খুজে না পেলে সার্চ করো

সুফিবাদ বলতে কি বুঝায় বা সুফিবাদ সম্পর্কে আলোচনা করো

সুফিবাদ বলতে কি বুঝায় বা সুফিবাদ সম্পর্কে আলোচনা করো
সুফিবাদ বলতে কি বুঝায় বা সুফিবাদ সম্পর্কে আলোচনা করো 

সুফিবাদ বলতে কি বুঝায় বা সুফিবাদ সম্পর্কে আলোচনা করো 

অথবা, সুফিবাদের সংজ্ঞা দাও। মুসলিম দর্শনে সুফিবাদের লাকের গুরুত্বসমূহ বর্ণনা কর ।

অথবা, সুফিবাদ কাকে বলে? মুসলিম দর্শনে সুফিবাদের হস্যের তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : ভূমিকা : ইসলাম মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা রহস্য সার্বজনীন ধর্ম। মানুষের সমগ্র সত্তার বিকাশ সাধনই ইসলামের, সুফির লক্ষ্য। মানুষ দেহসর্বস্ব নয়, দেহ ব্যতীত তার আর একটি রূপ আছে আত্মা। দেহ ও আত্মার সমন্বয়কে বলা হয় মানুষ। 

জীবনের এক চিরন্তন দিক উম্মোচন করে সুফিবাদ মানুষের নিত্য সত্তায় অধিকার দিয়েছে। স্রষ্টা ও সৃষ্টি দেহ ও আত্মা পার্থিব ও অপার্থিব জীবনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে জীবনের মূল্যবোধকে উন্নীত করেছে।

সুফিবাদ : সুফিবাদ এক প্রকার রহস্যময় আধ্যাত্মিক হের মতবাদ। সুফি সাধকের অন্তরের গভীর অনুভূতির দ্বারা আল্লাহর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে চান। তাঁদের মতে প্রত্য ন্যায়- নীতি, ভয়ভীতি অপেক্ষা আন্তরিক ভালোবাসার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। 

সুফিবাদ যুক্তি তর্কমূলক কিংবা এই নিছক ইন্দ্ৰিয়ানুভূতিমূলক বা অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক তত্ত্ব নয়। বং এটা হৃদয় ভিত্তিক এবং আত্মোপলব্ধিমূলক মতবাদ। সুফিরা অতীন্দ্রিয় অনুভূতির মাধ্যমে পরমসত্তাকে উপলব্ধি করেন। আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমেই ঐশী জ্ঞান লাভ করে।

সুফিবাদের আরবি প্রতিশব্দ তাসাউফ সুফ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। সুফ অর্থ পশম। সুফি অর্থ পশমী পোশাক পরিধানকারী। মহানবি (সা.) নিজে এবং তাঁর অনুসরণে কতিপয় সাহাবা পশমী পোশাক পরিধান করতেন। 

পশমী পোশাক - পরিধান পার্থিব আরাম আয়েশ পরিত্যাগের প্রতীক। পরিবর্তিত  অর্থে মরমিবাদী সাধনায় নিয়োজিত থাকাকে ইসলামি পরিভাষায় তাসাউফ এবং সাধককে সুফি বলে আখ্যায়িত করা হয়।

মারুফ আল করখি বলেন, "সুফিবাদ ঐশী সত্তার উপলব্ধি।” জুননুন মিসরি বলেন, “খোদা ছাড়া আর সব কিছু পরিবর্জন” করাই সুফিবাদ । 

জুনায়েদ বাগদাদী বলেন, জীবন, মৃত্যু ও অন্য সব ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভরতাই সুফিবাদ । আবুল আবদুল্লাহ খফিক বলেন, খোদা মাকে তাঁর প্রেম দিয়ে শুদ্ধ করেছেন সেই ব্যক্তি হলেন সুফি ।

সুতরাং অন্তরের বিশুদ্ধির মাধ্যমে বাহ্য ও আন্তজীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করে। ঐশী সত্তার উপলব্ধির মধ্য দিয়ে চিরন্তন শান্তিলাভই সুফিবাদের শিক্ষা। 

সুফিবাদের মূলত বর্ণনার চেয়ে অনুভবের মাধ্যমেই বুঝা সম্ভব । মুসলিম দর্শনে সুফিবাদের গুরুত্ব : সুফিবাদ ধর্মের গোঁড়ামি ও যুক্তি প্রবণতার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।

মুসলিম দর্শনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, একদিকে গোঁড়া রক্ষণশীল সম্প্রদায় কুরআন ও হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সুফিবাদ দি আত্মিক উন্নতি ও হৃদয়ের পবিত্রতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। ক কেননা হৃদয়ের মাধমে স্রষ্টা ও মানুষের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয় যে জীবন জগতের পূর্ণতার উপলব্ধির জন্য সুফিবাদের গুরুত্ব কর অনস্বীকার্য। 

নিচে সুফিবাদের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো :

১.দেহ ও মনের যোগাযোগের অপরিহার্য : প্রাণিতত্ত্বের দিক ক দিয়ে মানুষ দৈহিক মানুষ সত্তা। কতগুলো শরীর বৃত্তিয় নিয়মাধীনে তার দেহ চালিত হয়। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ চিন্তা - অনুভূতি ইচ্ছাসম্পন্ন জীব। মানুষের সমুদয় আশা- আকাঙ্ক্ষার বিশ্লেষণে মানুষ শুধু দৈহিক ও মানসিক সুখের তৃপ্ত থাকতে চায় না।

সে অন্তরের গভীরে পরম প্রিয়জনের সান্নিধ্য কামনা করে। সে চিরদিনের সুরটি বেঁধে শেষগানে তার কান্না কেঁদে নীরব তারই পায়ে সব কিছু উজাড় করে ঢেলে দিতে চায়।

 সুতরাং মানুষের জীবনবোধকে পরিপূর্ণ করার জন্য তার স্বভাবের দুর্গতি পূর্ণ বিকাশের জন্য দেহের সঙ্গে মনের। মনের সঙ্গে আত্মার যোগাযোগের স্থাপন অপরিহার্য। সুফি দর্শন মানুষের স্বভাবের প্রৰণ পূর্ণ চিত্র বিশ্লেষণ করে মানুষকে আপন মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করে।

২. ইন্দ্রিয়ানুভূতি নয় অনুভূতি : মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পার্থিব আবেদনের মতো অপার্থিব বিষয়ের আবেদন ও তার জীবনে কম নয়। কাব্য, শিল্পকলা, ধর্ম ইত্যাদির উৎস ইন্দ্রিয়ানুভূতি নয়- এদের জন্ম হৃদয়ের সুক্ষ্ম অনুভূতি থেকে। সুফি চিন্তাধারা বিজ্ঞান ও শিল্প অধ্যুষিত জীবন দর্শনের পরিপুষ্ট করে মানব জাতিকে শান্তির আবেহায়াত বিলাতে পারে।

৩. আত্মিক শক্তিতে মহীয়ান : মানবজাতির ইতিহাস থেকে ১ জানা যায় যে, কোনো জাতির অভ্যুত্থানের সময় জাতি দেশ বিজয়, দেশ রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে মেতে উঠেছে। 

আবার যখন এই সব দিকে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন সে জাতি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম সর্বপ্রকার সূক্ষ্ম  কিছু ও কোমল বৃত্তির অনুশীলনে। 

মানুষের চিন্তা ভাবনার কল্পনা মোড় পরিবর্তন করে তার স্বরে ঘোষণা করেছে, মানুষ একদিকে জড় জ্যাপারে উদ্ভিদ প্রাণী জগতের সমগোত্রীয় অন্য দিকে সে আত্মিক শক্তিতে মহীয়ান ও গরীয়ান ।

৪. বিভ্রান্তিকর পরিবেশে পূর্ণ সাহায্য : বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের হৃদয়ের উপলব্ধি ও সংশয় আনয়ন করেছে। তার স্বচ্ছ জীবনের চিন্তাকে আচ্ছন্ন করেছে এবং তার অস্তিত্বের সীমাহীন সম্ভানাকে খর্ব করেছে। মানুষ দৈহিক আবেদন চরিতার্থ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। 

মানুষ যেন পথ হারা পথিকের মতো পথ হারিয়ে মরছে। সুফি দর্শন মানুষের বিভ্রান্তিকর পরিবেশে পূর্ণ জীবনবোধের চিত্র সামনে ধরে মানুষের হারানো সম্পদ ফিরিয়ে দিতে পারে।

৫. শান্তির আবেহায়াত : জড়বাদের আবর্তে পরে মানুষের মন আজ দিশেহারা সে আজ বিভ্রান্ত। জড়বাদের আপাত মধুর আকর্ষণ শশীল সৃষ্টি করেছে তার চিত্ত চাঞ্চল্য। বিভ্রান্ত মানুষ আজ দেহের তাড়নায় ফিবাদ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। 

জড়বাদের প্রভাব আজ মানুষের সত্য সুন্দর করে। কল্যাণের আদর্শের মূলে কুঠারাঘাত হানছে। যেন এক প্রচণ্ড হয়। দেবতা, দানবির শক্তি সব সত্য, সুন্দর। 

সব কল্যাণকে ধ্বংস গুরুত্ব করতে উদ্যত হয়েছে। জড়বাদের এই আসুরিক শক্তির কবল থেকে সুফি মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারে তবে হৃত সম্পদ। আন্তজার্তিক অশান্তির আগুন নিভিয়ে বিলাতে পারে শান্তির আবেহায়াত।

৬. প্রীতিপ্রেমের পুণ্য বাঁধন : প্রতীচ্যের অভিজ্ঞতাভিত্তিক বুদ্ধিবাদও প্রাচ্যের অধ্যাত্মবাদ যেদিন মানব দর্শনকে নবরূপে রূপায়িত করবে; সেদিন বুদ্ধিবাদও অধ্যাত্মবাদ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অগ্রসর হবে। সেদিন বস্তুবাদ ও সুফিবাদের সমন্বয় সাধিত হবে। 

তৃপ্ত সেদিন জীবন পরিপূর্ণরূপে মানুষের সামনে উদ্ভাসিত হবে। সেদিন ন্নিধ্য দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ ঘুচে যাবে ও অভেদ দর্ম জাতি গড়ে কান্না উঠবে। 

আজকের দিশেহারা মানবজাতির সম্মুখে সুফিদর্শন এক প্রায়। বলিষ্ঠ জীবন প্রত্যয় নিয়ে হাজির হয়, প্রীতিপ্রেমের পুণ্য বাঁধনে সব বর দুর্গতি নাশ করতে মানবজাতিকে আহবান জানায়।

৭. নতুন দিগন্তের নির্দেশ : সুফিবাদ ধর্মের গোঁড়ামি ও যুক্তি বের প্রবণতার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। মুসলিম দর্শনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে, একদিকে গোঁড়া রক্ষণশীল সম্প্রদায় কুরআন ও হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। 

অন্যদিকে মুক্তবুদ্ধি নের মুতাজিলা সম্প্রদায় প্রজ্ঞার সাহায্যে ধর্মীয় সমস্যার সমাধান দিয়েছে। এই দুটি সম্প্রদায়ই পক্ষপাতমুক্ত এদের কেউই পরম সত্যলাভে সমর্থ নয়। সুফিবাদ উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এবং জীবনের এক নতুন দিগন্তের নির্দেশ দান করে ।

৮. উদার নীতির নিরাভরণ : সুফিবাদ আত্মিক উন্নতি ও হৃদয়ের পবিত্রতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। হৃদয়ের মাধ্যমে স্রষ্টা ও মানুষের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। 

সুতরাং সুফিবাদ ধর্মের নীরস রীতিনীতির মধ্যে প্রেমরস প্রবাহিত করে দশ খোদা ও মানুষকে প্রেমের বাঁধনে বেঁধেছে। কবি নজরুল । ইসলামের ভাষায় সুফিবাদের উদার-নীতির নিরাভরণ প্রকাশ সে  ঘটেছে। সুফিবাদ মানুষের মরমি চেতনাকে আকৃষ্ট করেছে।

৯. দৈহিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব : মানুষ যুগে যুগে জড়বাদ ও বুদ্ধিবাদের আবর্তে পড়ে জীবনের উচ্চতর মূল্যবোধ সম্পর্কে দিশেহারা হয়েছে। মুসলিম জাতির জীবনে যখন জাগতিক আকর্ষণ প্রবল হয়ে উঠেছিল এবং শক্তির নেশায় তারা স্বর্গমত তোলপাড় করেছিল সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে সুফিবাদ তাদের শুনিয়েছে আশার বাণী দিয়েছে অভয় । সুফিবাদ দৈহিক ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্বের মধ্যে সেতু নির্মাণ করে ইহজগৎ ও পরজগতের ব্যবধান ঘুচিয়েছে।

১০. বস্তুতান্ত্রিক জীবনে পূর্ণতা : বিজ্ঞানের বিজয় গৌরবের জৌলুস সাধারণ মানুষকে বস্তুতান্ত্রিক করে তুলেছে। দৈহিক আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি জীবনের পূর্ণতার পরিচায়ক নয়। জীবনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যবোধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে মানুষের দৈহিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ। 

জীবনের পরিপূর্ণ উপলব্ধির জন্য দেহের অনুশীলনের সঙ্গে মন ও আত্মার অনুশীলন ও অপরিহার্য। সুফিবাদ মানুষের আধ্যাত্মিক স্বরূপের নির্দেশ দান করে তার জীবনকে পরিপূর্ণ করে শূণ্যতা থেকে রক্ষা করে। সুফিবাদ বস্তুতান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থার মধ্যে পূর্ণতা আনয়নের জন্য একান্ত আবশ্যক ভূমিকা পালন করেছে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, সুফিবাদ মানুষের আধ্যাত্মিক স্বরূপের নির্দেশ দান করে তার জীবনকে পরিপূর্ণ করে শূন্যতা থেকে রক্ষা করে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ