 

অথবা, সুফি দর্শনে স্তরসমূহ আলোচনা কর ।

অথবা, সুফিবাদের পথপরিক্রমার বিভিন্ন স্তর বা পর্যায় সমূহ ব্যাখ্যা কর

অথবা, সুফিবাদ কি? সুফি পথপরিক্রমা আলোচনা কর ।

উত্তর : ভূমিকা : সুফিবাদের মূল লক্ষ হলো আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ। পরম সত্তার সাথে মিলনে পরম পাওয়ার যে চরম পরিতৃপ্তি তাই সুফি সাধকের ক্ষণস্থায়ী পার্থিব প্রলোভন এবং আপাত মধুর ইন্দ্রিয় জীবনে শক্তি থেকে মুক্ত করে তাঁকে পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের সাধনায় সার্থক করে তোলে। এই সাধনায় সুফিদের মূলনীতিসমূহ সাহায্য করে। থাকে।

সুফিবাদের মূল কথা হলো আল্লাহর তাওহীদ রক্ষা করা। সুফিবাদ এক প্রকার রহস্যময় আধ্যাত্মিক পালনে মতবাদ। সুফি সাধকের অন্তরের গভীর অনুভূতির দ্বারা আল্লাহর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে চান। 

তাঁদের মতে সুফি ন্যায়- নীতি, ভয়ভীতি অপেক্ষা আন্তরিক ভালোবাসার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। সুফিবাদ যুক্তি তর্কমূলক কিংবা নিছক ইন্দ্ৰিয়ানুভূতিমূলক বা অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক তত্ত্ব এটা হৃদয় ভিত্তিক এবং আত্মোপলব্ধিমূলক মতবাদ। সুফিরা অতীন্দ্রিয় অনুভূতির মাধ্যমে পরমসত্তাকে উপলব্ধি করেন। এর আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমেই ঐশী জ্ঞান লাভ করে।

সুফিবাদের আরবি প্রতিশব্দ তাসাউফ সুফ ধাতু থেকে এই নিষ্পন্ন। সুফ অর্থ পশম। সুফি অর্থ পশমী পোশাক =য় পরিধানকারী। মহানবি (সা.) নিজে এবং তাঁর অনুসরণে কতিপয় - সাহাবা পশমী পোশাক পরিধান করতেন। পশমী... পোশাক ল পরিধান পার্থিব আরাম আয়েশ পরিত্যাগের প্রতীক। পরিবর্তিত অর্থে মরমিবাদী সাধনায় নিয়োজিত থাকাকে ইসলামি পরিভাষায় তাসাউফ এবং সাধককে সুফি বলে আখ্যায়িত করা হয়।

মারুফ আল করখি বলেন, “সুফিবাদ ঐশী সত্তার উপলব্ধি। নিন জুননুন মিসরি বলেন, “খোদা ছাড়া আর সব কিছু পরিবর্জন” করাই সুফিবাদ ।
জুনায়েদ বাগদাদী বলেন, জীবন, মৃত্যু ও অন্য সব ব্যাপারে  আল্লাহর ওপর নির্ভরতাই সুফিবাদ। আবুল আবদুল্লাহ খফিক বলেন, খোদা মাকে তাঁর প্রেম  দিয়ে শুদ্ধ করেছেন সেই ব্যক্তি হলেন সুফি।

সুতরাং অন্তরের বিশুদ্ধির মাধ্যমে বাহ্য ও আন্তজীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করে। ঐশী সত্তার উপলব্ধির মধ্য দিয়ে চিরন্তন শান্তিলাভই সুফিবাদের শিক্ষা। সুফিবাদের মূলত বর্ণনার চেয়ে অনুভবের মাধ্যমেই বুঝা সম্ভব  সুফির পথপরিক্রমাসমূহ :

আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ ও তাঁর ইশকে বলিয়ান হওয়াই সুফি জীবনের চরম লক্ষ্য। ইন্সিত লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য সুফিকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা কষ্ট ক্লেশের মধ্য দিয়ে সন্তপর্ণে বিনয়াবনত চিত্তে পথ অতিক্রম করতে হয়। সুফির যাত্রাপথ দীর্ঘ। 

সুফিবাদ অনুযায়ী জীবনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তি- আত্মাকে বিশ্বজনীন আত্ময় সমাহিত করা। সুফি দর্শন অনুযায়ী বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্বজনীন ইচ্ছা, সত্যিকার, জ্ঞান, চিরন্তন আলোকে ও সর্বোত্তম সৌন্দর্য। সুফিবাদকে ঐপথে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক স্তর অতিক্রম করতে হয়। যথা- ১. শরিয়ত; ২. তরিকত; ৩. মারেফাত এবং ৪. হাকিকত।

এই সকল মঞ্জিল অতিক্রমের মধ্য দিয়ে সুফির আত্মার বিকাশ সাধিত হয় এবং সুফি জীবনের চরম চাওয়াকে পেয়ে থাকেন।

১. শরিয়ত : শরিয়ত সুফির যাত্রাপথের প্রারম্ভ। একজন সুফির জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ। শরিয়ত ইসলামি জীবন বিধানের বিভিন্ন ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করে। অধ্যাত্মিক জীবনের রূপায়নের জন্য শরিয়তের বিধি বিধানের অনুশীলনের মাধ্যমে সুফিকে ভবিষ্যতের কঠোর ব্রত পালনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়।

কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত এবং আল্লাহ ও রাসূলের অন্যান্য বিধান পালনের মাধ্যমে সুফি অধ্যাত্মিক জীবনের প্রস্তুতি পর্ব সমাধান করেন। শরিয়তের বিধি বিধান পালনের মধ্য দিয়েই সুফিতার প্রবৃত্তি সমূহকে নিয়ন্ত্রিত করেন। 

দেহকে আত্মার অধীনে আনয়ন করেন। আল্লাহ এই সম্পর্শে কুরআনে দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা করেছেন।“আর যে ব্যক্তি তাঁর সন্দর্শন কামনা করে সে যেন এই এক ও অদ্বিতীয় প্রভুর অর্চনায় আর কাউকে শরিক না করে।” (সূরা- ১৮, আয়াত-১১০)

হে মোমেনরা, আল্লাহকে মেনে চলিও রাসূলকে মেনে চলিও আর তোমাদের চালক ও নেতাদের। তাই সুফিয় দীর্ঘ পরিক্রমার শরিয়ত প্রারম্ভিক স্তর এবং এর বিধান সর্বতোভাবে পালনীয়।

২. তারিকত : তারিকত শরিয়ত অপেক্ষা উচ্চতর স্তর। তারিকত বলতে বুঝায় নির্দিষ্ট পথ। যখন সুফি শরিয়তের বিধানসমূহ অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করেন। তিনি দ্বিতীয় স্তরে উন্নীত হন। এই স্তর প্রথম স্তর অপেক্ষা উচ্চতর। এই স্তরে সুফি মুর্শিদের অর্থাৎ আধ্যাত্মিক আলোকে আলোকিত ব্যক্তির সাহায্য গ্রহণ করেন।

এই স্তরে মুর্শিদের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন বিনা প্রশ্নে ও দ্বিধাহীন চিত্তে মুর্শিদের নির্দেশ অনুসরণ সুফির পক্ষে একান্ত প্রয়োজন। সুফি সাধক যখন এই স্তরের সমস্ত নিয়ম কানুন দি প্রতিপালন করে মুর্শিদের সন্তুষ্টি বিদানের সমর্থ হন, তখন তিনি মুরিদ হিসেবে গণ্য হন। এই স্তরে সুফিরা মুরিদ মুর্শিদের ইচ্ছার মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। এই স্তরকে 'ফানায়ে শেখ' বলা হয় ।

৩. মারেফাত : মারেফাত হলো আধ্যাত্মিক আলোকের শুরু স্তর। এই স্তরে সাধকের কলব আধ্যাত্মিক আলোকে আলোচিত হয়। তিনি বস্তুর অর্থ উপলব্ধি করতে শুরু করেন। সৃষ্টি রহস্যের তা কালো যবনিকা তাঁর মনচক্ষুর সম্মুখ থেকে সরে যায়। “সুফি মোরাকাবা” বিপুল বিশ্বের সৃষ্টি কৌশল মানবজীবনের গুপ্ত রহস্য ভেদ করে এক ঐশী জ্ঞানালোকের আভাপ্রাপ্ত হয়।

সুফির দেওয়ানী অন্তরের সম্মুখে খুলে যায় এক অপার খোদায়ী শক্তির লীলাচাঞ্চল্য- এক তীব্র জ্যোতির্ময় আলোর বিচ্ছুরণ। এই স্তরে আল্লাহ সাধকের হৃদয় ঐশী আলোকে দীপ্ত করে তাকে সৃষ্টির গভীর রহস্য উপলব্ধির উপযোগী করে তোলেন। 

এখানে সাধক আল্লাহতে পরিপূর্ণভাবে নিবেদিত প্রাণ। তাঁর সমস্ত সত্তা সংস্কৃত এই প্রার্থনা বের হয়। আমার উপাসনা, আরাধনা, উৎসর্গ, অনুষ্ঠান। আমার জীবন-মরণ, সমস্তই বিশ্ব নিয়ন্তা আল্লাহর মতবাদ জন্য। (সূরা ৭, আয়াত ১৬৩)

৪. হাকিকত হাকিকত হচ্ছে চূড়ান্ত স্তর। এই স্তরে সত্য উপলব্ধি করেন। সুফি শৃঙ্খলা, অনুরাগ ভক্তি, সংযম, সৎকর্ম ও আত্ম শুদ্ধির মাধ্যমে পর সত্যকে অন্তরে উপলব্ধি করেন। এই স্তরকে বলা হয় ফানাফিল্লাহ বা আল্লাহর মধ্যে আত্মবিলোপ এবং পরমসত্তায় এক নতুন ও চিরন্তন অস্তিত্ব লাভ। 

সুফিরা মনে করে প্রবৃত্তির প্রভাব থেকে হৃদয়কে মুক্ত করতে পারলে আধ্যাত্মিক পথ পরিক্রমা সম্ভব হয়ে থাকে। প্রেম, ভক্তি, সংযম ও সততার মাধ্যমে হৃদয়কে শুদ্ধবুদ্ধ করা যায়। আল্লাহর সাথে মিলনই সুফির কাম্য।

তিনি অগণিত হৃদয়ে প্রতিফলিত হলেও তিনি এক। এই একের সাধন সুফির সাধনা। সুফিরা আল্লাহর ধ্যানে ও প্রেমের মাধ্যমে নিজেকে এমন সুউচ্চ স্তরে প্রতিষ্ঠিত করেন। যেখানে তাঁরা নিজেদের অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়ে থাকেন। হাকিকত স্তরে সুফির নিজের কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকে না। আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর ইচ্ছা সমর্পিত হয়।

এই স্তরে সাধকের হৃদয়ে কোনোরূপ দ্বিধা-দ্বন্ধ থাকে না। ।" (সূরা- | এরূপ সাধনাশুদ্ধ আত্মার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ ঘোষিত হয়েছে। “হে পরিতুষ্ট আত্মা। 

তুমি প্রসন্ন ও সন্তোষপ্রাপ্ত অবস্থায় তোমার জানে চলিও প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন করো । অতঃপর আমার পরিক্রমার সেবকদের মধ্যে প্রবিষ্ট হও এবং স্বর্গোধ্যানে প্রবেশ কর। “(সূরা ৮৯, আয়াত ২৭-৩০)"

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় না যে, অন্তত যার প্রেম দ্বরা পরিপূর্ণ হয় তার মৃত্যু ঘটে না। রাসূলুল্লাহ বলেন, সৎকর্ম দ্বারা যারা আল্লাহর সন্ধান করেন। আল্লাহ তাদের নিজের কাছে টেনে নেন। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে "হে পরিতুষ্ট আত্মা তুমি প্রসন্ন ও সন্তোষপ্রাপ্ত অবস্থায় তোমার প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন কর।” (সূরা ৮৯, আয়াত ২৭)। এ জ্ঞানের মাধ্যমে সুফি আল্লাহ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ