রস ও ব্যক্তিত্ব প্রবন্ধে আলোচিত ব্যক্তিদের স্বরূপ তুলে ধর


রস ও ব্যক্তিত্ব প্রবন্ধে আলোচিত ব্যক্তিদের স্বরূপ তুলে ধর

উত্তর : বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রগতিচিন্তা এবং বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা কাজী আবদুল ওদুদের পরিচয় সমাজ সংস্কারক বা ধর্ম সংস্কারক রূপেই সীমাবদ্ধ নয়। 

তাঁর শিল্পবোধ এবং নন্দনতাত্ত্বিক অথবা সৃজনশীল সাহিত্যকেও স্পর্শ করে গেছে সমান্তরালভাবে। তাঁর "রস ও ব্যক্তিত্ব" প্রবন্ধে উপস্থাপিত আলোচিত ব্যক্তিদের স্বরূপ নিচে তুলে ধরা হলো।

মানুষের মনের বিশেষ ও গভীর অনুভূতিকে রস বলা হয়। সাহিত্যের যে গুণের কারণে কাব্য পাঠে পাঠক তন্ময় হয়ে পড়ে, সেটায় কাব্যের রস। কাব্যরস মানুষের অন্তরের চিরন্তন সৌন্দর্য তৃষ্ণা মেটায়। কাব্যে যে ভাব স্থান লাভ করে তা পাঠক হৃদয়ে প্রবাহিত হয় রসের মাধ্যমে। 

রসের পরে প্রাবন্ধিক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। টলস্টয়ের জীবনী নিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কির লেখা বিষয়ে সমালোচনার সূত্র ধরে মহৎ শিল্পী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- 'শিল্পের অতি অল্প অংশই শেখানো যায় কিন্তু শিল্পীকে জানতে হয় অনেকটা'। 

শিল্পীর কাজ হচ্ছে কোনো কিছু গভীর করে উপলব্ধি করে তাকে সুন্দর করে ব্যক্ত করা। রবীন্দ্রনাথের মতে টলস্টয়ের জীবনী লিখতে গিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কি আর দশ জনের মত সাধারণ টলস্টয়কে চিত্রিত করেছেন, কিন্তু গোর্কির লেখায় টলস্টয়ের অসাধারণত্ব যদি চিত্রিত না হয়, তবে তার মূল্য কোথায়। 

রবীন্দ্রনাথ টলস্টয়-চরিত্র বিচার করতে গিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তা এখানে স্মরণীয়- “টলস্টয়ের কিছুই মন্দ ছিল না এ কথা বলাই চলে না, খুঁটিনাটি বিচার করলে তিনি যে নানা বিষয়ে সাধারণ মানুষের মতোই এবং অনেক বিষয়ে তাদের চেয়েও দুর্বল। 

কিন্তু যে সত্যের গুণে টলস্টয় বহু লোকের এবং বহুকালের, তাঁর ক্ষণিকমূর্তি যদি সেই সত্যকে আমাদের কাছ থেকে আচ্ছন্ন করে থাকে তাহলে এই আর্টিস্টের আশ্চর্য ছবি নিয়ে আমার লাভ হবে কী। গোর্কির টলস্টয়ই কি টলস্টয়। বহুকালের ও বহুলোকের চিত্তকে যদিও গোর্কি নিজের চিত্তের মধ্যে সংহত করতে পারতেন তাহলেই তাঁর দ্বারা বহুকালের বহুলোকের টলস্টয়ের ছবি আঁকা সম্ভবপর হত। 

তার মধ্যে অনেক ভোলবার সামগ্রী ভুলে যাওয়া হত, আর তবেই যা না- ভোলবার তা বড় হয়ে, সম্পূর্ণ হয়ে, দেখা দিত। এ-সম্পর্কে গ্যেটে শ্লেগেল সম্পর্কে মন্তব্য করেন- “তাঁর অসাধারণ গুণপনা ও পড়াশোনা দেখে ভীত গতে হয়। কিন্তু তা-ই যথেষ্ট নয়। 

জগৎজোড়া পাণ্ডিত্য থাকলেও বিচারক্ষমতা নাও থাকতে পারে  কিন্তু প্রতিভার সমস্ত কলানৈপুণ্যের কি মূল্য যদি নাটকে আমরা না পাই লেখকের মধুর অথবা মহৎ ব্যক্তিত্ব? জনসাধারণের চিত্তের উৎকর্ষ ঘটে এরই গুণে। শ্লেগের ক্ষুদ্র ব্যক্তিত্ব মহৎদের প্রকৃতি বুঝবার ও সমাদর করবার অযোগ্য।”

মহৎ ব্যক্তিত্ব দুর্লভ ব্যাপার বলেই সব দেশের সাহিত্যেই কলাকৌশলের বিন্যাস কবি ও সাহিত্যিকদের বড় একটি কাজ। কারণ এর ব্যবহারিক মূল্য আছে; কেননা, অনেকের জন্য সাহিত্য কালহরণের বহু উপায়ের মধ্যে একটি উপায়। 

জীবনে প্রধান অপ্রধানের ভালো-মন্দের এই ভেদ সাহিত্যিক ও শিল্পী যে করেন সেটি কিন্তু ঠিক নীতিবিদের ভঙ্গিতে নয়। কারণ নীতিবিদরা কোনো একটি আদর্শকে অনুসরণ করেন, অন্যদিকে তাদের নজর থাকে না; অপরদিকে শিল্পীরা জীবনের এক বিশেষ আদর্শ সম্পর্কে যেমন সচেতন তেমনি সচেতন মানব চিত্তের বিচিত্র প্রবণতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, শিল্প ও সাহিত্যে রস ও ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব যাই হোক না কেন, একালে সাহিত্য ও শিল্পে এই ব্যক্তিত্বের মর্যাদা সম্বন্ধে অবহিত হয়ে একালের সমালোচনা সাহিত্য এক নতুন মর্যাদা লাভ করেছে।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ