যাহা ধর্ম সে ত বর্মের মতো আঘাত সহিবার জন্যই।”-ব্যাখ্যা কর
যাহা ধর্ম সে ত বর্মের মতো আঘাত সহিবার জন্যই।”-ব্যাখ্যা কর
উত্তর : আলোচ্য অংশটুকু শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি সম্বলিত 'গৃহদাহ' উপন্যাস থেকে নেয়া হয়েছে; প্রদত্ত উক্তিটি মহিমের। সে রামবাবুর ধর্ম পালন সম্পর্কে এবং ধর্মের গুরুত্ব সম্পর্কে এমন বলেছে ।
রামবাবু ঈশ্বরভক্ত আচারনিষ্ঠ হিন্দু। উপন্যাসে আরেক ক্ষুদ্র চরিত্র বীণাপাণি (রাক্ষুসী) রামবাবু'র কন্যা। রামবাবু নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ; যেমন স্নেহপ্রবণ, তেমনি কর্তব্যপরায়ণ। সুরেশ অচলাকে নিয়ে রামবাবুর কাছে ডিহরীতে আশ্রয় নিয়েছিল।
অচলাকে তিনি মেয়ের মতোই ভালোবেসেছিলেন- 'সুরমা' বলে ডাকতেন; এই আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণের স্নেহ অপেক্ষা ধর্মের বাইরের ধরনটাই বড় বেশি প্রবল ছিল। যে মুহূর্তে তিনি শুনলেন যে অচলা সুরেশের পত্নী নয়; সে মুহূর্তেই অচলার প্রতি প্রবল ঘৃণা তার মনে নেয়।
যেহেতু একদিন তিনি অচলার হাতের রান্না অতিশয় পরিতৃপ্তির সঙ্গে খেয়েছিলেন। এ আচার সর্বস্ব ব্রাহ্মণ যে অচলাকে একদিন কন্যার মতো ভালোবাসতেন, তাকে মৃত্যুর মুখে ভয়ানক আর্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে তার বাধলো না।
রামবাবুর কাছে তখন অচলা সম্পর্কে মনে হয়েছে- এ কে, কার মেয়ে, কী জাত- হয়তো বা বেশ্যা- একে সে মা বলেছে-এর ছোঁয়া খেয়েছে- এ কারণে তার জাত-ধর্ম সবই গেছে। কথাগুলো মনে করে রামবাবুর শরীর ঘৃণায় ভরে গিয়েছিল।
স্নেহ প্রতিহিংসায় পরিবর্তিত হলো এ আচার সর্বস্ব হিন্দুধর্মের গোঁড়ামির জন্য। রামবাবু সবকিছু ফেলে মহিম- অচলার সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করে কাশীতে ছুটলেন প্রায়শ্চিত্ত করতে। এ সময় অচলাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে যাওয়া রুঢ় আচরণ করা নিয়ে রামবাবুর ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
মহিম ভাবে অচলার অপরাধের বিচার না হয় পরে চিন্তা করবে- কিন্তু এই আচারপরায়ণ ব্রাহ্মণের এই ধর্ম কোন সত্যকার ধর্ম- যা সামান্য একটা মেয়ের প্রতারণায় এক নিমিষে ধুলিসাৎ হয়ে গেল- যে ধর্ম অত্যাচারীর আঘাত হতে নিজেকে এবং অপরাকে রক্ষা করতে পারে না-
বরঞ্চ তাকে মৃত্যু হতে বাঁচাতে সমস্ত শক্তি সবসময় দিয়ে উদ্যত রাখতে হয়- সে কিসের ধর্ম এবং মানবজীবনে তার প্রয়োজনীয়তা কোনখানে? যে ধর্ম মেহের মর্যাদা রাখতে দিলে না- যে নিঃসহায় আর্ত নারীকে মুত্যরে মুখে ফেলে দিতে দ্বিধাবোধ করে - না আঘাত খেয়ে যে ধর্ম এতোবড় স্নেহশীল বৃদ্ধকেও এমন চঞ্চল জিন প্রতিহিংসায় এরূপ নিষ্ঠুর করে দিল- সে কিসের ধর্ম?, এর মধ্যে
আসলে কোনো সত্যবস্তু আছে? যা আসলে সত্য ধর্ম- তা তো র আঘাত সহ্য করার জন্যই- অন্যথায় সে ধর্মের কোনো মূল্য থাকে না।
পরিশেষে বলা যায় যে, বিপদে-আপদে আঘাতে ধর্মই ঢাল হয়ে মানুষকে রক্ষা করে- ধর্ম রক্ষা করতে গিয়ে মানুষক| বিসর্জন দেয়া প্রকৃত ধর্ম নয়।
অচলার দুঃসময়ে ধর্মরক্ষার নামে রামবাবু কাশীযাত্রা করলে মহিম তার আচরাসর্বস্ব ধর্মপালন পানি সম্পর্কে উপরিউক্ত উক্তির অবতারণ করেছে।
.png)