সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিকের যে মর্মবেদনা প্রকাশ পেয়েছে তার উৎস কী ছিল?— আলোচনা কর


সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিকের যে মর্মবেদনা প্রকাশ পেয়েছে তার উৎস কী ছিল?— আলোচনা কর 

উত্তর : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। প্রাবন্ধিক তাঁর আশিতম জন্মবার্ষিকীতে পাঠ করার উদ্দেশ্যে এ প্রবন্ধটি রচনা করেন। 

এ ব্যতিক্রমধর্মী রচনাটিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্ম সমালোচনামূলক সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। পারিবারিক পরিমণ্ডল, পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ততা ইংরেজ সভ্যতার মানব মৈত্রীর অপূর্ব পরিচয় লেখকের মধ্যে ইংরেজ সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছিল। 

কিন্তু পরবর্তীতে যখন তাদের আগ্রাসী রূপটি লেখকের সম্মুখে উন্মোচিত হয়, তখন লেখকের হৃদয় হয়। ক্ষত-বিক্ষত। আর এ ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের মর্মবেদনা পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে এ প্রবন্ধটিতে।

এ প্রবন্ধের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে লেখকের মর্মবেদনা। যার জন্ম ইংরেজ জাতির প্রতি বিশ্বাস ভঙ্গের কষ্ট থেকেই। তাঁর মর্মবেদনার উৎস নিম্নরূপ :

প্রথমত, প্রথম জীবনে ইংরেজ সভ্যতার পূজারী ছিলেন প্রবন্ধকার। তাদের ভূয়সী প্রশংসা করতেন ভাষায় ও সাহিত্যে। কিন্তু শেষ জীবনে তাদের নগ্নরূপ দর্শন করে তিনি বেদনায় জর্জরিত হয়ে উঠেছেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি মানব মৈত্রীর বিশুদ্ধ পরিচয় পেয়েছেন ইংরেজ চরিত্রে। কিন্তু এ বিশ্বাস তাঁর ভেঙে গেছে যখন তিনি দেখলেন হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের দেয়াল তুলে গোটা জাতিকে বিচ্ছিন্ন করে তুলেছিল। যাতে তিনি হয়েছিলেন ব্যথিত।

তৃতীয়ত, লেখকের বিশ্বাস ছিল এ সভ্য জাতির দ্বারা এ দেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি যখন দেখলেন ইংরেজদের শাসন-শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত ভারতবাসীর আর্তনাদ, তখন বেদনায় নীল হয়ে উঠল এ দরদী লেখক হৃদয়।

চতুর্থত, লেখক বুঝতে পেরেছিলেন ইংরেজরা কৌশলে ভারতীয় জাতিসত্তাকে দ্বিধাবিভক্ত করেছিল। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের দেয়াল তুলে গোটা জাতিকে করেছিল বিচ্ছিন্ন। যা দেশ দরদী লেখককে বেদনাকাতর করেছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম জীবনে ইংরেজদের মধ্যে যে মানবতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে অনুপস্থিত প্রত্যক্ষ করে গভীর বেদনায় কাতর হয়েছেন। এভাবে মানব- মৈত্রীর পরিচায়ক ইংরেজ জাতির প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বাসে ফাটল ধরে। 

ফলে ইংরেজদের প্রতি তাঁর আশৈশব লালিত শ্রদ্ধাবোধের অপমৃত্যু ঘটে।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
আরও পড়ুনঃ
আরও পড়ুনঃ