বৃত্তানুপ্রাস বলতে কী বুঝ?


বৃত্তানুপ্রাস বলতে কী বুঝ?

উত্তর : যখন কোনো একটি ব্যঞ্জন ধ্বনি একাধিকবার ধ্বনিত হয়, অথবা ব্যঞ্জন ধ্বনিগুচ্ছ যথাযথ ক্রম অনুসারে যুক্তভাবে বা বিযুক্তভাবে বারবার ধ্বনিত হয়, তখন তাকে 'বৃত্তানুপ্রাস' বলে।

বৃত্তানুপ্রাস হলো রসের পরিপোষণকারী। বৃত্তানুপ্রাস সম্বন্ধে চারটি বিষয় মনে রাখা একান্ত প্রয়োজন-

যেমন-

প্রথমত ঃ একটি মাত্র ব্যঞ্জন বর্ণ দু'বার মাত্র ধ্বনিত হবে।

“যে জন চলিয়াছে তারি পাছে সবে ধায়, নিখিলের যত প্রাণ যত গান ঘিরে তায়।”

(ক্ষনিক মিলন; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

এখানে- প্ৰথমপাদে 'ছ' মাত্র দু'বার ধ্বনিত হয়েছে; আর দ্বিতীয় পাদে 'য' ও 'ন' (ন ও ণ এক্ষেত্রে সমধ্বনিভুক্ত) মাত্র | দু'বার করে ধ্বনিত হয়ে বৃত্তানুপ্রাস সৃষ্টি করেছে। পাদান্তে ধ্বনি | সাম্য থাকায় অন্ত্যানুপ্রাসও সৃষ্টি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত ঃ একটি মাত্র ব্যঞ্জন বর্ণ বহুবার ধ্বনিত হবে :

উদাহরণ-“এই মনে বনে দানী হইয়েছে ছুঁইতে রাধার অঙ্গ ।

রাখাল হইয়া রাজবালা সনে কিসের রস রঙ্গ॥” (-গোবিন্দ দাস)

এখানে প্রথম চরণে ‘ন' ৩ বার, আর পরবর্তী তিনটি চরনে 'র' ৭ বার ধ্বনিত হয়েছে। সুতরাং বৃত্তানুপ্রাস হয়েছে।

তৃতীয়ত ঃ ব্যঞ্জনগুচ্ছ স্বরূপানুসারে মাত্র দু' বার ধ্বনিত অলংকার শাস্ত্রে বর্ণের ক্রম- সাদৃশ্য এবং স্বরূপ-সাদৃশ্য বলতে বুঝায় ব্যঞ্জনগুলোর ক্রম অক্ষুণ্ণ রেখে যদি ধ্বনি-সাদৃশ্য সৃষ্টি করে তবে তা ক্রম-সাদৃশ্য; আর ক্রম ভঙ্গ করে বর্ণ-বিপর্যয় সৃষ্টি করেও যদি ধ্বনি-সাদৃশ্য থাকে, তবে তাকে স্বরূপ-সাদৃশ্য বলা হয়।

উদাহরণ-

“রঙ বেরঙের সুতোগুলো থাক, থাক পড়ে ওই জরির ঝালরঃ "

এখানে 'রঙ', (-রবীন্দ্রনাথ)

বে-'রঙ'-এর এবং 'থাক', 'থাক'

ধ্বনিগুলোতে ধ্বনি- সাদৃশ্য রয়েছে তা ক্রম ভঙ্গ না করেই। 

সুতরাং এখানে 'বৃত্তানুপ্রাস' শব্দালংকার সৃষ্টি হয়েছে।

চতুর্থত : ব্যঞ্জনগুচ্ছ যুক্তভাবে বা অযুক্তভাবে ক্রমানুসারে বহুবার ধ্বনিত হবে।

উদাহরণ – “অশোক রোমাঞ্চিত মঞ্জুরিয়া দিল তার সঞ্চয় অগ্রলিয়া। 

মধুকর গুন্ত্রিত কিসলয় পুঞ্জিত উঠিল বনাঞ্চল চঞ্চলিয়া।" (- রবীন্দ্রনাথ)

এখানে 'ঞ্চ' চারবার এবং 'ঞ্জ' চারবার ধ্বনিত হয়েছে।

সুতরাং বৃত্তানুপ্রাস ।

“মঞ্জুবিকচ কুসুমপুঞ্জ মধুপ শব্দ গণ্ডি গুপ্ত কুঞ্জর গতি পন্ত্রিগমন মঞ্জুল কুল নারী।

ঘন গঞ্জন চিকুর পুঞ্জ মালতী মালে রঞ্জ অগ্রন যুক্ত কগ্রনয়নী খঞ্জন গতিহারীঃ” (- জগদানন্দ)

এখানে চারটি চরণের প্রতিচরণে 'ঞ্জ' যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনিটি তিনবার করে মোট ১২ বার ধ্বনিত হয়ে কী চমৎকার 'বৃত্তানুপ্রাস' গঠন করেছে!

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ