সভ্যতা কেন এবং কীভাবে সংকটাপন্ন, তা উত্তরণের পথ কী? আলোচনা কর


সভ্যতা কেন এবং কীভাবে সংকটাপন্ন, তা উত্তরণের পথ কী? আলোচনা কর

উত্তর : প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে আশীর্বাদ পুরুষ হিসেবে অবতীর্ণ হন। একমাত্র মহাকাব্য ছাড়া বাংলা সাহিত্যের যেখানেই তিনি হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনার ফসল ফলেছে।

তিনি বিশ্বকবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করলেও প্রবন্ধ রচনায় যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। 'কালান্ত র' (১৯৩৮) প্রবন্ধ সংকলনটি তারই পরিচয় বহন করে।

'কালান্তর' গ্রন্থের একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ হলো সভ্যতার সংকট (১৯৪১)। প্রবন্ধটিতে তিনি রাজনৈতিক দার্শনিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আশি বছর যে দিন কবির পূর্ণ হয়েছে, সেদিন তিনি প্রবন্ধটি লিখেছেন। 

নিজের আশি বছর জীবনে কবি তাঁর উপলব্ধ চিন্তধারা প্রকাশ করেছেন। লেখক গভীর বেদনার সাথে উপলব্ধি করেছেন ইংরেজ জাতির ঔদার্যের প্রতি তাঁর যে পূর্ণ বিশ্বাস ছিলো বিশ্বে তাদের নিষ্ঠুর আধিপত্য বাদ বিস্তারের কারণে তা ভঙ্গ হয়ে গেছে। 

তবে কবি হতাশ হন নি। সভ্যতার এ সংকট থেকে উত্তরণে তিনি আশার বাণীও উচ্চারণ করেছেন। আলোচ্য প্রবন্ধে তারই পরিচয় রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বিশ্ব প্রেমিক। তাঁর স্বদেশ প্রেম ছিলো এ বিশ্বপ্রেমের সোপান ও সাধনার উপায়। 

রবীন্দ্রনাথ আন্তরিক শ্রদ্ধা নিয়ে ইংরেজকে তাঁর হৃদয়ের উচ্চাসনে বসিয়ে ছিলেন। তাঁর মতে, ইংরেজদের মাধ্যমে দেশপ্রেমবোধ, স্বজাত্যপ্রীতি পেয়েছি এবং তারই ভিত্তিতে আমরা স্বজাতির স্বাধীনতার সাধনা আরম্ভ করি। 

তাই আমরা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হলে সত্য ইংরেজদের মাধ্যমে বিজয় লাভ করবো। তিনি ইংরেজদের মাধ্যমে ভারতবর্ষ জ্ঞনেবিজ্ঞানে, শিল্প-সাহিত্যে দ্রুত আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে শেষ দেখেছেন বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড যা ইংরেজদের সৃষ্টি। 

ভারতবর্ষ ক্ষুধা, দারিদ্র্যে নিমজ্জিত, হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সারা বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার সবই ছিলো ইংরেজদের শাসনের ফল। ফলে কবির ইংরেজদের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে যায়। তবে তিনি কখনোই নিরাশ হননি। 

কবি আশা করেছেন, ভারতবর্ষ একদিন স্বাধীনতা লাভ করবে এবং জ্ঞানেবিজ্ঞানে, বিদ্যাশিক্ষায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বিশ্ব মাঝে। কবির ভাষায়-

“আজ আশা করে আছি, পরিত্রাণ কর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এ দারিদ্র্য লাঞ্ছিত কুটিরের মধ্যে, অপেক্ষা করে থাকব, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এ পূর্বদিগন্ত থেকেই ।”

অবশেষে বলা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন আশাবাদী লেখক। তিনি প্রথম জীবনে ইংরেজ সভ্যতা শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সভ্যতার মধ্যে ফাঁকি দেখে আশাহত হন। 

তবে তিনি কখনোই হতাশ হন নি। তিনি আশা করেছেন ভারতবর্ষ একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আর এভাবেই সভ্যতার যে সংকট তা থেকে জাতির মুক্তি ঘটবে।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ