বাঙালির বাংলা' প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার স্বাধীনতার যে মূলমন্ত্র শিক্ষা দিয়েছেন তা বর্ণনা কর
বাঙালির বাংলা' প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার স্বাধীনতার যে মূলমন্ত্র শিক্ষা দিয়েছেন তা বর্ণনা কর
উত্তর : বাঙালির বাংলা' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির নেতিবাচক-ইতিবাচক, ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরার সাথে সাথে বাংলার বাঙালির স্বাধীনতা কামনা করেছেন।
'বাঙালির বাংলা' প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম একই সাথে বাঙালির চিরায়ত বৈশিষ্ট্য, স্বাধীনতার অন্তরায় এবং উত্তরণের পথ নির্দেশ করে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন।
প্রাবন্ধিক এ প্রবন্ধে ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী থেকে বাঙালিকে শ্রেষ্ঠ য়ে মনে করেছেন। তবে তিনি এও বলেছেন- বাঙালির কর্মশক্তি একেবারে নেই বলেই তাদের দিব্যশক্তিও তমসাচ্ছন্ন।
বাঙালির কর্মবিমুখতা, জড়ত্ব, মৃত্যুভয়, আলস্য, তন্দ্রা, নিদ্রা, ব্যবসায় তা বাণিজ্যে অনিচ্ছার কারণ। আর এ কারণেই প্রাবন্ধিক বলেছেন - বাঙালি, তামসিকতায় আচ্ছন্ন বলে চেতনাশক্তিকে হারিয়ে ফেলেছে।
প্রাবন্ধিক মনে করেন বাঙালির মস্তিষ্ক ও হৃদয় ব্রহ্মময় - কিন্তু দেহ ও মন পাষাণময়। কাজেই বাংলার অন্তর-বাইরে যে - ঐশ্বর্য পরমদাতা আমাদের দিয়েছেন, আমরা তাকে অবহেলা করে ঋণে, অভাবে দৈন্যে, ব্যাধিতে, দুর্দশায় জড়িয়ে পড়েছি।
প্রাবন্ধিক বাঙালির গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বাঙালি শুধু লাঠি দিয়েই দেড়শত বছর আগেও তার স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চেষ্টা করেছে। আজো বাংলার ছেলেরা স্বাধীনতার জন্য যে আত্মদান করেছে, যে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, ইতিহাসে তা থাকবে স্বর্ণ-লেখায় লিখিত।
লেখক এ প্রবন্ধে বাঙালির কর্মবিমুখতাকে ধিক্কার জানিয়ে বলেছেন- আলস্যের, কর্মবিমুখতা, পৌরুষের কারণেই আমরা আজ হয়ে পড়েছি সবার থেকে দীন। যে বাঙালি সারা পৃথিবীর লোককে দিনের পর দিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে পারতো তারাই আজ সকলের দ্বারে ভিখারীর মতো হাত পেতে বেড়াচ্ছে- - দাসত্ববৃত্তি করছে।
বাঙালি আজ-ঐশী-ঐশ্বর্য বিসর্জন দিয়ে অর্জন করেছে দৈন্য, দারিদ্র্য, অভাব, লাঞ্ছনা। বাঙালি শুধু ক্ষাত্রশক্তিকে - অবহেলা করেই দেশগড়ার সৈনিক হতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এসব কারণেই বিদেশিরা আমাদের সম্পদ লুট করে নিয়ে গেলেও আমরা বসে বসে দেখি- প্রতিবাদ করতেও ভুলে গেছি।
প্রাবন্ধিক এসব দেখে বাঙালিকে আবার প্রতিবাদের মূলমন্ত্রে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রাবন্ধিক সকল বাঙালিকে একত্রিত হয়ে প্রতিবাদের ভাষ্য ধারণ করতে অনুরোধ জানিয়েছেন-
“খবরদার, যে রাক্ষস একে গ্রাস করতে আসবে, যে দস্যু এ ঐশ্বর্য স্পর্শ করবে- তাকে 'প্রহারেণ ধনঞ্জয়' দিয়ে বিনাশ করব, সংহার করব।" প্রবন্ধের পরিণতিতে লেখক বলেছেন “বাংলা বাঙালির হোক! বাংলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।'
প্রাবন্ধিক বাঙালি এবং বাঙালির ছেলেমেয়েকে নিম্নোক্ত মন্ত্রটি শিক্ষা দিয়ে প্রবন্ধের ইতি টেনেছেন-
এই পবিত্র বাংলাদেশ বাঙালির - আমাদের। দিয়া 'প্রহারেণ ধনঞ্জয়' তাড়াব আমরা, করি না ভয়
যত পরদেশি দস্যু ডাকাত
'রামা'দের 'গামা'দের।"
সুতরাং আমরা সার্বিক আলোচনা থেকে বলতে পারি যে, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হলেও কাজী নজরুল ইসলাম স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন অনেক পূর্বে।
.png)