সমাসোক্তি অলংকার কাকে বলে?
সমাসোক্তি অলংকার কাকে বলে?
উত্তর : বিষয়ের (প্রস্তুত বা উপমেয়র) উপর বিষয়ীর (অপ্রস্তুত বা উপমানের) ব্যবহার সমারোপিত হলে সমাসোক্তি অলংকার হয়।
রূপক এবং সমাসোক্তি-দুটোতেই উপমেয়ের উপর আরোপের প্রশ্ন। তবে পার্থক্য এই যে, রূপকে উপমান নিজেই আরোপিত আর সমাসোক্তিতে তার (উপমানের) কার্য, প্রকৃতি বা ব্যবহার; রূপকে যেখানে উপমান নিজের রূপের আরোপে উপমেয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে, সেখানে সমাসোক্তিতে উপমান উপমেয়ের উপর নিজের ব্যবহার, (behaviour, nature) আরোপ করে উপমেয়কে এক অভিনব আচরণ বা স্বভাব চমৎকারিত্ব দান করে।
অনেকে ইংরেজি Personification বা Pathetic Fallacy-র সাথে সমাসোক্তিকে এক করে ফেলেছেন। আসলে এরা সমার্থক নয়। কারণ বর্ণনীয় চেতন, অচেতন, মানুষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণী যাই হোক-না কেন, তার উপরে অন্য যে কোনো বস্তুর স্বভাব আরোপ করলেই সমাসোক্তি অলংকার হতে পারে।
অন্যদিকে, Pathetic Fallacy বলতে বুঝায়, অপ্রাণীর উপর মানবীয় সংবেদনা বা অনুভবের আরোপ (Attribution of human emotion to inanimate objects.)
(i) মৃদুপদে নিদ্রাদেবী আইলা কৈলাসে; লভিলা কৈলাস-বাসী কুসুম-শয়নে বিরাম; —মধুসূদন নিদ্রা বা ঘুমের উপর নারীর ব্যবহার আরোপ করা হয়েছে।
(ii) তইলা বাড়ির পায়ের জোহা বাড়ী তাএল ফিটেলি আন্ধারি রে আকাশ ফুলিআ -চর্যাপদ (৫০) শবরপাদ [তদলগ্ন তৃতীয়) বাড়ির চারপাশে জ্যোৎস্না, আকাশ- কুসুমের মতো অন্ধকার ছুটে পালাল বা দূর হলো। অন্ধকার অচেতন-বস্তু কিন্তু ছুটে পালাচ্ছে-বলায় অন্ধকারের উপর চেতন বস্তুর ব্যবহার আরোপিত।
(iii) বুঝিবা তীরে উঠিয়াছে সে জলের কোল ছেড়ে। ত্বরিতপদে চলে গেছে, সিক্ত বাস লিপ্ত দেহে- যৌবনলাবণ্য যেন লইতে চাহে কেড়ে ॥ -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্নান শেষ করে সুন্দরী জল থেকে কূলে উঠেছে, দ্রুতপায়ে ঘরে যাবে, কিন্তু ভিজে কাপড় তার দেহের সাথে এমনভাবে লেপ্টে গেছে যেন তার (সুন্দরীর) যৌবনলাবণ্যটুকু সম্পূর্ণরূপে কেড়ে নিতে চাচ্ছে। এখানে প্রস্তুত বসনের ওপর কবি অপ্রস্তুত নায়কের ব্যবহার আরোপ করেছেন।
(iv) পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ; -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে নিশ্চল পর্বতে চলিষ্ণু মেঘের গতিময়তা আরোপিত।
(v) আজো শুনি আগমনী গাহিছে সানাই ও যেন কাঁদিছে শুধু-নাই কিছু নাই! -কাজী নজরুল ইসলাম নিষ্প্রাণ সানাইয়ে ব্যথাতুর প্রাণের আরোপ।
(vi) অবাক রাতের তারারা আকাশে মিট্ মিট্ করে চায় : কেমন করে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায়। -সুকান্ত ভট্টাচার্য অচেতন রাতের নক্ষত্রে চেতন পদার্থের স্বভাব আরোপিত।
(vii) নামল সন্ধ্যা; সূর্যদেব, এখানে নামল সন্ধ্যা -বিষ্ণু দে
(viii)সুপ্তিশান্ত গৃহদ্বারে হানা দেয় বিনিদ্র নগর - সুধীন দত্ত (ix) অন্ধকার জীবনের বাগানে নিগ্রোর মতো শুধু আর্তনাদ করে উঠে -শামসুর রাহমান
(x) কাল মৃত্যু হাত বাড়িয়েছিলো আমার ঘরে। -আল মাহমুদ
(xi) জন্মাবধি পিঁড়ি পেতে বসে আছে অদ্ভুত আঁধার। --রফিক আজাদ
.png)