অনুপ্রাস কাকে বলে? উদাহরণসহ দুটি অনুপ্রাসের সংজ্ঞা লেখ


অনুপ্রাস কাকে বলে? উদাহরণসহ দুটি অনুপ্রাসের সংজ্ঞা লেখ

উত্তর : বর্ণ (ধ্বনি) বা বর্ণগুচ্ছ (ধ্বনিগুচ্ছ) যদি যুক্ত বা বিযুক্তভাবে বাক্যমধ্যে একাধিকবার ধ্বনিত হয় তবে তাকে অনুপ্রাস বলা হয়। উদাহরণ :

(i) কাস্তা ও কামিনী কৌতুকে যামিনী যাপন করিল। -বিদ্যাসাগর

-'ক' পাঁচবার আবৃত্ত।

(ii) চলচপলায় চকিত চমকে করিছে চরণ বিচরণ কোথা চম্পক আভরণ । -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

-চ- ধ্বনি সাতবার।

(iii) গুরু গুরু গর্জন -গুন্ গুন্ স্বর —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

-'গ' পাঁচবার।

“অনুপ্রাস শব্দসাম্যং বৈষ্যম্যেহপি স্বরস্য যৎ”- (সাহিত্যদর্পণ) অর্থাৎ যে বর্ণের কিংবা বর্ণগুচ্ছের অনুপ্রাস হবে, তাদের সাথে মিলিত স্বরধ্বনি ভিন্ন (বিষম) হলেও তাতে | অনুপ্রাসের ক্ষুণ্ণ হবে না। 

'শব্দসাম্য' বলতে এখানে ব্যঞ্জনের ধ্বনিসাম্যকে বুঝানো হয়েছে। অনুপ্রাসে স্বরধ্বনির তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। উদাহরণ সহযোগে সাহিত্য-দর্পণের এ উক্তিকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে :

১. ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল- 'ফ' ধ্বনি তিনবার আবৃত্ত। 

২. কুলায়ে কাঁপিছে কাতর কপোত- 'ক' ধ্বনি চারবার ধ্বনিত।

এখানে প্রথমটিতে 'ফ' ধ্বনি তিনবার ধ্বনি-ফ + উ, ফ + উ এবং ফ + এ। স্বরধ্বনি বিষম তবু 'ফ' ব্যঞ্জনধ্বনির অনুপ্রাস। 

দ্বিতীয়টিতে 'ক' ধ্বনি চারবার আবৃত্ত-প্রথম ক + উ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক + আ এবং চতুর্থ ক + অ, সুতরাং স্বরধ্বনি বিষম (ভিন্ন)- কিন্তু তবুও অনুপ্রাসের আবেদন অক্ষুণ্ণ। কারণ, 'ক' ব্যঞ্জনধ্বনির অনুপ্রাস এখানে।

অনুপ্রাস মূলত তিন প্রকার। যথা : (ক) অন্ত্যানুপ্রাস, (খ) বৃত্ত্যনুপ্রাস এবং (গ) ছেকানুপ্রাস ।

এর মধ্যে বৃত্ত্যনুপ্রাস শ্রেষ্ঠ বাংলা কাব্যসাহিত্যে এবং কথাসাহিত্যে এর প্রবল প্রসার। ছেকানুপ্রাস অত্যন্ত গৌণ। অলংকারশাস্ত্রে (ঘ) শ্রুত্যনুপ্রাস হিসেবে যে অনুপ্রাস পরিচিত (আচার্য দণ্ডী যার প্রবর্তক) বাংলায় এর স্বতন্ত্র স্থান নেই, এটা প্রধানত অন্ত্যানুপ্রাসের সহকারীরূপে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 

আচার্য শ্যামাপদ চক্রবর্তী ইংরেজির অনুসরণে আরো দুপ্রকার অনুপ্রাসের উল্লেখ করেছেন এবং নাম দিয়েছেন (ঙ) আদ্যানুপ্রাস এবং (চ) মধ্যানুপ্রাস ।

হলো : নিম্নে দুই প্রকার অনুপ্রাসের সংজ্ঞাসহ উদাহরণ দেওয়া

ক. অন্ত্যানুপ্রাস : কবিতার পদান্তের সাথে পদান্তের এবং চরণের শেষের শব্দটির সাথে পরবর্তী চরণের শেষ শব্দটির | ধ্বনিসাম্য থাকলে তাকে অন্ত্যানুপ্রাস বলা হয় ।

উদাহরণ :

কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মালা,

দাড়ি মুখে সারি গান লা-শারীক আল্লাহ ।

-কাজী নজরুল ইসলাম

বৃত্ত্যনুপ্রাস : বস্তুত সমস্ত অনুপ্রাসকেই বৃত্ত্যনুপ্রাস বলা যায়। কারণ একই ব্যঞ্জনধ্বনির বৃত্তি অর্থাৎ বার বার ঘুরেফিরে আসা (repetition) যে কোনো অনুপ্রাসের মৌল বৈশিষ্ট্য। আচার্য উদ্ভট (অষ্টম শতাব্দীর) প্রথম এ বৃত্তিকে সংযুক্ত করেন অনুপ্রাসের সাথে। 

অবশ্য তাঁর মতে এ 'বৃত্তি' মানে কখন ঢঙ বা 'বলার ভঙ্গি'- প্রকাশের রূপময় দিকটাই ছিল প্রধান। আর ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রে 'বৃত্তির অর্থময়', রসময় দিক প্রাধান্য পেল। এ দুজনের 'বৃত্তি'র সার্থক মিলন সম্ভব হলো 'রসসাগরসঙ্গমে'। সেই থেকে বৃত্তানুপ্রাসের আসল পরিচয়- 'রসানুগত অনুপ্রাস' হিসেবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ