কার হাত ধরে, কীভাবে অপু প্রকৃতির রাজ্যে প্রবেশ করেছিল?


কার হাত ধরে, কীভাবে অপু প্রকৃতির রাজ্যে প্রবেশ করেছিল?

উত্তর : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে অপু তার দিদি দুর্গার হাত ধরে প্রকৃতির রাজ্যে প্রবেশ করেছিল। 

দুর্গার হাত ধরেই অপু পৃথিবীর রূপ-রস-রং চিনতে শিখেছে। অর্থাৎ ‘পথের পাঁচালী' উপন্যাসে অপু চরিত্রের ক্রমবিকাশে দুর্গার চরিত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

দুর্গা বনজঙ্গল ভালোবাসে, অপুও বনজঙ্গল ভালোবাসে। দুর্গার চরিত্র চঞ্চল-অবাধ-উদ্দাম। অন্যদিকে, অপু চরিত্রটি শান্ত- স্বপ্নমুগ্ধ-বিস্ময়-বিহ্বল। তাদের উভয় চরিত্রের মধ্যে স্বতন্ত্র রূপ চোখে পড়ে। আসলে অপু ও দুর্গা কোনো বিপরীত চরিত্র নয়, পরিপূরক চরিত্র। 

দুর্গা বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে, কিন্তু প্রকৃতির অন্তর্লোকের কোনো খবর রাখে না। অথচ সেই অপুকে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিতি করে দিয়েছিল- তার হাত ধরেই অপু নিসর্গ-সৌন্দর্যের মায়ালোকে প্রবেশ করেছিল। দুর্গা বেপরোয়া স্বভাবের মেয়ে। 

মায়ের নিষ্ঠুর ভর্ৎসনা ও নির্মম প্রহার, প্রতিবেশীদের নিন্দামন্দ, কিছুই সে গ্রাহ্য করে না। অত্যন্ত লোভী পরের বাগানের ফল-পাকুড় থেকে পরের ঘরের সোনা পর্যন্ত লোভের বশবর্তী হয়ে কিছুই তার চুরি করতে বাধে না। অথচ এই দুর্গাই স্নেহ ও মমতার প্রতিমূর্তি হয়ে দেখা দেয় মাঝে মাঝে। 

অপুর প্রতি স্নেহের অন্ত নেই। মূলত দিদি দুর্গার সান্নিধ্যেই অপুর শৈশব জীবনের পথচলা। দিদির সঙ্গী হয়ে কামরাঙা পানফল জোগাড় করে গ্রামপ্রকৃতির স্বাদ পায়, ঝড়-জলে আম কুড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ লাভ করে। 

একদিন দুর্গা আর সে বাছুর খুঁজতে গিয়ে রেলরাস্তা দেখতে ছুটেছিল, অপুর মনে হয় "গ্রামের প্রান্তের বুড়ো জামতলাটায় তাহার দিদি যেন ম্লানমুখে দাঁড়াইয়া তাহাদের রেলগাড়ির দিকে চাহিয়া আছে!" দুর্গার মৃত্যুর অপু গ্রাম ত্যাগ করার আগে বার বার দিদির কথা ভেবে বেদনাহত হয়েছে। 

নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম-গ্রামের মানুষ তাকে ততটা টানতে পারে না-যতটা টানতে পারে তার দিদির স্মৃতি। যে দিদির স্নেহস্পর্শ ছিল নিশ্চিন্দিপুরের ভাঙা কোঠাবাড়ির প্রতিটি কোণে আজ সেই দিদির সঙ্গে সত্য সত্যই তার চিরকালের বিচ্ছেদ ঘটে যাচ্ছে। নিশ্চিন্দিপুরের ভিটেয় শেষবারের মতো এসে সবুজ কাচের টুকরো পেয়ে মনে হয় এ তার দিদির চুড়ির টুকরো। 

তখন অপুর কাছে মনে হয় সবাই চলে গেছে শুধু তাহার দিদি শুইয়া আছে। রায়পাড়ার ঘাটের ওধারে ওই প্রাচীন ছাতিম গাছটার তলায় আহাতের গ্রামের শ্মশান, সেখানে। সে দিদির বয়স আর বাড়ে নাই মুখের তারুণ্য বিলুপ্ত হয় নাই সে এ সবই ভালোবাসিত। এ সব ছাড়িয়া যাইতে পারে নাই কোথাও।”

মূলত 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে অপুর প্রকৃতির রাজ্যে প্রবেশ করা এবং অপুর চরিত্রের ক্রমবিকাশে দিদি দুর্গার সংস্পর্শের ভূমিকা অনেক বেশি। 

দুর্গা নিজে প্রকৃতির অন্তলোকে প্রবেশ করতে পারেনি বটে, কিন্তু সেই যেন অপুকে হাত ধরে প্রকৃতির গহন-লীলা নিকেতনে নিয়ে গেছে, প্রকৃতির সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ পরিচয় সাধন করিয়ে দিয়েছে। দুর্গা যেন অপুর সংবেদনশীল মনটিকে সারাক্ষণ আঁচলের আড়ালে দীপশিখার মতো সযত্নে রক্ষা করে চলেছে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ